images

জাতীয়

আতঙ্কে বিতর্কিত এসপিরা

মোস্তফা ইমরুল কায়েস

১২ মে ২০২৬, ০৮:০৭ পিএম

  • সম্প্রতি ১৬ জনকে বাধ্যতামূলক অবসর
  • ফেনী ও পঞ্চগড়ের এসপিকে প্রত্যাহার
  • ডিএমপিতে কর্মরত বিতর্কিতরাও ভয়ে আছেন

পুলিশ সপ্তাহ চলমান। এর মধ্যেই দুই জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) যোগদানের আগেই প্রত্যাহার হয়েছেন। একই সময়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতন ১৬ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোয় বাহিনীর ভেতরে উদ্বেগ-আতঙ্ক তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

বিশেষ করে যেসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অতীতে বিভিন্ন সময়ে বিতর্ক উঠেছিল, তাদের মধ্যে আতঙ্ক বেশি বলে জানিয়েছেন একাধিক পুলিশ সদস্য।

জানা গেছে, ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে পুলিশে প্রত্যাহার ও বাধ্যতামূলক অবসরের প্রবণতা নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক ট্যাগ, অভিযোগ কিংবা শৃঙ্খলাজনিত কারণ দেখিয়ে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। ফলে বাহিনীর ভেতরে পদায়ন ও পদোন্নতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

সোমবার ফেনী ও পঞ্চগড়ের এসপিকে প্রত্যাহারের ঘটনায় এই উদ্বেগ আরও বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে চট্টগ্রামে কর্মরত ফেনীর এসপি হিসেবে নিয়োগ পেয়েও প্রত্যাহারের শিকার হওয়া, বর্তমানে পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত মাহবুব আলম খানের সঙ্গে ঢাকা মেইলের কথা হয়। তিনি বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে, সব মিথ্যা। আমি এসবের জবাব দিয়েছি। আমি বর্তমানে চট্টগ্রাম থেকে পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত আছি। আমাকে বঞ্চিত করা হয়েছে। যে দুটি মামলা করা হয়েছিল, সেগুলো মিথ্যা মামলা। মূলত আমার পদোন্নতি থামানোর জন্য এসব করা হয়েছে।’

অন্যদিকে পঞ্চগড়ের এসপি হিসেবে যোগ দেওয়ার পর প্রত্যাহার হওয়া মিজানুর রহমান এখন ওই জেলা থেকে পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত আছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারিতে মিজানুর রহমানকে দিনাজপুর জেলার পুলিশ সুপার হিসেবে পদায়নের জন্য তৎকালীন এমপি আবুল হাসান মাহমুদ আলী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে সুপারিশ করেছিলেন। সে সময় তিনি রাজশাহী রিজিয়নের ট্যুরিস্ট পুলিশের এসপি হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

sp
ফেনীর এসপি মোহাম্মদ মাহবুব আলম খান ও পঞ্চগড়ের এসপি মো. মিজানুর রহমানকে প্রত্যাহার। ফাইল ছবি

সুপারিশপত্রে ওই এমপি লিখেছিলেন, আমি তাকে ব্যক্তিগতভাবে চিনি ও জানি। তিনি পূর্বে দিনাজপুর জেলায় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাকে দিনাজপুর জেলার পুলিশ সুপার হিসেবে জরুরিভিত্তিতে বদলি প্রদানের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ করছি। পরে তাকে দিনাজপুরে এসপি পদে পদায়নও করা হয়।

পুলিশ সদর দপ্তর ও ডিএমপির কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যারা বিগত সরকারের সময়ে বিভিন্ন জেলায় এসপি হিসেবে ছিলেন, তাদের মধ্যে আতঙ্ক বেশি। এছাড়া বিভিন্ন বিভাগে ডিআইজি পদে থাকা কর্মকর্তারাও আতঙ্কে আছেন। কখন কার ফাইল ধরে টান দেয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়—এ নিয়ে চলছে উদ্বেগ। এ কারণে অনেকে পদোন্নতির জন্য লবিংও কমিয়ে দিয়েছেন। বিশেষ করে ৫ আগস্টের আগে ডিএমপিতে কর্মরত অনেকেই এখন ঢাকায় বা জেলায় পোস্টিংয়ে থাকলেও সবসময়ই উদ্বেগে আছেন।

এসপি প্রত্যাহার আতঙ্ক

পঞ্চগড় ও ফেনী ছাড়াও এর আগে ২০২৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগ ওঠার পর সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার এএফএম আনোয়ার হোসেন খানকে প্রত্যাহার করা হয়। একই সময়ে গণঅধিকার পরিষদের এক নেতার সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগও ওঠে তার বিরুদ্ধে।

এছাড়া ২০২৫ সালের ৩ আগস্ট সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের দেশত্যাগ ঘিরে বিতর্কের পর কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হাছান চৌধুরী প্রত্যাহার হন। ওই সময় তার বিরুদ্ধে দায়ের করা একটি মামলা থাকায় বিদেশযাত্রা অনুমতি নিয়ে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। এ ঘটনায় আরও কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তাকেও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

অন্যদিকে ২০২৫ সালে ইয়াবা চালান জব্দ ও বিক্রির টাকা ভাগাভাগির অভিযোগে কক্সবাজারের পুলিশ সুপার মুহাম্মদ রহমত উল্লাহকে প্রত্যাহার করা হয়। একটি জাতীয় দৈনিকে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিষয়টি ব্যাপক আলোচনায় আসে।

এর আগে একই বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি একযোগে কক্সবাজার, যশোর, নীলফামারী ও সুনামগঞ্জ জেলার পুলিশ সুপারদের প্রত্যাহার করা হয়। পরে তাদের পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়।

আরও পড়ুন: ফেনী ও পঞ্চগড়ের আলোচিত দুই এসপি প্রত্যাহার

সোমবার এক এসপি বলেন, আমরা এখন আতঙ্কে আছি ভাই। কখন কাকে সকালে পদোন্নতি দেয়, আবার বিকেলে প্রত্যাহার করে। এভাবে চলতে থাকলে কেউ আর পদোন্নতি চাইবে না।

আরেক এসপি বলেন, ৫ আগস্টের পর যারা ঢাকার বাইরে পোস্টিং পেয়েছিলাম, তাদের অনেকেই এখন ডিএমপির বিভিন্ন জোনে দায়িত্ব পালন করছি। কিন্তু ভয় কাজ করে সারাক্ষণ—কখন কোন ট্যাগ দিয়ে চাকরি থেকে বাদ দেওয়া হয়।

ডিবিতে কাজ করা একজন ডিসি বলেন, দোয়া রাখেন ভাই, কতদিন এভাবে চাকরি করতে পারব জানি না। ঢাকায় থাকলেও এখন কেউ সরব হয় না। সবাই সতর্ক। ডিএমপিতে এমন কয়েকশ কর্মকর্তা আতঙ্কে আছেন।

বাধ্যতামূলক অবসরের আতঙ্ক

সম্প্রতি পুলিশের ডিআইজি পদমর্যাদার ১৬ জনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর পর প্রশাসনজুড়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। যদিও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি ও শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা—এসবই মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত কার্যক্রম।

তিনি আরও বলেন, এসব সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা নেই; প্রয়োজন ও পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রশাসনিক কার্যক্রম চলমান থাকে। বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে কি না—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এসব মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ বিষয়। যথাযথ প্রক্রিয়ায় যাচাই-বাছাই করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কারও প্রতি অবিচার না হওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।

আরও পড়ুন: পুলিশের ডিসিপ্লিন রক্ষায় কোনো আপস নয়: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

অবসরে পাঠানো কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন বিভিন্ন ইউনিট ও সংস্থার ডিআইজি পর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তা। একই আদেশে কয়েকজন পুলিশ সুপার ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকেও অবসরে পাঠানো হয়েছে।

এর আগে ২০২৫ সালের মার্চে একযোগে পাঁচজন অতিরিক্ত আইজিপিকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। একইভাবে বিভিন্ন সময়ে একাধিক ডিআইজি ও অতিরিক্ত ডিআইজিকেও অবসরে পাঠানো হয়েছে।

এ বিষয়ে পুলিশের অতিরিক্ত আইজি একেএম আওলাদ হোসেনকে পাওয়া যায়নি। তিনি পুলিশ সপ্তাহের সভায় ব্যস্ত ছিলেন। পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি রায়হান উদ্দিন খানকে ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

এমআইকে/এআর