জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
১২ মে ২০২৬, ০৯:২১ পিএম
প্রায় তিন যুগ পর মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেখানে একাধিক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন তিনি। প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) আয়োজিত দিনব্যাপী কর্মশালায় যোগ দেন। পরে অধ্যাপক মুজাফফর আহমদ চৌধুরী মিলনায়তনে শিক্ষার্থীদের মুখোমুখি হন সরকারপ্রধান।
১৭ জন শিক্ষার্থী সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনা ও উদ্যোগ সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রশ্ন করেন। তবে সিনেট ভবনের অনুষ্ঠান শেষে হেঁটে অনুষ্ঠানস্থলে গেলেও প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছে ছিল হেঁটে ক্যাম্পাস দেখার। কিন্তু নিরাপত্তার কড়াকড়ি, শিক্ষার্থী ও ছাত্রদল নেতাকর্মীদের উপচেপড়া ভিড়ের কারণে তা আর হয়ে ওঠেনি। তবে বিদায়বেলায় শিক্ষার্থীদের কাছে আরেকবার আসবেন বলে জানিয়ে গেছেন তারেক রহমান।
বক্তব্যের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী ৩৫ বছর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘মনে হচ্ছে প্রায় ৩৫ বছর আগে ফিরে গেছি। ইউজিসির প্রোগ্রামটা শেষ করার পরে আমাকে ওখানে জিজ্ঞেস করলেন যে, আমি গাড়িতে যাব না হেঁটে। এত বছর পরে সেই ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে এসে আমার খুব ইচ্ছা ছিল হেঁটে একটু দেখতে দেখতে আসব। কিন্তু সেই সৌভাগ্য হয়নি। বুঝতেই পারছেন কেন। ইনশাল্লাহ আরেকবার আসতে হবে।’
অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদের ১৫৬ জন শিক্ষার্থী অংশ নেন। তাদের মধ্যে ১৭ জন শিক্ষার্থীর বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন প্রধানমন্ত্রী।
একজন শিক্ষার্থীর প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান বলেন, ‘আপনারা মনে করছেন দেশে অনেক কিছু হওয়া উচিত। ধীরে ধীরে সবকিছু গড়ে তুলতে হলে দেশে একটি স্থিতিশীল পরিবেশ প্রয়োজন। আমরা যদি তা না পারি, তাহলে কোনো উন্নয়নই টেকসই হবে না। একবার কিছু তৈরি হবে, আবার তা ভেঙে পড়বে। তাই দেশে স্থিতিশীল পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।’
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পক্ষে জনমত গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সোশ্যাল মিডিয়াসহ সব মাধ্যমে জনমত তৈরি করতে হবে। দেশে এখন স্থিতিশীলতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। রাজনীতি সংসদে হওয়া উচিত। শুধু রাজপথে হৈচৈ করে কিছু গড়ে তোলা যায় না। কিছু গড়ে তোলার জন্য দেশে স্থিতিশীলতা লাগবে। কোনো কিছু গড়ে তোলার জন্য বসে আলোচনা করতে হবে। কোনো কিছু গড়ে তোলার জন্য চিন্তা করে কাজে হাত দিতে হয়। এই সহযোগিতা আপনাদের করতে হবে। কারণ, আপনারাই ভবিষ্যৎ। কাজেই আপনাদের শক্ত হতে হবে, প্রতিবাদ করতে হবে।’
প্রধানমন্ত্রী শিক্ষার্থীদের বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি তৃতীয় একটি ভাষা শেখারও পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, এতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ আরও বাড়বে।
সাংস্কৃতিক পরিবেশ গড়ে তোলার বিষয়ে একজন শিক্ষার্থীর প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সাংস্কৃতিক চর্চা ছাড়া কোনো জাতি এগিয়ে যেতে পারে না।
প্রধানমন্ত্রী জানান, সরকার স্কুল পর্যায়ে ৪ থেকে ১২ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের জন্য তৃতীয় ভাষা শিক্ষার ব্যবস্থা করছে। ইতোমধ্যে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ চালু হয়েছে এবং সংগীত শিক্ষার ব্যবস্থাও রাখা হবে। এসব উদ্যোগের সুফল ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হবে এবং পূর্ণ সুফল পেতে ১০ থেকে ১২ বছর লাগতে পারে।
মতবিনিময় সভায় আরেক শিক্ষার্থীর প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পে বালিশ কেনা নিয়ে আলোচিত দুর্নীতির প্রসঙ্গও তুলে ধরেন। একটি বালিশের দাম ৮০ হাজার টাকা হওয়া নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এত দামের বালিশে আদৌ ঘুম হবে কি?’
এ সময় তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার এবং মেগা প্রকল্পের নামে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরেন।
দেশের জাদুঘরগুলোর অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আমাদের অনেকগুলো জাদুঘর আছে। আমি আগে গিয়েছি, এবার আসার পর (লন্ডন থেকে ফিরে) সুযোগ হয়নি। আমার কাছে অনেক সময় বেশ খারাপ লেগেছে, মনে হয় যে এতিমের মতো পড়ে আছে। আমাদের অনেক কিউরেটর দরকার। এর মধ্যে একটা উদ্যোগ নিয়েছি। ইতোমধ্যে একটার কাজ শুরু করেছেন শিক্ষামন্ত্রী, অন্যটা বোধহয় সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে। এর মধ্যে মন্ত্রী এবং সচিবের সঙ্গে আমি বসেছি; উনারা কাজ শুরু করবেন।’
সরকারের একটি উদ্যোগের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা স্কুলের বাচ্চাদের সংসদে নিয়ে যাচ্ছি, তারা দেখবে। এটা আমি এই জন্য বলছি, আমার অভিজ্ঞতা ছিল ব্রিটিশ পার্লামেন্ট দেখার। ওদের ওখানে গাইডেড ট্যুর সিস্টেম আছে। আপনি টিকিট কেটে যেতে পারেন, পুরো পার্লামেন্ট দেখাবে, ওটার ইতিহাস বলবে, ঐতিহ্য বলবে। ব্যাপারটা আমার কাছে খুব ভালো লেগেছিল এবং যেদিন আমি দেখেছিলাম, সেদিন চিন্তা করেছিলাম, যদি ইনশাল্লাহ কোনোদিন সুযোগ হয়, তাহলে আমি এই ব্যবস্থাটা আমার দেশের বাচ্চাদের জন্য করার চেষ্টা করব।’
এ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দলের আহ্বায়ক অধ্যাপক মোর্শেদ হাসান খানসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী এবং ছাত্রদলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
বিইউ/ক.ম