images

জাতীয়

বসত গ্রামে, শ্রম শহরে: এক জীবনের দ্বৈত সংগ্রাম

মুহা. তারিক আবেদীন ইমন

০১ মে ২০২৬, ০৮:১২ পিএম

ঢাকার সকাল শুরু হয় শব্দের ভেতর দিয়ে। রাস্তায় রিকশার ঘণ্টা, বাসের হর্ন, আর ফুটপাতে জমে ওঠা চায়ের আড্ডা। এই শহরের ভিড়ের মধ্যে প্রতিদিন যাদের হাত-ঘামের শ্রমে জীবন এগোয়, তাদের বড় অংশই দেশের নানা প্রান্তের গ্রাম থেকে আসা মানুষ। কেউ রিকশার প্যাডেল ঘোরান, কেউ নির্মাণস্থলে ইট-বালুর বোঝা বইছেন, কেউ আবার অস্থায়ী কাজের সন্ধানে ঘুরে বেড়ান। শহরের ঝলমলে উন্নয়নের আড়ালে এরা বয়ে চলেন এক অনিশ্চিত জীবনের ভার, যেখানে স্থায়ী ঠিকানা নেই, আছে শুধু টিকে থাকার লড়াই।

এই শ্রমজীবীদের জীবন এক জায়গায় স্থির নয়। এক পা গ্রামে, আরেক পা শহরে। গ্রাম তাদের শিকড়, শহর জীবিকার ঠিকানা। এই দুই বাস্তবতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে তারা প্রতিদিন নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই চালান।

গাইবান্ধার বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম রিকশা চালান ঢাকার মিরপুরে। ভোরে ঘুম ভাঙার পরই তিনি রাস্তায় বেরিয়ে পড়েন। সারাদিন শহরের যানজট, গরম আর ক্লান্তির সঙ্গে লড়াই করে যা আয় হয়, তার বড় অংশই পাঠিয়ে দেন গ্রামে থাকা স্ত্রী আর দুই সন্তানের কাছে।

রফিকুল বলেন, ‘গ্রামে কাজ নেই, তাই শহরে আসি। এখানে থাকি মাসখানেক, তারপর বাড়ি যাই। কিন্তু সেখানে গিয়েও বেশিদিন থাকা যায় না, আবার শহরে ফিরতে হয়।’

রফিকুলের মতো হাজারো মানুষ শহরে এই অস্থায়ী জীবনের ভেতর দিয়ে বেঁচে আছে। তাদের জন্য শহর কোনো স্থায়ী ঠিকানা নয়, বরং একটি কাজের জায়গা। নির্মাণ শ্রমিকরা সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ভবনের ছাদে বা ভাঙা কাঠামোর ভেতরে কাজ করেন। ইট বহন, রড বাঁধা, সিমেন্ট মেশানো—সবই তাদের দৈনন্দিন কাজ। কিন্তু কাজের কোনো নিশ্চয়তা নেই। একদিন কাজ থাকলে আরেকদিন নেই। তবুও তারা থেমে থাকে না, কারণ থেমে গেলে গ্রামে থাকা পরিবার অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যায়।

শহরের এই শ্রমজীবীদের একটি সাধারণ জীবনচক্র আছে। এক মাস তারা শহরে কাজ করেন, তারপর দশ থেকে পনেরো দিনের জন্য গ্রামে ফিরে যান। এই ফিরে যাওয়া শুধু বিশ্রাম নয়, বরং জীবনের অন্য অংশকে স্পর্শ করার সময়। সেখানে তারা বাবা-মায়ের সঙ্গে সময় কাটান, জমির কাজ করেন, সন্তানদের সঙ্গে কিছুটা সময় ভাগ করে নেন। কিন্তু এই সময়ও শান্তির নয়, কারণ হাতে জমা টাকা দ্রুত শেষ হয়ে যায়। তখন আবার শহরের ডাক শুরু হয়।

ঈদ বা বড় উৎসব এলেই এই মানুষগুলোর জীবনে অন্য রকম আবেগ তৈরি হয়। শহর তখন ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে যায়, আর লাখো শ্রমিক ট্রেন বা বাসে করে গ্রামের পথে রওনা হন। টিকিট না পেয়ে অনেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ট্রেনের ছাদে বা দরজায় ঝুলে বাড়ি ফেরেন। ক্লান্ত শরীর, ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা, তবুও মুখে থাকে এক ধরনের স্বস্তি বাড়ি ফেরা। গ্রামের মাটিতে পা রাখার মুহূর্তে যেন সব কষ্ট হারিয়ে যায়। কিন্তু এই আনন্দ স্থায়ী হয় না। কয়েকদিন পরই আবার শহরে ফেরার প্রস্তুতি শুরু হয়, কারণ জীবিকার বাস্তবতা অপেক্ষা করে না।

9

ঢাকার গার্মেন্টস এলাকা, নির্মাণ সাইট বা রিকশা স্ট্যান্ড—সব জায়গায় এই মানুষগুলো ছড়িয়ে আছে। তারা শহরের অচেনা মুখ হলেও শহরের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। কিন্তু তাদের জীবনে নেই কোনো স্থায়ী নিরাপত্তা। অসুস্থ হলে কাজ বন্ধ, দুর্ঘটনা ঘটলে আয় বন্ধ। অনেক সময় কাজ শেষে পুরো মজুরিও ঠিকমতো পাওয়া যায় না। এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই তারা দিন কাটায়।

রিকশাচালকদের জীবন বিশেষভাবে কঠিন। শহরের প্রতিটি রাস্তায় তাদের দেখা যায়, কিন্তু তাদের জীবন দেখা হয় না। গরমে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, যানজটে আটকে তারা সারাদিন পরিশ্রম করেন। দিনের শেষে যা আয় হয়, তা দিয়ে শুধু পরিবার চালানোই কষ্টকর। তবুও তারা প্রতিদিন নতুন করে রাস্তায় নামে। কারণ তাদের বিকল্প নেই। আবার নির্মাণ শ্রমিকদের জীবন আরও ঝুঁকিপূর্ণ। উঁচু ভবনের কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে তারা কাজ করেন, যেখানে সামান্য অসাবধানতাও বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। কিন্তু এই ঝুঁকির কোনো স্থায়ী নিরাপত্তা নেই। কাজ শেষ হলে তারা আবার অন্য সাইটের খোঁজে ছুটে যান।

এই শ্রমজীবীদের জীবন শুধু কষ্টের নয়, এটি এক ধরনের স্থায়ী অস্থিরতার গল্প। গ্রাম তাদের শেকড় হলেও শহর তাদের বাস্তবতা। দুই জায়গার মধ্যে টানাপোড়েনে তাদের জীবন গড়ে ওঠে। তারা একদিকে পরিবারের দায়িত্ব বহন করেন, অন্যদিকে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই চালান। অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের শহরভিত্তিক উন্নয়নের বড় একটি অংশই এই অনানুষ্ঠানিক শ্রমিকদের ওপর নির্ভরশীল। রাস্তাঘাট, ভবন, পরিবহন—সবকিছুই তাদের শ্রমে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু সমাজের মূলধারায় তাদের অবস্থান এখনো প্রান্তিক।

এই প্রান্তিকতার মধ্যেও তারা থেমে যায় না। প্রতিদিন ভোরে তারা আবার কাজে বেরিয়ে পড়েন। রফিকুল আবার রিকশার হ্যান্ডেল ধরে, নির্মাণ শ্রমিক আবার রড হাতে নেয়, আর দিনমজুর আবার নতুন কাজের সন্ধানে বের হয়। তাদের হাতেই শহর গড়ে ওঠে, কিন্তু তাদের জীবন থেকে যায় অদৃশ্য। গ্রাম আর শহরের এই দ্বৈত জীবন বাংলাদেশের বাস্তবতার এক গভীর চিত্র তুলে ধরে। উন্নয়ন এগোচ্ছে, শহর বড় হচ্ছে, কিন্তু এই মানুষের জীবন এখনো অনিশ্চয়তার ছায়ায় ঢাকা। তবুও তারা বেঁচে থাকে, স্বপ্ন দেখে, আর প্রতিদিন নতুন করে শুরু করে।

টিএই/এমআর