নিজস্ব প্রতিবেদক
০৪ মে ২০২৬, ০১:১৯ পিএম
জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনে সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রকল্প বাস্তবায়নের দুর্বলতা দূর করা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি। তিনি বলেন, সরকারের লক্ষ্য শুধু ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতি গঠন নয়, সেই অর্থনীতিতে বৈষম্য কমিয়ে একটি মানবিক, গণতান্ত্রিক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা।
সোমবার (৪ মে) জেলা প্রশাসক সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে ডিসিদের কী দিকনির্দেশনা দেওয়া হলো তার তথ্য তুলে ধরতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বলেন, জনগণের বিপুল আস্থা ও সমর্থন নিয়ে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসেছে। সরকারের পরিষ্কার লক্ষ্য ও পরিকল্পনা রয়েছে। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে মাঠ প্রশাসন, বিশেষ করে জেলা প্রশাসন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। সম্মেলনে আলোচনা হচ্ছে কীভাবে সরকারের পরিকল্পনা মাঠপর্যায়ে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, প্রশাসনকে আরো দক্ষ ও কার্যকর করা যায় এবং বাস্তবায়নের পথে কী কী প্রতিবন্ধকতা রয়েছে।
তিনি আরো বলেন, সরকার ইতোমধ্যে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির লক্ষ্য ঘোষণা করেছে। তবে সেই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল যাতে কেবল একটি অংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং বৈষম্য কমিয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়ে ওঠে, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ জন্য উপযোগী প্রশাসনিক কাঠামো ও সক্ষমতা তৈরির কাজ চলছে।
জোনায়েদ সাকি বলেন, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় নতুন একটি স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করছে। আগে যেখানে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ছিল, সেখানে এখন দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যকে সামনে রেখে নতুন কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে। এই ফ্রেমওয়ার্কের প্রথম দুই বছরের মূল লক্ষ্য হবে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করা।
তিনি আরো বলেন, বর্তমান সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে একটি বিপর্যস্ত অর্থনীতি পেয়েছে। শুধু অর্থনৈতিক কাঠামো নয়, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও দুর্বল হয়ে পড়েছে। তাই প্রথম কাজ হচ্ছে অর্থনীতি ও প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন করা, এরপর সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাওয়া।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়নে কাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্প বাস্তবায়নে গুণগত মান নিশ্চিত হয় না, দুর্নীতি ও অপচয় ঘটে। এসব সমস্যা কমিয়ে উন্নয়ন বাজেটের সর্বোচ্চ মান নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে। এ জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হচ্ছে।
ডিসিদের পক্ষ থেকেও বিভিন্ন সমস্যা ও প্রতিবন্ধকতার কথা তুলে ধরা হয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে জমি অধিগ্রহণ একটি বড় সমস্যা। এ ছাড়া আর্থিক বর্ষের সময়সীমা, মূল্যায়ন ও পরিবীক্ষণ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং দুর্নীতিও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উঠে এসেছে। জেলা প্রশাসকেরা এসব বিষয়ে লিখিত প্রস্তাবও দিয়েছেন।
তিনি আরো বলেন, আগে যেভাবে প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে, এখন আর সেভাবে চলবে না। সরকারের নির্দিষ্ট লক্ষ্য, পরিকল্পনা ও সময়সীমা রয়েছে। অনেক প্রকল্প ২০১৭ সালে নেওয়া হলেও এখনো শেষ হয়নি, বারবার সংশোধন ও ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। কেন সময়মতো ও সাশ্রয়ীভাবে প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না, তা চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে।
জোনায়েদ সাকি বলেন, বর্তমান এডিপি ও চলমান প্রকল্পগুলোকে সরকারের ৩১ দফা, নির্বাচনি ইশতেহার, টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) এবং এলডিসি উত্তরণ প্রস্তুতির সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে। কোথাও প্রয়োজন হলে প্রকল্প সংশোধন, সংযোজন বা বিয়োজনও করা হবে।
তিনি আরো বলেন, নতুন প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্ন বা খণ্ডিত প্রকল্প নেওয়া হবে না। নির্বাচনি ইশতেহারকে একটি সমন্বিত কর্মসূচিতে রূপ দিয়ে সেই লক্ষ্য অনুযায়ী প্রকল্প নেওয়া হবে। একটি প্রকল্পের সঙ্গে অন্যটির সংযোগ ও পারস্পরিক নির্ভরতার বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া হবে।
প্রতিমন্ত্রী জানান, পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগকে (এসআইডি) নতুনভাবে সাজানো হচ্ছে। সঠিক উপাত্ত ছাড়া কার্যকর পরিকল্পনা সম্ভব নয়। সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়নেও নির্ভুল তথ্য প্রয়োজন। এজন্য রিয়েল টাইম ডেটা সংগ্রহ এবং তথ্য বিকৃতির সুযোগ বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এ ছাড়া বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) শক্তিশালী করার দিকেও সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানান তিনি। প্রতিটি প্রকল্পের গুণগত মান, ব্যয়ের যৌক্তিকতা এবং ‘ভ্যালু ফর মানি’ নিশ্চিত করার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকারের নির্বাচনি লক্ষ্য অনুযায়ী এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়টি প্রতিটি প্রকল্পের মূল্যায়নে গুরুত্ব পাবে। একই সঙ্গে প্রকল্প গ্রহণে পরিবেশ ও প্রতিবেশগত প্রভাবও বিবেচনায় নেওয়া হবে।
তিনি আরো বলেন, বাজেট ঘোষণার পাশাপাশি নতুন স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্কও সামনে আনার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে এডিপি বাস্তবায়নের দুর্বলতা, সীমাবদ্ধতা ও সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত সমাধানের জন্য নীতিমালা ও অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করা হচ্ছে।
এফএ