images

অর্থনীতি

‘সস্তা ও সহজলভ্য হওয়ায় তামাকপণ্য ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে আসছে না'

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

২১ মে ২০২৬, ০৩:৫২ পিএম

তামাকপণ্য সস্তা ও সহজলভ্য হওয়ায় তরুণ সমাজ ও নিম্ন আয়ের মানুষের তামাক ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে আসছে না। তাই জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে সব তামাকপণ্যের মূল্য বৃদ্ধি ও সুনির্দিষ্ট কর আরোপের দাবি জানানো হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (২১ মে) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন অব দি রুরাল পুয়র (ডর্প) আয়োজিত সভায় বক্তারা এ দাবি জানান।

সভায় উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে বলা হয়, বাংলাদেশে বর্তমানে নিম্ন, মধ্যম, উচ্চ ও অতি উচ্চ—এই চার স্তরের সিগারেট বিদ্যমান। এর মধ্যে বাজারে বিক্রি হওয়া সিগারেটের প্রায় ৯০ শতাংশই নিম্ন ও মধ্যম স্তরের। এ স্তরে তামাকপণ্য সস্তা হওয়ায় তরুণ জনগোষ্ঠী তামাক ব্যবহারে আসক্ত হয়ে পড়ছে। সস্তা তামাকপণ্য সহজলভ্য হওয়ায় তরুণ সমাজ ও নিম্ন আয়ের মানুষের তামাক ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে আসছে না।

এতে আরও বলা হয়, আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে তামাকপণ্যে কার্যকর করারোপের মাধ্যমে দাম বৃদ্ধি করে নিম্ন ও মধ্যম স্তর একত্র করে প্রতি ১০ শলাকার সিগারেটের প্যাকেটের সর্বনিম্ন দাম ১০০ টাকা, উচ্চ স্তরে ১৫০ টাকা এবং অতি উচ্চ স্তরে ২০০ টাকা নির্ধারণ করতে হবে। পাশাপাশি সব স্তরে ৬৭ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক বহাল রেখে প্রতি প্যাকেটে ৪ টাকা সুনির্দিষ্ট কর আরোপের দাবি জানানো হয়। তামাকপণ্যে এ কর ও মূল্য প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা গেলে ৩ লাখ ৭২ হাজারের বেশি তরুণ ধূমপান শুরু করতে নিরুৎসাহিত হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে প্রায় ১ লাখ ৮৫ হাজারের বেশি তরুণ জনগোষ্ঠীর অকালমৃত্যু রোধ করা সম্ভব হবে।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ বলেন, বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার ছিল জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও তামাক নিয়ন্ত্রণ।

তিনি বলেন, তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন প্রণয়নের পাশাপাশি তামাকপণ্যে কার্যকর কর ও মূল্য বৃদ্ধি সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আজকের মূল প্রবন্ধে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বিভিন্ন নিত্যপণ্যের দাম ২৭ থেকে ৮৯ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেলেও একই সময়ে বিভিন্ন স্তরের সিগারেটের দাম বেড়েছে মাত্র ৬ থেকে ১৫ শতাংশ। ফলে মানুষের খাদ্য ব্যয় বাড়লেও সিগারেট তুলনামূলকভাবে আরও সস্তা ও সহজলভ্য হয়ে উঠছে, যা বিশেষ করে তরুণ ও নিম্ন আয়ের মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি।

তিনি আরও বলেন, তামাক কোম্পানিগুলো দীর্ঘমেয়াদি ভোক্তা তৈরির উদ্দেশ্যে তরুণদের লক্ষ্যবস্তু করে। তিনি আশ্বাস দেন, তামাকপণ্যের মূল্য বৃদ্ধি ও কার্যকর করারোপের বিষয়টি তিনি সংসদে উত্থাপন করবেন এবং সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের সঙ্গেও আলোচনা করবেন।

সংসদ সদস্য এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, আজকের আলোচনায় উপস্থাপিত তথ্য থেকে স্পষ্ট হয়েছে, বিদ্যমান তামাক কর কাঠামোর কারণে সরকার বছরে প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের সুযোগ হারাচ্ছে।

তিনি সামাজিক আন্দোলনের পক্ষে মত দিয়ে বলেন, এ বিপুল পরিমাণ অর্থ শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, সস্তা সিগারেটের সহজলভ্যতার কারণে দেশের তরুণ সমাজ ক্রমেই তামাকে আসক্ত হয়ে পড়ছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বড় হুমকি। তিনি মনে করেন, কার্যকর তামাক করনীতি শুধু রাজস্ব বৃদ্ধির বিষয় নয়; এটি তরুণদের তামাকাসক্তি থেকে সুরক্ষা দেওয়ারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সংসদ সদস্য সুলতানা জেসমিন জুঁই বলেন, একজন নারী সংসদ সদস্য হিসেবে তিনি বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন যে, তামাকের ক্ষতি শুধু ব্যবহারকারীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব নারী, শিশু ও পুরো পরিবারের ওপর পড়ে।

তিনি বলেন, আজকের আলোচনায় উঠে এসেছে যে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশে তামাক ব্যবহারের হার সবচেয়ে বেশি এবং দেশে প্রতিবছর প্রায় ২ লাখ মানুষ তামাকজনিত রোগে অকালমৃত্যুর শিকার হয়। এ ছাড়া ২০২৪ সালে তামাকের কারণে স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা, যা এ খাত থেকে প্রাপ্ত রাজস্বের দ্বিগুণেরও বেশি। তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, কার্যকর তামাক করনীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে একই সঙ্গে ধূমপান কমানো ও রাজস্ব বৃদ্ধি সম্ভব। ফিলিপাইনে দেখা গেছে, সিন ট্যাক্স সংস্কারের মাধ্যমে সিগারেটের মূল্য বৃদ্ধি ও একক কর কাঠামো চালুর ফলে ২০১২ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে সিগারেট বিক্রি ২৮ দশমিক ১ শতাংশ কমে যায় এবং রাজস্ব তিন গুণের বেশি বৃদ্ধি পায়।

তিনি জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং নারী, শিশু ও তরুণ সমাজকে তামাকের ক্ষতি থেকে রক্ষায় সংসদে সোচ্চার ভূমিকা রাখার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন।

সেমিনারে স্বাগত বক্তব্য দেন ডর্পের প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও এএইচএম নোমান। সমাপনী বক্তব্য দেন চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নূরুল আমিন এবং সঞ্চালনা করেন উপনির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ যোবায়ের হাসান। আরও উপস্থিত ছিলেন তামাকবিরোধী যুব প্রতিনিধি নাইমা আহমেদ, ইমরান হাসানসহ আরও অনেকে।

বিইউ/এআর