images

জাতীয়

কী ঘটেছিল সিলেট সীমান্তে, কেমন আছেন সেখানকার বাসিন্দারা

ঢাকা মেইল ডেস্ক

২০ মে ২০২৬, ১১:১৫ পিএম

সিলেট সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের সঙ্গে বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড বা বিজিবির পাল্টাপাল্টি গুলির ঘটনায় উত্তেজনা তুঙ্গে। আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন ওই এলাকার বাসিন্দারা। 

এমনিতেই দেশের প্রতিটি সীমান্ত এলাকায় কথায় কথায় গুলি চালায় বিএসএফ। বাংলাদেশিদের হত্যা করা যেন তাদের কাছে ডাল-ভাত। তারই মধ্যে বিজিবি-বিএসএফের পাল্টাপাল্টি গুলির ঘটনা রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে সিলেট সীমান্তে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের। কেমন আছে তারা? 

সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার সোনারহাট সীমান্ত এলাকার বাসিন্দা হেলাল উদ্দীন বলেন, ‘আমরা এখনো ভয়ে ভয়ে আছি, যদি আবার গোলাগুলি শুরু হয়ে যায়। এই ভয়ে সীমান্তের কাছে কেউ ক্ষেত-খামারেও যাচ্ছে না।’

ওই সীমান্তে গত সোমবার বিজিবির সঙ্গে বিএসএফের পাল্টাপাল্টি গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। আকস্মিক এ ঘটনায় কেউ হতাহত না হলেও নিরাপত্তা নিয়ে এলাকাবাসীর মধ্যে বাড়তি উদ্বেগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সোনারহাট সীমান্তে থমথমে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। 

অনাকাঙ্ক্ষিত এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ওই সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বিজিবি। সেইসঙ্গে নজরদারি জোরদার করতে টহল টিমের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাহিনীর কর্মকর্তারা।

এদিকে পরিস্থিতি শান্ত রাখা ও সীমান্ত এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য পুলিশসহ স্থানীয় প্রশাসন কাজ করছে বলে জানিয়েছে গোয়াইনঘাট উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা রতন কুমার অধিকারী।

তিনি বলেন, ‘গোলাগুলির ঘটনার পর ওই এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে যে ধরনের উদ্বেগ বা ভয়ের কথা জানা যাচ্ছে, সেটা যেন না থাকে এবং তারা যেন স্বাভাবিকভাবে জীবনযাপন করতে পারেন, সে লক্ষ্যে পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।’

গত একমাসে বাংলাদেশ ও ভারত সীমান্তের বিভিন্ন জায়গায় একাধিকবার গুলির ঘটনা ঘটেছে। গত সপ্তাহে ১৪ মে রাতে লালমনিরহাটে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে একজন বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হন।

এর আগে গত ৮ মে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলায় সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে দুইজন বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যু হয়।

মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, ‘এত কম সময়ের ব্যবধানে এতগুলো গুলি ও মৃত্যুর ঘটনা খুবই উদ্বেগজনক।

কী ঘটেছিল সিলেট সীমান্তে?

বিজিবি জানিয়েছে, ওইদিন বিকেলে ভারত সীমান্ত থেকে আকস্মিকভাবেই গুলি ছুড়তে শুরু করে বিএসএফ।

সিলেটের ৪৮ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফট্যানেন্ট কর্নেল মো. নাজমুল হক এক বিবৃতিতে বলেন, ‘বিজিবি তাৎক্ষণিকভাবে কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়ে পাল্টা গুলিবর্ষণ করেছে।’

এ ঘটনায় কেউ হতাহত না হলেও গোটা এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বিজিবি দাবি করেছে, তারা তাৎক্ষণিকভাবে দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়ায় দ্রুতই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।

কর্নেল মো. নাজমুল হক জানান, ‘বর্তমানে সীমান্ত পরিস্থিতি শান্ত ও স্থিতিশীল রয়েছে।

গুলির ঘটনার পর ওই সীমান্তে টহল ও নজরদারি জোরদার করেছে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী।

কর্নেল মো. নাজমুল হক বলেন, ‘বিজিবি সীমান্তে যেকোনো উসকানিমূলক ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং দেশের সার্বভৌমত্ব ও সীমান্ত নিরাপত্তা রক্ষায় সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব ও দৃঢ়তার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে।’

সেইসঙ্গে বাসিন্দাদের কেউ যেন অবৈধভাবে সীমান্ত পারাপার এবং বেআইনি কোনো কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত না হয়, সেজন্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়ে জনসচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা চালানো হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন এই কর্মকর্তা।

এদিকে সোনারহাট সীমান্তে হঠাৎ করে গুলি ছোঁড়ার ঘটনাটির বিষয়ে বিএসএফের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিজিবি কর্মকর্তারা। তবে বিষয়টি নিয়ে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে কি না, সেটা জানানো হয়নি।

উদ্বিগ্ন এলাকাবাসী

বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে গোলাগুলির ঘটনার পর একদিন পার হলেও এখনো স্বাভাবিক হয়নি সীমান্ত এলাকার পরিস্থিতি।

সোনারহাট সীমান্ত এলাকার বাসিন্দা হেলাল উদ্দীন জানান, চারিদিকে থমথমে ভাব। বিজিবি বলেছে, আপাতত সীমানার কাছে না যাইতে। সেজন্য কৃষক ও শ্রমিকরা সীমান্তের কাছাকাছি এলাকায় কোনো কাজে যেতে পারছেন না। কে কাজ করতে যাবে? জানের মায়া তো সবারই আছে।’

বস্তুত ভারতীয় সীমান্তের কাছে যেসব বাংলাদেশি নাগরিকদের বসবাস, গুলিতে প্রাণহানির ঘটনা তাদের কাছে মোটেও নতুন কিছু নয়। প্রতি বছরই বিএসএফের গুলি ও নির্যাতনে অসংখ্য বাংলাদেশি নাগরিক প্রাণ হারান।

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসেবে, ২০২৫ সালে ভারতীয় সীমান্তের হাতে অন্তত ৩৪ বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ২৪ জনের মৃত্যু হয়েছে বিএসএফের গুলিতে, বাকিরা মারা গেছেন শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়ে। একই সময়ে কমপক্ষে ৩৮ জন বাংলাদেশি নাগরিক গুলিবিদ্ধ বা শারীরিকভাবে আহত হয়েছেন।

দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা সীমান্তের এসব হত্যা বন্ধে ভারত সরকারের প্রতি বিভিন্ন সময় আহ্বান জানিয়েছেন। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকেই এ নিয়ে দফায় দফায় ভারতের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে।

বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর গত এপ্রিলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এবং প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির যখন ভারতে গিয়েছিলেন, সেসময়ও এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছিল বলে জানান কর্মকর্তারা।

মানবাধিকার কর্মী লিটন বলেন, প্রতিবারই ভারত সীমান্ত হত্যা বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে সেটার প্রতিফলন দেখা যায়নি। বরং সাম্প্রতিক সময় সীমান্ত হত্যার সঙ্গে একাধিক পুশ-ইনের ঘটনাও ঘটতে দেখা গেছে।

সীমান্তে উত্তেজনা বাড়ছে?

সীমান্ত হত্যা নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের টানাপোড়েন দীর্ঘদিনের। এটার সঙ্গে সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে বিএসএফ কর্তৃক জোরপূর্বক বাংলাদেশ সীমান্তে মানুষ ঢুকিয়ে দেওয়ার ঘটনা, যা ‘পুশ-ইন’ নামে পরিচিত।

ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা নিজেই গত জানুয়ারিতে জানিয়েছেন, গত বছর ভারতে বসবাসকারী প্রায় দুই হাজার ব্যক্তিকে তারা বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিয়েছেন। সে রাজ্যের বিদেশি ট্রাইব্যুনাল কাউকে বিদেশি বলে চিহ্নিত করার এক সপ্তাহের মধ্যেই তাকে ‘পুশ-ব্যাক’ করা হবে বলেও জানান তিনি।

এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পালাবাদল ঘটেছে। সেখানে বিজেপি সরকারের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ক্ষমতা নিয়েই ঘোষণা দিয়েছেন, বাংলাদেশের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের যতটুকু সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নেই, সেখানে নতুন করে বেড়া দেওয়া হবে।

এ লক্ষ্যে দেড় মাসের মধ্য বিএসএফকে জমি হস্তান্তরের সিদ্ধান্তও নিয়েছেন শুভেন্দু। সেইসঙ্গে বিজেপি সরকার সীমান্তে কুমির ও সাপ ছাড়ার পরিকল্পনাও করছে বলেও জানা যাচ্ছে।

এছাড়া পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনের আগে বিতর্কিত এসআইআর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সেখানকার ভোটার তালিকা থেকে যে ৯১ লাখ মানুষের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, তাদের প্রায় সবাই বাংলাদেশি বলে দাবি করে আসছে বিজেপির সংসদ সদস্যরা।

মানবাধিকার কর্মী লিটন বলেন, ‘ফলে একটা আশঙ্কা রয়েছে যে, পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকার ওই বিপুল সংখ্যক মানুষকে আসামের মতো একই প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ সীমান্তে পুশ-ইন করার চেষ্টা চালাতে পারে।’

এদিকে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় বসার পর সীমান্তে একের পর এক হত্যার ঘটনা ঘটছে। আসকের হিসেবে, গত জানুয়ারি মাস থেকে এখন পর্যন্ত বিএসএফের গুলিতে কমপক্ষে সাতজন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে তিনজনকেই গুলি করে হত্যা করা হয়েছে গত দেড় সপ্তাহে, পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনের পর।’

সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে সম্প্রতি আলোচনা হওয়ার পরও সীমান্তে গোলাগুলি ও মৃত্যুর ঘটনা না থামায় বাংলাদেশে উদ্বেগ বাড়ছে।

মানবাধিকার কর্মী লিটন বলেন, ‘ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা চালানোর পরও যেহেতু সীমান্ত হত্যা থামছে না, সেজন্য এখন বাংলাদেশ সরকারের উচিত এই সমস্যা সমাধানে জাতিসংঘের সহযোগিতা চাওয়া।’

বিষয়টি নিয়ে স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করেও কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সীমান্ত হত্যাসহ অন্যান্য সমস্যার সমাধানে ভারতের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রেখেছে সরকার। সূত্র: বিবিসি বাংলা

এএইচ