মহিউদ্দিন রাব্বানি
১৩ মে ২০২৬, ০৯:৪৯ পিএম
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জ্বালানি সংকটে নাজেহাল গোটা বিশ্বই। দেশেও গত কয়েক মাস ধরে জ্বালানি সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে এই সংকট মোকাবেলায় হিমশিম খাচ্ছে। নানা উদ্যোগ ও তৎপরতায় পরিস্থিতি আপাতত সামাল দেওয়া গেলেও জ্বালানি সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের কথা ভাবছে সরকার। এজন্য বড় ধরনের কৌশলগত পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হচ্ছে। সরকার চায় জ্বালানির আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে আনতে। এজন্য নিজস্ব তেল-গ্যাস উত্তোলনের যাবতীয় সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এতে শিগগির সরকারের কৌশলগত পরিকল্পনার সফলতা দৃশ্যমান হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, দেশের একমাত্র সরকারি তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসির সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তাকে আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে সরকার। ২০২৯ সাল নাগাদ দ্বিতীয় ইউনিটের কার্যক্রম পরীক্ষামূলকভাবে চালু হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আগামী তিন থেকে চার মাসের মধ্যেই দেশের জ্বালানি খাতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। সরকার স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে এবং এর বাস্তবায়ন শিগগিরই জনগণের সামনে দৃশ্যমান হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সম্ভাব্য সংকট মোকাবেলায় শুধু বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) বা ইস্টার্ন রিফাইনারির ওপর নির্ভর না করে এবার বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর নিজস্ব ডিপো ব্যবহার করেই জ্বালানি তেলের মজুত সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য, অন্তত তিন মাসের সমপরিমাণ জ্বালানি মজুত নিশ্চিত করে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালী করা।
মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ইতোমধ্যে পিডিবি ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। কেন্দ্রভিত্তিক মজুত সক্ষমতা ও চাহিদার তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। বর্তমানে বিপিসি ও ইস্টার্ন রিফাইনারির যৌথ মজুত সক্ষমতা প্রায় ১৫ লাখ টন, যা দিয়ে ৪৫ দিনের চাহিদা পূরণ সম্ভব। সরকার এটি ৬০ দিনের বেশি এবং পরবর্তী সময়ে তিন মাসে উন্নীত করতে চায়।
বর্তমানে পদ্মা অয়েলের মজুত সক্ষমতা ৩ লাখ ৮০ হাজার টন, মেঘনা অয়েলের ২ লাখ ৪৬ হাজার টন এবং যমুনা অয়েলের ২ লাখ ২৭ হাজার টন। ইস্টার্ন রিফাইনারির সক্ষমতা রয়েছে ৫ লাখ ২ হাজার টনের বেশি। পাশাপাশি বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিজস্ব ডিপো ব্যবহার করা হলে অতিরিক্ত ৬ লাখ ৫৬ হাজার মেট্রিক টন জ্বালানি সংরক্ষণ সম্ভব হবে বলে মনে করছে সরকার।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, নিয়মিত আমদানির বাইরে অতিরিক্ত তেল এনে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ডিপোতে সংরক্ষণ করা হবে। এতে বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি হলেও বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হবে না এবং লোডশেডিং নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হবে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, দীর্ঘদিন দেশীয় সম্পদকে অবহেলা করে আমদানিনির্ভর ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল। এখন সরকার দেশীয় গ্যাস, তেল ও কয়লার ব্যবহার বাড়াতে চায়। নিজেদের জ্বালানি থাকতে আমরা বিদেশ থেকে কেন আমদানি করব? দেশের সম্পদ দেশের উন্নয়নে ব্যবহার করতেই হবে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা ছাড়া অর্থনীতিতে গতি আনা সম্ভব নয়। তাই তেল, গ্যাসসহ জ্বালানির অন্তত তিন মাসের মজুত নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনের চেয়ে সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতাই এখন বড় সমস্যা।
এদিকে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেন, জ্বালানি সংকট সমাধান ছাড়া বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরবে না। তিনি মনে করেন, বিনিয়োগ বাড়াতে হলে জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্য করতে হবে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরাও সরকারের পরিকল্পনাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। বি-আর পাওয়ারজেন লিমিটেডের প্রধান প্রকৌশলী আবদুল্লাহ আল মাহমুদ বলেন, অতিরিক্ত মজুত সক্ষমতা থাকলে সংকটকালেও বিদ্যুৎ উৎপাদন সচল রাখা সহজ হবে।
রুরাল পাওয়ার কোম্পানির নির্বাহী পরিচালক রেজাউল কবীরও এটিকে জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ বলে উল্লেখ করেন।
ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম অভিযোগ করেছেন, জ্বালানি খাতে কাঠামোগত দুর্নীতি ও লুণ্ঠনের সংস্কৃতি এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। তিনি জ্বালানি খাতকে আবার ‘সেবাখাত’ হিসেবে পরিচালনার এবং জ্বালানি অপরাধীদের দ্রুত বিচারের আহ্বান জানিয়েছেন।
এদিকে দেশীয় জ্বালানির জোগানও কমে আসছে। হবিগঞ্জের রশিদপুর কনডেনসেট ফ্র্যাকশনেশন প্ল্যান্টে আগে যেখানে দৈনিক সাড়ে ১০ হাজার ব্যারেল কনডেনসেট পাওয়া যেত, এখন তা নেমে এসেছে প্রায় ৬ হাজার ২০০ ব্যারেলে। গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় অকটেন ও পেট্রোল উৎপাদনেও চাপ তৈরি হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়ন ও কূপ খননের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।
সাম্প্রতিক তেল সংকটের পর বাজারে সরবরাহ বাড়ানোয় ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইন কমে গেছে। বিপিসি জানিয়েছে, ডিজেল, অকটেন ও পেট্রলের সরবরাহ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হয়েছে। সরকারের নজরদারি, ফুয়েল পাস ব্যবস্থা, অবৈধ মজুতবিরোধী অভিযান এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতির কারণে বাজার এখন অনেকটাই স্বাভাবিক।
জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত ঢাকা মেইলকে বলেন, আগামী তিন থেকে চার মাসের মধ্যেই দেশের জ্বালানি খাতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে। সরকার স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে এবং এর বাস্তবায়ন শিগগিরই জনগণের সামনে দৃশ্যমান হবে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার বেশ কিছু বড় উদ্যোগ হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে ইস্টার্ন রিফাইনারির সম্প্রসারণ কাজ অন্যতম। ইস্টার্ন রিফাইনারির কাজ হাতে নেওয়া সরকারের একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ বলে মনে করেন তিনি।
অমিত বলেন, ভারত প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ তেল মজুত করার সক্ষমতা অর্জন করেছে। অতীতে বাংলাদেশের জ্বালানি খাত অতিমাত্রায় ভারতনির্ভর হয়ে উঠেছিল। তিনি বলেন, আঞ্চলিক সম্পর্কের অবনতি হলে জ্বালানি সরবরাহেও ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই সরকার আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে।
প্রতিমন্ত্রী জানান, দ্বিতীয় রিফাইনারির দ্বিতীয় প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হবে এবং জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ আরও বাড়ানো হবে। পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে, কারণ দেশের নিজস্ব গ্যাসের মজুত ধীরে ধীরে কমে আসছে।
অমিত বলেন, নতুন গ্যাস কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে স্থানীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়িয়ে জ্বালানি ঘাটতি মোকাবেলা করা যায়। বাপেক্সকে আরও সক্রিয় করা হচ্ছে এবং প্রায় ৮০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলনের লক্ষ্যে কাজ চলছে।
এলপিজির ঘাটতি মোকাবেলায় সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতার প্রভাব মোকাবেলায় সরকার সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়াতে সরকার ইতোমধ্যে নীতিমালা প্রণয়ন করেছে এবং সোলারনির্ভর জ্বালানিব্যবস্থাকে সম্প্রসারণে কাজ চলছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী বলেন, জ্বালানি খাতে কারিগরি ত্রুটি দূর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তেল সংকট, কালোবাজারি ও পাচার রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সজাগ রাখা হয়েছে বলেও জানান তিনি।সরকার ধীরে ধীরে ভর্তুকি কমিয়ে টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থাপনার দিকে এগোতে চায় বলেও জানান অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
এমআর/জেবি