images

জাতীয়

ভোটের মাঠে আবারও থাকতে চায় বিএনসিসি, আগ্রহ কম ইসির

মো. মেহেদী হাসান হাসিব

১০ মে ২০২৬, ০৬:২৬ পিএম

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটগ্রহণসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) সহায়তা করেছিল বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (বিএনসিসি)। এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও সম্পৃক্ত হতে চায় সংস্থাটি। এ লক্ষ্যে ইসির কাছে ছয় দফা প্রস্তাব দিয়েছে বিএনসিসি। পাশাপাশি ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রমেও সহায়তার আগ্রহ প্রকাশ করেছে তারা। তবে কমিশন বলছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিএনসিসির সহায়তা নেওয়ার সম্ভাবনা কম।

ইসি কর্মকর্তারা জানান, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনসিসিকে ভোটের কাজে ব্যবহার করতে চাইলে বিএনপি আপত্তি জানায়। পরে তাদের সরাসরি ভোটের কাজে ব্যবহার না করে পোস্টাল ব্যালটের ভোটকেন্দ্রে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও সহায়তা দেওয়ার আগ্রহ জানিয়ে কমিশনে প্রস্তাব পাঠিয়েছে বিএনসিসি।

ইসি কর্মকর্তারা আরও বলেন, প্রস্তাবসংবলিত চিঠিটি কমিশনে নথি আকারে উপস্থাপন করা হবে। এরপর কমিশন এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ ঢাকা মেইলকে জানান, তাদের (বিএনসিসি) স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সহায়তার প্রস্তাবের বিষয়টি আমাদের কাছে এখনো আসেনি। তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিএনসিসির সহায়তা নেওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। আমাদের আইন দেখতে হবে। আইনে কী বলা হয়েছে, সেটিই বিবেচ্য। আইনের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই।

আরও পড়ুন: স্থানীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষণে দক্ষিণ কোরিয়ায় যাচ্ছে ইসির প্রতিনিধি দল

কমিশনকে পাঠানো ওই চিঠিতে বিএনসিসি বলেছে, বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (বিএনসিসি) দেশের যুবসমাজকে শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব, দেশপ্রেম ও দায়িত্ববোধে উদ্বুদ্ধ করার পাশাপাশি বিভিন্ন জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে আসছে। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, জনসচেতনতা সৃষ্টি এবং শৃঙ্খলাপূর্ণ নাগরিক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বিএনসিসির অবদান সুপ্রতিষ্ঠিত ও প্রশংসনীয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনসিসি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করে দেশের একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে।

এতে আরও বলা হয়, বর্তমান প্রেক্ষাপটে স্থানীয় সরকার নির্বাচনসমূহ—যেমন ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচন—দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব নির্বাচন সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করা যেমন অত্যন্ত জরুরি, তেমনি ভোটার তালিকা হালনাগাদ প্রক্রিয়াও একটি নির্ভুল ও সময়োপযোগী প্রশাসনিক কার্যক্রম হিসেবে বিবেচিত। এমতাবস্থায় স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিচালনায় সহায়ক শক্তি হিসেবে এবং ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রমে অংশগ্রহণের মাধ্যমে অত্র বাহিনী বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনকে দক্ষতার সঙ্গে নিম্নবর্ণিত বিষয়ে সহযোগিতা করতে পারে।

ক. স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিএনসিসির সম্ভাব্য সহায়তা: বিএনসিসি ক্যাডেটরা দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষিত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ যুবসমাজের প্রতিনিধিত্ব করে। তারা নিয়মিত প্রশিক্ষণ, নেতৃত্ব উন্নয়ন কার্যক্রম ও সামাজিক সেবামূলক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করে থাকে। এই প্রশিক্ষণ তাদের দায়িত্বশীল, সময়নিষ্ঠ ও চাপের মধ্যে কাজ করার উপযোগী করে তোলে। নির্বাচনী কার্যক্রমে বিএনসিসি নিম্নলিখিত উপায়ে সহায়তা প্রদান করতে পারে—

১. ভোটকেন্দ্রে শৃঙ্খলা আনা: বিএনসিসি ক্যাডেটরা ভোটকেন্দ্রের ভেতরে ও বাইরে ভোটারদের সুশৃঙ্খল লাইনে রাখা এবং অপ্রয়োজনীয় জটলা এড়াতে সহায়তা করতে পারে।

২. আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ: বিএনসিসি কোনোভাবেই আইন প্রয়োগকারী সংস্থার বিকল্প নয়; বরং তাদের সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করবে, যাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের মূল দায়িত্বে অধিক মনোযোগ দিতে পারে।

bncc
গত বছর সাভারে বিএনসিসির বার্ষিক কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে যোগ দেন সেনাবাহিনী প্রধান। ছবি: সংগৃহীত

 

৩. ভোটার সহায়তা ডেস্ক পরিচালনা: অনেক ভোটার, বিশেষ করে প্রবীণ ও প্রথমবারের ভোটাররা প্রক্রিয়া সম্পর্কে অনভিজ্ঞ থাকেন। তাদের ভোটদান পদ্ধতি বুঝিয়ে দেওয়া, বুথের অবস্থান সম্পর্কে নির্দেশনা প্রদান ইত্যাদিতে বিএনসিসি সহায়তা করতে পারে।

৪. বয়স্ক, নারী ও প্রতিবন্ধী ভোটারদের সহায়তা: নারী, বয়স্ক ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ভোটারদের নিরাপদ ও সহজে ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ ও ভোটদান নিশ্চিত করতে ক্যাডেটরা দায়িত্ব পালন করতে পারে।

৫. ভোটকেন্দ্রের লজিস্টিক সহায়তা: প্রয়োজনীয় সামগ্রী বহন, বুথ সাজানো, ভোটগ্রহণ শেষে সামগ্রী সংরক্ষণ ও পরিবহনকাজে সহায়তা করা সম্ভব।

৬. শৃঙ্খলা রক্ষা ও জনসচেতনতা বৃদ্ধি: ভোটকেন্দ্রের আশপাশে শৃঙ্খলা বজায় রাখা, ভোটারদের সঠিক লাইনে দাঁড়াতে সহায়তা করা এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে ভূমিকা রাখতে পারবে।

আরও পড়ুন: স্থানীয় সরকার নির্বাচন: এনসিপির ১০০ প্রার্থী ঘোষণা

ভোটার তালিকা হালনাগাদে সহায়তার কথা উল্লেখ করে চিঠিতে বিএনসিসি বলেছে, ভোটার তালিকা একটি দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর ভিত্তি। একটি নির্ভুল, হালনাগাদ ও তথ্যসমৃদ্ধ ভোটার তালিকা নির্বাচন প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য করে তোলে। বিএনসিসি বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনকে নিম্নোক্ত ক্ষেত্রে সহায়তা প্রদান করতে পারে—

১. তথ্য সংগ্রহ: ক্যাডেটরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে নতুন ভোটারদের তথ্য সংগ্রহ, মৃত ভোটারদের তথ্য যাচাই এবং স্থানান্তরিত ভোটারদের তথ্য হালনাগাদে সহায়তা করতে পারে।

২. তথ্য যাচাই: মাঠপর্যায়ে সংগৃহীত তথ্য পুনরায় যাচাই করে ভুল ও অসঙ্গতি কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।

৩. ডাটা এন্ট্রি ও ড্রাফটিং: প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ক্যাডেটদের মাধ্যমে তথ্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে অন্তর্ভুক্ত করা, খসড়া তালিকা প্রস্তুত করা এবং তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করা সম্ভব।

ভোটার তালিকা হালনাগাদ ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিএনসিসি ব্যবহারে সম্ভাব্য কিছু সুবিধার কথাও উল্লেখ করে সংস্থাটি জানিয়েছে, বিএনসিসিকে ব্যবহার করা হলে নির্বাচন কার্যক্রমে দক্ষ জনবল বৃদ্ধি পাবে, ভোটার তালিকা হালনাগাদ প্রক্রিয়া দ্রুত ও নির্ভুল হবে। যুবসমাজ রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজে অংশগ্রহণের সুযোগ পাবে, যা তাদের নাগরিক দায়িত্ববোধ বৃদ্ধি করবে। একই সঙ্গে নির্বাচন প্রক্রিয়ার প্রতি জনগণের আস্থা আরও সুদৃঢ় হবে।

সবশেষে চিঠিতে সংস্থাটি জানিয়েছে, দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর করতে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার এই উদ্যোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে বলে বিএনসিসি বিশ্বাস করে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন কার্যক্রম ও ভোটার তালিকা হালনাগাদে বিএনসিসির সহায়তা প্রদানের প্রস্তাবটি সদয় বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানানো হয়েছে।

জানা যায়, গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোট কার্যক্রমে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে ১৬ হাজারের বেশি বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোরের (বিএনসিসি) সদস্য নিয়োগ দিয়েছিল ইসি। পরবর্তীতে ভোটের কাজে বিএনসিসি নিয়োগে বিএনপি আপত্তি তুললে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে শুধু পোস্টাল ব্যালটের কার্যক্রমে বিএনসিসিকে যুক্ত করে সংস্থাটি।

এমএইচএইচ/এআর