images

জাতীয়

শাপলা চত্বর ট্র্যাজেডি: ছাত্রলীগ-যুবলীগের হামলায় প্রাণ যায় আমিরুলের

মোস্তফা ইমরুল কায়েস

০৪ মে ২০২৬, ০৯:২২ পিএম

# তিন মাস চিকিৎসাধীন থাকার পর মৃত্যু
# ছাত্রলীগ-যুবলীগের সঙ্গে হামলা করে পুলিশও
# আজও বিচার পায়নি পরিবার, মামলা করেনি কেউ

৫ মে ২০১৩ সাল। সকাল থেকে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে চলছিল হেফাজতে ইসলামীর সমাবেশ। সেখানে যোগ দিতে কামরাঙ্গীরচর থেকে রওনা হয় কয়েকশ মানুষ। দুপুর দুইটার দিকে তারা বাবুবাজার ব্রিজে মিছিল শুরু করলে পুলিশের ধাওয়ায় ছাত্রভঙ্গ হয়ে যান অনেকে। 

এদিন দুপুর আড়াইটার দিকে মিছিল পৌঁছায় গুলিস্তানের গোলাপশাহ মাজারের সামনে। কিন্তু সেখানে যেতেই মিছিলে হামলা চালায় আওয়ামী লীগের প্রধান কার্যালয়ে আগে থেকে অবস্থানকারী যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। 

হামলায় সেদিন অন্যদের সঙ্গে গুরুতর আহত হন খাগড়াছড়ির রামগঞ্জের ছেলে মাওলানা আমিরুল ইসলাম (৩৯)। এরপর তিন মাস বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিলেও তাকে আর বাঁচানো যায়নি। সেই মৃত্যুর বিচার এখনো পায়নি আমিরুলের পরিবার। হামলায় যারা জড়িত ছিল, তারাও গ্রেফতার হয়নি। 

শুধু তাই নয়, আমিরুল হত্যার ঘটনায় মামলা পর্যন্ত করতে পারেনি তার পরিবার। অভিযোগ, সেদিনের ঘটনায় পুলিশ ছিল নিরব দর্শক এবং অন্যতম ইন্ধনদাতা। তারা যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সঙ্গে একযোগে হামলা করেছিল হেফাজতের নেতাকর্মীদের ওপর। 

সেদিনের অন্যতম প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন ফখরুল ইসলাম নামে একজন। যিনি মাওলানা আমিরুলের অন্যতম সহযোগী ও বন্ধু। সেদিন অন্যদের সঙ্গে তিনিও যুবলীগ ও ছাত্রলীগের হামলায় আহত হয়েছিলেন। পরে চিকিৎসা নিয়ে ধীরে ধীরে সুস্থ হন। 

2

সেদিন ঘটনার বর্ণনা দিয়ে কামরাঙ্গীরচর জামেয়া নুরী ইসলামিয়া মাদরাসার শিক্ষক ফখরুল ইসলাম জানান, তিনিও ছাত্রলীগ-যুবলীগের হামলায় আহত হন। সেই ক্ষত নিয়ে আজও বেঁচে আছেন। কিন্তু সহকর্মীদের হামলা ও তাদের মৃত্যুর বিষয়গুলো তাকে আজও কাঁদায়।  

মাওলানা ফখরুল ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আমরা সবেমাত্র বাবুবাজার ব্রিজ থেকে শাপলা চত্বর যাওয়ার জন্য মিছিল শুরু করেছি। তখনই পুলিশ পেছন থেকে হামলা করে। তারা কাঁদানে গ্যাস মারতে থাকে। এতে আমাদের সঙ্গীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। তারা দিকদ্বিগ ছুটাছুটি করতে থাকে। তবুও আমরা দমে যাইনি। আমরা মিছিল নিয়ে সেখান থেকে গুলিস্তানের গোলাপশাহ মাজারের সামনে যাই। 

এই প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, ‘সেখান (গোলাপশাহ মাজার) থেকে জিরো পয়েন্টের  দিকে যেতেই মাঝপথে যুবলীগ ও ছাত্রলীগ হামলা করে। তাদের প্রত্যেকের হাতে রামদা, রড, দা, ছুরি ও হকস্টিক ছিল। তারা আমাদের দিকে ধেয়ে আসে। আমরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা আমাদের ওপর হামলা করে। সেই হামলার সঙ্গে পুলিশও ছিল। তারা যুবলীগ ও ছাত্রলীগকে সহায়তা করছিল’

তিনি বলেন, ‘হামলায় আমাদের প্রিয় ভাই মাওলানা আমিরুলও আহত হন। তাকে তারা এমনভাবে মেরেছিল যে, তিনি গোলাপশাহ মাজার এলাকায় জ্ঞান হারিয়ে পড়ে ছিলেন। পরে আমাদের একজন তাকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। আমি সেখানে গিয়ে দেখি, তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছেন।’

3

মাওলানা ফখরুল জানান, হামলায় আমিও আহত হই। আমাকে বেধড়ক মারে। যুবলীগের এক নেতা গোলাপশাহ মাজারের সামনে আমাকে একা পেয়ে রামদা দিয়ে কোপ মারে। আমি তখন দৌড়ে পালানোয় অল্পে বেঁচে যাই। কিন্তু হামলায় এতটাই আহত হই যে, পুরো শরীরে রক্ত আর রক্ত। তখন একজন আমাকে উদ্ধার করে কাকরাইলের ইসলামী ব্যাংক হাসাপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে চিকিৎসা নিয়েই ছুটে যাই ঢাকা মেডিকেলে।

মাওলানা আমিরুলের বিষয়ে তিনি জানান, ‘চিকিৎসাধীন অবস্থাতেই তার (আমিরুল) শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। তার বুকে পিঠে এমনভাবে মারা হয়েছিল যে, পরবর্তীতে সেই ক্ষতস্থানগুলো থেকে থেকে ব্যথা জাগতো। দীর্ঘদিন ভুগেছেন। তিন মাস পর ওই বছরের (২০১৩) ২ আগস্ট চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান আমিরুল ইসলাম। 

মাওলানা ফখরুল জানান, ‘৫ মে গুরুতর আহত হওয়ার আগের দিন খাগড়াছড়ি থেকে ঢাকায় আসেন মাওলানা আমিরুল। তিনি ও তার সঙ্গীরা ৫ মে ভোরে এসে ঢাকায় পৌঁছান। তারা এসে কামরাঙ্গীরচরের একটি মাদরাসায় বিশ্রাম করে সকালে মতিঝিলের উদ্দেশে বের হন। আমিরুরের মৃত্যুর পর তার পরিবার কোনো মামলা করতে পারেনি। আমিও মামলা করতে পারিনি।’ 

4

অজ্ঞাত কলে আমিরুলের গুরুতর অবস্থার কথা জানতে পারেন স্ত্রী

মাওলানা আমিরুল ঢাকায় আসার পর আর পরিবারের সঙ্গে তেমন যোগাযোগ হয়নি। ৫ মে সারাদিন তার কোনো খোঁজখবর ছিল না। এদিকে ঢাকায় হেফাজতের কর্মীদের সঙ্গে গণ্ডগোল হচ্ছে জেনে চিন্তায় ছিল তার স্ত্রী ও পরিবার। রাতে তারা খবর পান। তাও আবার অন্য মাধ্যমে। 

এ বিষয়ে আমিরুলের স্ত্রী ফাতেমা ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আমার স্বামী ৫ মে’র আগের দিন ঢাকা রওনা হন। এরপর আর কথা হয়নি। তখন তো আমিও অসুস্থ। বাচ্চারা এত ছোট যে, তারা কিছু বোঝেও না। এর পরদিন এক অজ্ঞাত ব্যক্তির ফোন কল এলো। তিনি জানালেন, উনি (আমিরুল) গুরুতর অসুস্থ। হাসপাতালে ভর্তি আছেন। কিন্তু স্বামীকে আর অক্ষত পাইনি। 

জানা গেছে, প্রয়াত আমিরুলের দুই মেয়ে ও এক পুত্রসন্তান রয়েছে। ২০১৩ সালে তাদের বাবা যখন মারা যায়, তখন তারা (সন্তানরা) খুবই ছোট। আমিরুলের স্ত্রী ফাতেমা এখন সন্তানদের নিয়ে খাগড়াছড়িতেই থাকেন। কিন্তু গত ১২ বছরে, এমনকি ৫ আগস্টের পরও কেউ পরিবারটির খোঁজখবর নেয়নি। ফলে এক বুক চাপা অভিমান নিয়ে বেঁচে আছে মাওলানা আমিরুলের স্ত্রী-সন্তান। 

ঢাকা মেইল থেকে যোগাযোগ করা হয়েছিল আমিরুলের স্ত্রী ফাতেমার সঙ্গে। মোবাইল ফোনে কল করতেই তার কণ্ঠে আক্ষেপ, ‘এতদিন তো কেউ কোনো খোঁজখবর নিল না। কোনো সাংবাদিকও এলো না, কোনো সংবাদও করল না।’ 

এমআইকে/এএইচ