সাখাওয়াত হোসাইন
০১ মে ২০২৬, ১২:৫৬ পিএম
# স্বস্তি নেই সদরঘাট-কমলাপুরের শ্রমজীবীদের
# সময় বদলালেও ভাগ্য বদলায় না
# দিন এনে দিন খেতে হয়
# যেকোনো পরিবেশে কাজ করতে হয়
# ভালো নেই শ্রমিক, কুলি ও হকাররা
রাজধানীর সদরঘাট। প্রায় ৪০০ বছরের পুরোনো ইতিহাসসমৃদ্ধ এই ঘাট একসময় ছিল দেশের অন্যতম প্রধান নৌপথ যোগাযোগ কেন্দ্র। সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে একসময় এখানে মানুষের যাতায়াত ও পণ্য পরিবহন ছিল ব্যস্ততম। তবে পদ্মা সেতু চালুর পর থেকে কমেছে নৌপথে যাতায়াত। ফলে ভাটা পড়েছে সদরঘাটের দিনমজুর, শ্রমিক, কুলি ও হকারদের জীবিকায়।
একসময় যাদের দিনভর আয় ছিল, এখন সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কমেছে আয়। আয় কমে যাওয়ায় অনেকে আবার সদরঘাট ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন। কখনও তীব্র রোদে, কখনও ঝুম বৃষ্টিতে ভিজে জীবিকার তাগিদে দিনমজুর, শ্রমিক, কুলি ও হকাররা কাজ করে চলেছেন অবিরাম। প্রকৃতির এই প্রতিকূলতা তাদের জন্য বাধা নয়; বরং নিত্যসঙ্গী।
একদিকে বাড়তি ব্যয়, অন্যদিকে অনিশ্চিত আয়। বৃষ্টি হলে যাত্রী কমে যায়, রোদ বাড়লে শরীরও সায় দেয় না। তবুও থেমে থাকার সুযোগ নেই, কারণ প্রতিদিনের আয়েই চলে তাদের সংসার। দীর্ঘসময় রোদে কাজ করতে গিয়ে হিটস্ট্রোক, ডিহাইড্রেশন ও ত্বকের নানা রোগের ঝুঁকি থাকে। আবার বৃষ্টিতে ভিজে কাজ করার কারণে সর্দি-কাশি থেকে শুরু করে বিভিন্ন সংক্রমণের ঝুঁকিও রয়েছে। তবুও প্রয়োজনীয় সুরক্ষা সামগ্রী ও বিশ্রামের সুযোগ অনেকের কাছেই অনুপস্থিত। এই বাস্তবতায় চলছে তাদের নীরব সংগ্রাম।
সময় বদলালেও বদলায় না তাদের ভাগ্য। স্বস্তি নেই এই শ্রমজীবী মানুষদের জীবনে। দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে সদরঘাটে নৌকা চালান আব্দুর রহিম। তার বয়স এখন ৪৫ এর কাছাকাছি। জানতে চাইলে তিনি ঢাকা মেইলকে বলেন, প্রতিদিন সকাল সকাল চলে আসি সদরঘাটে নৌকা চালাতে। চিন্তা করতে হয় ভাড়া ঠিকমতো পাব কি না এবং মানুষ নৌকায় উঠবে কি না। নদীর পানি, কাদা, বৃষ্টি এবং রোদ-সবকিছুর সঙ্গে লড়াই করেই কাজ করতে হয়। কেউ দেখে না আমরা কত কষ্ট করি।
তিনি আরও বলেন, ঢাকায় যেমন লোক বেড়েছে, কেরানীগঞ্জে চাপ বেড়েছে। আলম মার্কেটের ব্যবসা বেড়েছে। এসব কারণে নৌকায় পারাপারের যাত্রী একেবারে কম নয়। সবকিছুর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নৌকার মাঝির সংখ্যাও বেড়েছে। শুধু আয় বাড়েনি। গত ১০ বছর আগেও ৩০০-৪০০ টাকা আয় হতো, এখনো একই রকম।
ঘাট সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সদরঘাটে বৃদ্ধ থেকে শুরু করে যুবক মিলিয়ে প্রায় দুই হাজার মাঝি প্রতিদিন খেয়া পারাপার করেন। সদরঘাটে দুই ধরনের মাঝি আছেন। কারও নিজস্ব নৌকা আছে, আবার কেউ মহাজনদের কাছ থেকে দৈনিক ভিত্তিতে ভাড়া নিয়ে নৌকা চালান। বেশিরভাগ মাঝি মহাজনদের নৌকা ভাড়ায় চালান।
নৌকা ভাড়া ৬০-৮০ টাকা। ঘাটের ইজারাদারের ভাড়া ৮৫ টাকা। রাতে নৌকা পাহারার বিল ১০ টাকা, সিরিয়াল বাবদ ৫ টাকা। প্রতিদিন খাবারের পেছনে খরচ ২০০ টাকা। সব বাদ দিয়ে প্রতিদিন নৌকা চালিয়ে একজন মাঝি ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা আয় করেন।
সদরঘাটের মাঝি সুরুজ আলী। তিনি দীর্ঘ ২৮ বছর ধরে এখানে কাজ করছেন। ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে ঘাটে আসা, এরপর ধীরে ধীরে এই পেশায় জড়িয়ে পড়া—এভাবেই কেটেছে তার জীবনের বড় একটা অংশ।

জানতে চাইলে তিনি ঢাকা মেইলকে বলেন, এই ঘাটই আমাদের জীবনের সবকিছু। নদীর স্রোত, ঢেউ, ঝড়—সবকিছুর সঙ্গে লড়াই করেই বড় হয়েছি। এখন আর ভয় লাগে না, কিন্তু কষ্টটা কমে না।
সুরুজ আলী আরও বলেন, প্রতিদিনই কাজ করতে হয়। এত বছর ধরে এই ঘাটে আছি। এতে সদরঘাটের প্রতি একটা মায়া জন্ম নিয়েছে। কোনোদিন বিশ্রামে গেলে চিন্তা করতে হয় পরের দিন কীভাবে চলবো। দিনশেষে যা পাই, তা দিয়েই সংসার চালাতে হয়। কখনও ভালো আয় হয়, আবার কখনও খুব কম। তবুও স্বপ্ন দেখি কয়েক বছর পর শান্তিতে জীবন কাটাবো।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিদিনের কাজ শুধু শারীরিক পরিশ্রমেই সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নানা ঝুঁকি। সুরুজ আলী বলেন, যাত্রী ওঠানামার সময় একটু অসাবধান হলেই দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। অনেক সময় অতিরিক্ত ভিড় হয়, তখন সবাইকে সামলানো কঠিন হয়ে যায়। বিশেষ করে বর্ষাকালে নদীর পানি বেড়ে গেলে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। তবুও জীবিকার তাগিদে সেই ঝুঁকি নিয়েই কাজ চালিয়ে যেতে হয়।
দীর্ঘদিন সদরঘাটে রুটি বিক্রি করেন ইমতিয়াজ আহমেদ। জানতে চাইলে তিনি ঢাকা মেইলকে বলেন, পদ্মা সেতু চালুর পর থেকে বিক্রি কমে গেছে, চলতে কষ্ট হচ্ছে। ওই রাস্তা দিয়েই এখন মানুষ যাতায়াত করে। আগের মতো আর লোক হয় না লঞ্চে। লোক না হলে আমাদের কাছ থেকে জিনিসপত্র কিনবে কে?
ইমতিয়াজ বলেন, আগে প্রতিদিন হাজারখানেক টাকার বিক্রি করতাম। কিন্তু এখন যাত্রী অনেক কমে গেছে। মানুষের আয়-রোজগারও কমছে। তাই আমার বিক্রিবাট্টাও কমে গেছে।
একই অবস্থা রাজধানীর কমলাপুরের দিনমজুর, শ্রমিক, কুলি ও হকারদের। সময় বদলালেও বদলায় না তাদের ভাগ্য। দীর্ঘদিন কমলাপুরে হকারি কিংবা কুলির কাজ করার কারণে অনেকেই এই পেশা ছাড়তে চান না। আবার যারা ছাড়তে চান, তাদের নেই পর্যাপ্ত পুঁজি, জানেন না অন্য কাজও।
জীবিকার তাগিদে তাদের এখানেই থাকতে হয়। কমলাপুর রেলস্টেশনে দীর্ঘ ২২ বছর ধরে কুলির কাজ করেন শাহিদুল ইসলাম। তিনি অনেকের কাছেই পরিচিত মুখ। প্রতিদিনই তাকে অপেক্ষা করতে হয় কাজের জন্য। কাজ পেলে কিছু টাকা পান, আর কাজ না পেলে আয় হয় না—এভাবেই চলে তার জীবন।
জানতে চাইলে শাহিদুল বলেন, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মাল টানি, কিন্তু আয়টা ঠিকমতো হয় না। মাথায় করে ভারী বস্তা, ট্রাঙ্ক কিংবা বিভিন্ন মালামাল বহন করাই আমার প্রতিদিনের কাজ।
শাহিদুল ইসলাম আরো বলেন, একটা বস্তা নামাতে গিয়েই কখনও কখনও শরীর কাঁপতে থাকে। তবুও থামা যায় না, কারণ কাজ না করলে আয়ও নেই।

মামুন আহমেদ একজন ভ্রাম্যমাণ হকার। তার ঝুলিতে থাকে পানি, বিস্কুট ও চিপসসহ ছোটখাটো খাবার ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী। প্রতিদিন সকালে পাইকারি বাজার থেকে মাল কিনে এনে কমলাপুরে বিক্রি শুরু করেন।
মামুন বলেন, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত হাঁটতে হয়। আজ যা বিক্রি হলো, কাল তা নাও হতে পারে। অনেক সময় ধার করে মাল তুলতে হয়, বিক্রি না হলে সেই টাকা শোধ করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
তিনি আরও বলেন, কমলাপুরে ভিড়ের মধ্যে চলাফেরাও ঝুঁকিপূর্ণ—ধাক্কাধাক্কি, পুলিশের তাড়া বা জায়গা দখল নিয়ে অন্যদের সঙ্গে বিরোধ—সবই তার প্রতিদিনের অভিজ্ঞতার অংশ। শুধু চাই একটু নিশ্চিন্তে ব্যবসা করতে পারি, কেউ যেন অযথা তাড়িয়ে না দেয়, আর কষ্টের টাকাটা যেন ঠিকমতো হাতে থাকে।
এসএইচ/এআর