images

জাতীয়

ভোরের অঝোর বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতায় স্থবির ঢাকার সড়ক

নিজস্ব প্রতিবেদক

০১ মে ২০২৬, ০২:০৪ পিএম

শুক্রবার ভোরের অঝোর বৃষ্টিতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার সড়কে সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা। ভোর ৫টার কিছু পর থেকে শুরু হওয়া টানা ভারী বৃষ্টি সকাল ৭টা পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। মাত্র দুই ঘণ্টার এই প্রবল বর্ষণেই রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক তলিয়ে যায় পানিতে। এতে সকালে কর্মস্থলমুখী মানুষ ভোগান্তিতে পড়ে। যদিও সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়ায় অন্যান্য দিনের তুলনায় রাস্তায় যানবাহনের চাপ কম ছিল, ফলে ভোগান্তির মাত্রা কিছুটা সীমিত ছিল। তবুও নগরীর বিভিন্ন এলাকায় হাঁটুসমান পানি জমে গিয়ে যান চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়।

রাজধানীর কারওয়ান বাজার, পান্থপথ, জিগাতলা, শ্যাওড়াপাড়া, মিরপুর-১০, কাজীপাড়া, মালিবাগ রেলগেট, মৌচাক, মগবাজার এবং হাতিরঝিলের মধুবাগসংলগ্ন সড়কসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় বৃষ্টির পানি জমে থাকতে দেখা যায়। সকাল সাড়ে আটটার পরও অনেক এলাকায় পানি নামেনি।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, অল্প সময়ের ভারী বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়া ঢাকার পুরোনো সমস্যা। নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার না করা, অপরিকল্পিত নির্মাণকাজ, খাল দখল এবং অপর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার কারণে বছরজুড়েই সামান্য বৃষ্টিতে নগরবাসীকে দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

মিরপুর ১০ এলাকার বিভিন্ন সড়কে সকাল ৮টার দিকে পায়ের গোড়ালি থেকে হাঁটু পর্যন্ত পানি জমে থাকতে দেখা যায়। রাস্তায় জমে থাকা নোংরা পানি মাড়িয়ে পথচারীদের চলাচল করতে হয়েছে। কোথাও কোথাও ছোট যানবাহন ধীরগতিতে চলাচল করায় দীর্ঘ সময় ধরে যানজটের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়।

R4

শ্যাওড়াপাড়া এলাকার সড়কেও বৃষ্টির পানি জমে থাকতে দেখা যায়। সকাল পৌনে ৮টার দিকে ওই এলাকায় দেখা যায়, জমে থাকা পানির কারণে রিকশা ও মোটরসাইকেল চালকেরা সতর্কতার সঙ্গে চলাচল করছেন। কিছু কিছু জায়গায় পানি এতটাই জমে যায় যে রিকশার চাকা প্রায় অর্ধেক ডুবে যায়।

ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবর সংলগ্ন এলাকাতেও একই চিত্র দেখা যায়। সড়কের বিভিন্ন অংশে পানি জমে থাকায় পথচারীদের অনেকেই বিকল্প পথ ব্যবহার করেন। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বৃষ্টি হলেই এই এলাকায় পানি জমে যাওয়ার ঘটনা নতুন নয়। ড্রেনেজ ব্যবস্থার অকার্যকারিতা ও অপরিকল্পিত নগরায়নকে এর জন্য দায়ী করছেন তারা।

R2

সকালে মিরপুর ১০ এলাকায় থেকে কুর্মিটোলা এলাকায় কর্মস্থলে যাওয়ার পথে দুর্ভোগে পড়েন গার্মেন্টস কর্মী আলমগীর হোসেন। তিনি বলেন, সকাল বেলায় মিরপুর এলাকায় রিকশার পাদানি পর্যন্ত পানি উঠে যায়। ফলে বাধ্য হয়ে দুই পা ওপরে তুলে রিকশায় বসে থাকতে হয়েছে। তারপরও রিকশা চলার সময় জমে থাকা পানি ছিটকে এসে কাপড় ভিজে গেছে। সকালবেলায় অফিসে যাওয়ার পথে এমন পরিস্থিতিতে পড়ব, ভাবিনি। ভেজা কাপড় নিয়েই পুরো দিন কাজ করতে হবে।

একই ধরনের দুর্ভোগের কথা জানান একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারি সালাহ উদ্দীন বাসার। তিনি বলেন, মে দিবসের ছুটি থাকায় সকালে বাস পাওয়া যায়নি। বাধ্য হয়ে দুটি রিকশা বদলে অফিসে আসতে হয়েছে। কিন্তু বৃষ্টি আর জলাবদ্ধতার কারণে রিকশা পাওয়া ছিল কঠিন। জমে থাকা নোংরা পানির মধ্যে দিয়ে অনেকটা পথ হেঁটে যেতে হয়েছে। পরে রিকশা পেলেও স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ ভাড়া গুনতে হয়েছে।

R5

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আরো বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। সংস্থাটি বলছে, দেশের ছয় বিভাগে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। এসব বিভাগ হলো ঢাকা, ময়মনসিংহ, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট। পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টার জন্য দেওয়া সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, কোথাও কোথাও অতিভারী বর্ষণ হতে পারে, যার ফলে নিম্নাঞ্চলে জলাবদ্ধতা ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেতে পারে।

আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন, গত কয়েক দিনের বৃষ্টিপাতের ফলে দেশের বিভিন্ন স্থানে তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। অন্তত এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা তাপপ্রবাহ অনেকটাই প্রশমিত হয়েছে। গত মঙ্গলবার রাত থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শুরু হওয়া বৃষ্টি শুক্রবার সকাল পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে অব্যাহত ছিল। পশ্চিমা লঘুচাপ সারাদেশের ওপর সক্রিয় রয়েছে। এ কারণে ঝড়-বৃষ্টির দাপট থাকবে আরো কয়েক দিন। 

গতকাল দেশের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ৬০ মিলিমিটার। এর আগের দিন সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত হয় পটুয়াখালীর খেপুপাড়ায় ১২১ মিলিমিটার।

R1

এদিকে দেশের ১৭টি অঞ্চলে বজ্রসহ বৃষ্টির সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। শুক্রবার (১ মে) ভোর ৫টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরীণ নদীবন্দরগুলোর জন্য দেওয়া পূর্বাভাসে এ তথ্য উল্লেখ করা হয়। এসব এলাকার নদীবন্দরগুলোকে ১ নম্বর সতর্ক সংকেত প্রদর্শনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত অঞ্চলগুলোর মধ্যে রয়েছে পাবনা, বগুড়া, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, ঢাকা, ফরিদপুর, মাদারীপুর, যশোর, কুষ্টিয়া, খুলনা, বরিশাল, পটুয়াখালী, নোয়াখালী, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও সিলেট।

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, এসব অঞ্চলের ওপর দিয়ে পশ্চিম বা উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে ঘণ্টায় ৪৫ থেকে ৬০ কিলোমিটার বেগে অস্থায়ীভাবে দমকা কিংবা ঝড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টি এবং বজ্রবৃষ্টি বয়ে যেতে পারে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ ড. ওমর ফারুক বলেন, পশ্চিমা লঘুচাপ সক্রিয় থাকায় দেশের অধিকাংশ অঞ্চলে ঝড়-বৃষ্টি বেশি হচ্ছে। এর মধ্যে পশ্চিমাঞ্চলে কিছুটা কম হলেও পূর্বাঞ্চলের ময়মনসিংহ, সিলেট, ঢাকা, চট্টগ্রাম এবং বরিশালে কালবৈশাখীসহ বজ্রবৃষ্টির পরিমাণ বেশি। আগামী ৫ মে পর্যন্ত কালবৈশাখী ও বজ্রবৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে সারাদেশে। এরপর কিছুটা কমবে। তবে একেবারে ঝড়-বৃষ্টি বন্ধ না-ও হতে পারে।

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পাশাপাশি তা দ্রুত বাস্তবায়ন জরুরি। খাল পুনরুদ্ধার, ড্রেনেজলাইন সম্প্রসারণ, নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং অবৈধ দখল উচ্ছেদ ছাড়া এই সমস্যা থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।


এএইচ/এফএ