মহিউদ্দিন রাব্বানি
১৩ মে ২০২৬, ০৬:৩২ পিএম
মৌসুম পুরোপুরি শুরুর হওয়ার আগেই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে দেখা মিলছে আম ও লিচুর। দোকানভর্তি টকটকে হলুদ আম আর লালচে লিচু দেখে অনেকেরই যেন তর সইছে না। কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্নকথা। মূলত গ্রীষ্মের লোভনীয় ফল আম ও লিচুর পুরোপুরি সময় এখনো হয়নি। ফলে বর্তমানে বাজারে পাওয়া যাওয়া ফল দুটির বেশির ভাগই অপরিপক্ব। এসব ফল চড়া দামে কিনে একদিকে ক্রেতারা ঠকছেন অন্যদিকে এতে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির সৃষ্টি হচ্ছে।
প্রশাসনের প্রকাশিত ‘ম্যাঙ্গো ক্যালেন্ডার’ অনুযায়ী বর্তমানে মূলত সাতক্ষীরার কিছু স্থানীয় জাতের আম বাজারে থাকার কথা। অথচ ঢাকার বাজারে এখনই বিক্রি হচ্ছে হিমসাগর, ল্যাংড়া, আম্রপালি ও বিভিন্ন উন্নত জাতের আম। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এর বড় অংশই অপরিপক্ব অবস্থায় গাছ থেকে নামিয়ে কেমিক্যাল দিয়ে পাকিয়ে বাজারে ছাড়া হচ্ছে।
লিচুর পুরোপুরি সময়ও এখনো আসেনি। বিশেষ করে দিনাজপুর ও পাবনার লিচু আসবে আরও কয়েক দিন পর। এর আগেই বাজারে নানা জাতের লিচু পাওয়া যাচ্ছে। এসবের বেশির ভাগই অপরিপক্ক।
রাজধানীর কারওয়ান বাজার, যাত্রাবাড়ী, নয়াবাজার ও মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট ঘুরে দেখা গেছে, মে মাসের শুরুতেই গোপালভোগ, হিমসাগর, ল্যাংড়া, গোলাপখাস ও বিভিন্ন জাতের আম বিক্রি হচ্ছে। অনেক দোকানে দাবি করা হচ্ছে, এসব আম রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের। তবে কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, ম্যাঙ্গো ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ওই অঞ্চলের অধিকাংশ আম এখনো পরিপক্ব হওয়ার সময় পায়নি।
চলতি মৌসুমে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসন ৫ মে থেকে গোপালভোগ, গোবিন্দভোগ, গোলাপখাস, বৈশাখী ও বোম্বাই জাতের আম সংগ্রহের অনুমতি দেয়। একই ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ১৫ মে থেকে হিমসাগর ও খিরসা, ২৭ মে থেকে ল্যাংড়া এবং ৫ জুন থেকে আম্রপালি সংগ্রহের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।
সাতক্ষীরার আম ব্যবসায়ী ইয়াহিয়া হাসান ঢাকা মেইলকে মুঠোফোনে বলেন, চলতি মৌসুমে সাতক্ষীরায় আমের বাম্পার ফলন হয়েছে। জেলা প্রশাসনের ঘোষিত ম্যাঙ্গো ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ৫ মে থেকে বাজারে আম সরবরাহ শুরু হয়েছে। বর্তমানে গাছ থেকে মূলত গোপালভোগ ও গোবিন্দভোগ জাতের আম সংগ্রহ করা হচ্ছে। এর মধ্যে গোপালভোগের তুলনায় গোবিন্দভোগের উৎপাদন বেশি হয়েছে। প্রতিদিন সাতক্ষীরা থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আম সরবরাহ করা হচ্ছে।
তবে তিনি অভিযোগ করেন, ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরের বাজার এখন অপরিপক্ক আমে সয়লাব। এতে সাতক্ষীরার আমেরও বদনাম হচ্ছে। কারণ মৌসুমের শুরুতে ম্যাঙ্গো ক্যালেন্ডার অনুযায়ী মূলত সাতক্ষীরার আমই বাজারে থাকার কথা। কিন্তু দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে কাঁচা আম সংগ্রহ করে কেমিক্যাল মিশিয়ে পাকিয়ে বাজারে ছাড়া হচ্ছে। এতে একদিকে ভোক্তারা প্রতারিত হচ্ছেন, অন্যদিকে জনস্বাস্থ্যের জন্যও মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
রাজশাহীর জেলা প্রশাসনের ঘোষিত ম্যাঙ্গো ক্যালেন্ডার অনুযায়ী গোপালভোগ বাজারে আসার সময় ২২ মে, হিমসাগর বা ক্ষিরসাপাত ৩০ মে এবং ল্যাংড়া ১০ জুন। নওগাঁয় গোপালভোগ ৩০ মে, হিমসাগর ২ জুন এবং ল্যাংড়া ১০ জুন থেকে সংগ্রহের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। চুয়াডাঙ্গাতেও ২০ মে থেকে হিমসাগর ও ২৫ মে থেকে ল্যাংড়া সংগ্রহের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।
এরপরও রাজধানীর বাজারে এখনই এসব জাতের আমের উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন ভোক্তা ও বিশেষজ্ঞরা।
যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা রবিউল ইসলাম বলেন, সুন্দর কালার দেখে পরিবার পরিজনের জন্য আম কিনেছিলাম। বাসায় কেটে দেখি ভেতরে কাঁচা। রাতে বাচ্চার পেটব্যথা শুরু হয়। পরে বুঝেছি, আমটা স্বাভাবিকভাবে পাকেনি।
পল্টন এলাকার এক ক্রেতা বলেন, জানি এখনকার আম ভালো হওয়ার কথা না, তারপরও লোভ সামলাতে পারিনি। কেজি ২৫০ টাকা দিয়েও ভালো আম পেলাম না।
বাজারে খুচরা পর্যায়ে বর্তমানে আগাম আম ১৯০ থেকে ৩০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। লিচুর ছড়া বিক্রি হচ্ছে ৪৫০ থেকে ৯০০ টাকায়।
আরও পড়ুন
যেভাবে বাজার দখল করল সাতক্ষীরার আম
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, মৌসুমের শুরুতে বেশি দামে বিক্রির সুযোগ নিতে একশ্রেণির ব্যবসায়ী অপরিপক্ব ফল সংগ্রহ করছেন। পরে ক্যালসিয়াম কার্বাইড, ইথোফেন ও বিভিন্ন রাইপেনিং কেমিক্যাল ব্যবহার করে দ্রুত পাকিয়ে বাজারজাত করা হচ্ছে।
গত ২৯ এপ্রিল সাতক্ষীরা সদর থানা পুলিশ কেমিক্যাল ও কার্বাইড দিয়ে পাকানো প্রায় ৯ হাজার কেজি অপরিপক্ব আম জব্দ করে। চট্টগ্রামগামী একটি ট্রাক থেকে ৩৫১ ক্যারেট আম উদ্ধার করা হয়, যেগুলো রাসায়নিক ব্যবহার করে পাকানো হয়েছিল বলে জানায় পুলিশ।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতিটি ফলের নির্দিষ্ট পরিপক্বতার সময় রয়েছে। তার আগে ফল সংগ্রহ করলে ভেতরে স্বাভাবিক শাঁস তৈরি হয় না। ফলে বাইরে পাকা দেখালেও ফলের গুণগত মান ঠিক থাকে না।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, অতিরিক্ত চকচকে, অস্বাভাবিক উজ্জ্বল বা গন্ধহীন ফল কেনা থেকে সতর্ক থাকতে হবে। ফল কেনার পর কিছু সময় পানিতে ভিজিয়ে রেখে ভালোভাবে ধুয়ে খাওয়ার পরামর্শও দিয়েছেন তারা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু অভিযান নয়, চাষি, আড়তদার, ব্যবসায়ী ও ভোক্তা—সবার মধ্যে সচেতনতা তৈরি না হলে অপরিপক্ব ও কেমিক্যালযুক্ত ফলের দৌরাত্ম্য বন্ধ হবে না।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. শামসুল আমিন ঢাকা মেইলকে বলেন, বিষাক্ত কেমিক্যাল ব্যবহার করে অপরিপক্ক ফল পাকায় কিছু ব্যবসায়ী। এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। প্রাথমিকভাবে বমি, ডারিয়ার সমস্যা হলেও দীর্ঘমেয়াদী লিভার ও কিডনির ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি এটি ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়ায়।
এই বিশেষজ্ঞ বলেন, অপরিপক্ব লিচু বিশেষ করে শিশুদের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। খালি পেটে এসব লিচু খেলে রক্তে গ্লুকোজ কমে গিয়ে মস্তিষ্কে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার ঢাকা মেইলকে বলেন, নিরাপদ ও বিষমুক্ত ফল নিশ্চিত করতে বছরের বিভিন্ন সময় আমচাষিদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হয়। প্রশিক্ষণ ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে চাষিদের ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।
আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, অপরিপক্ক ফল বাজারজাত করা কিংবা ফলে ক্ষতিকর কেমিক্যাল ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়। পাশাপাশি মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে দায়ীদের শাস্তির আওতায় আনা হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, বাজারে নিরাপদ ফল নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে নিয়মিত তদারকি ও অভিযান চালানো হচ্ছে।
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন বলেন, মৌসুমি ফল বাজারে আসার আগেই একটি অসাধু চক্র সক্রিয় হয়ে পড়ে। দ্রুত লাভের আশায় তারা অপরিপক্ক ফল বিভিন্ন রাসায়নিক ব্যবহার করে কৃত্রিমভাবে পাকিয়ে বাজারজাত করে থাকে। বাইরে থেকে ফলগুলো আকর্ষণীয় ও পাকা মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে সেগুলো খাওয়ার উপযোগী হয়ে ওঠে না।
নাজের হোসাইন বলেন, অতীতেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে কেমিক্যাল মিশিয়ে পাকানো বিপুল পরিমাণ ফল জব্দ ও ধ্বংস করার ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু এরপরও অসাধু ব্যবসায়ীদের তৎপরতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। তাই শুধু অভিযান চালালেই হবে না, বাজার তদারকি আরও জোরদারের পাশাপাশি ভোক্তাদের মধ্যেও সচেতনতা বাড়াতে হবে।
এমআর/জেবি