একে সালমান
০১ মে ২০২৬, ১২:০৯ পিএম
দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভর করেই জীবন চলে তাদের। ভোর থেকে রাত-স্টিয়ারিং হাতে কিংবা গাড়ির সহকারী হিসেবে সড়কেই কাটে বছরের পর বছর। কিন্তু বয়স বাড়লে বা অসুস্থ হয়ে পড়লে সেই জীবন হঠাৎই থেমে যায়। তখন আর থাকে না কোনো নিয়মিত আয়, নেই অবসর ভাতা বা সামাজিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা। শেষ বয়সে এসে তাই অনিশ্চয়তা আর অর্থকষ্টই হয়ে দাঁড়ায় পরিবহন শ্রমিকদের নিত্যসঙ্গী।
বাস, ট্রাক, লেগুনা, অটোরিকশা কিংবা পিকআপের চালক ও সহকারীরা সাধারণত দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল। কোনো প্রতিষ্ঠানভিত্তিক স্থায়ী চাকরি না থাকায় তারা নিয়মিত বেতন, পেনশন বা গ্র্যাচুইটির সুবিধা পান না। দীর্ঘদিন কাজ করার পরও অবসরে যাওয়ার সময় তাদের হাতে থাকে না কোনো সঞ্চয় বা ভাতা।
১৯৮৩ সালের মোটরযান অধ্যাদেশ, ২০০৬ সালের শ্রম আইন এবং সর্বশেষ সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ অনুযায়ী পরিবহন শ্রমিকদের নিয়োগপত্র দেওয়ার বিধান থাকলেও বেশিরভাগ বেসরকারি পরিবহন মালিক অতি মুনাফার লোভে চালক-শ্রমিকদের তা দেন না। সেজন্য যে দিন কাজ করেন না, সে দিন শ্রমিকরা বেতন বা মজুরি পান না। এ ছাড়া কল্যাণ তহবিলের নামে শ্রমিকদের কাছ থেকে নিয়মিত যে টাকা তোলা হয় তা থেকেও দুর্দিনে কোনো সাহায্য পান না তারা। তাই কোনো দিন গাড়ি চলাচল বন্ধ থাকলে শ্রমিকদের কাটাতে হয় মানবেতর জীবনযাপন।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য অনুযায়ী, দেশে চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত নিবন্ধিত মোটরযান ৫৮ লাখ ৯৭ হাজার ২৪১টি। এ সংখ্যা থেকে ব্যক্তিগত শ্রেণির ৪ লাখ ৯৬ হাজার ৯৩৪টি। গাড়ি বাদ দিলে থাকে ৫৪ লাখ ৩০৭টি। এর মধ্যে বাস ৫৪ হাজার ১৫৮টি, কাভার্ড ভ্যান ৪৭ হাজার ৬৪টি, মাইক্রোবাস ১ লাখ ২০ হাজার ৯৩টি, মিনিবাস ২৮ হাজার ৩০৯টি, হিউম্যান হলার ১৭ হাজার ৩৮৭ এবং মোটরসাইকেল আছে ৪২ লাখ ৬৯ হাজার ৪৩০টি। আর দেশে ড্রাইভিং লাইসেন্সধারীর সংখ্যা ৫৯ লাখ ৪৬ হাজার ৫২৩। তবে সব ড্রাইভিং লাইসেন্সধারী পরিবহনশ্রমিক হিসেবে গণ্য হন না।
মোটরসাইকেল চালানোর লাইসেন্সধারীর অনেকেই পরিবহনশ্রমিকের আওতায় বাইরে। আবার একটি বাস বা ট্রাকে চালক ছাড়াও থাকেন ২-৩ জন সহকারী। করোনাকালে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের হিসাব অনুযায়ী, তাদের সংগঠনে নিবন্ধিত ছিল ৫০ লাখ শ্রমিক।
এর বাইরে আরও ২০ লাখ শ্রমিক রয়েছে বলে জানিয়েছিল তারা। ৩ বছর পর বিআরটিএর নিবন্ধিত গাড়ির সংখ্যা আর শ্রমিক ফেডারেশনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, দেশে বর্তমানে পরিবহনশ্রমিক আছেন এক কোটির মতো।
সরেজমিন রাজধানীর গাবতলী বাস টার্মিনাল, ট্রাকস্ট্যান্ড ও সায়েদাবাদসহ বেশ কয়েকটি টার্মিনাল ও ট্রাকস্ট্যান্ড ঘুরে চালকদের সঙ্গে কথা হয়।
গাবতলী ট্রাকস্ট্যান্ডের চালক মো. বেলায়েত হোসেন ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘জীবিকার তাগিদে দীর্ঘ ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে পেশা হিসেবে চালকের পেশা বেছে নিয়েছি। দীর্ঘ ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে ট্রাকের চালক হিসেবে কাজ করছি। দিনের পর দিন নির্ঘুম থেকে দুর্বল শরীর নিয়ে দেশের এ প্রান্ত থেকে ওই প্রান্তে ছুটে গিয়েছি বহুবার। দেশের অন্তত ৬০টি জেলায় ট্রাকে করে মালামাল নিয়ে যাতায়াত করেছি। অনেক সময় অসুস্থ হয়ে অনেকদিন কাজ ছাড়া ছিলাম। ওই সময় টাকা ধার নিয়ে চিকিৎসা করিয়েছি এবং এ টাকা দিয়েই পরিবারের যোগান দিয়েছি। কোনো সংগঠন থেকে কেউ এগিয়ে আসেনি। আমরা যারা ট্রাক চালাই তার কোনো সংগঠনের কেউ না। শুধুমাত্র মালিকরা মালিক সমিতির সদস্য। আমরা কোনো বিপদ কিংবা কোনো কাজে সমিতি আমাদের কাজে আসেনি।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমরা কাজের বিনিময়ে খাবার আনি। দিন আনি দিন খাই। প্রতিদিন যা আয় করি তা দিয়েই সংসার চলে। হঠাৎ করে যেকোনো সময় আমাদের চাকরি চলে যায়। এখন চোখে কম দেখি, শরীরেও আর আগের মতো শক্তি নেই। কাজ করতে পারি না। কিন্তু কোনো ভাতা বা সহায়তা পাই না। এখন পরিবারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।’
গাবতলী টার্মিনালে কথা হয় আব্দুল ওয়াহাবের সঙ্গে। তিনি ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আমি প্রায় ২০ বছর ধরে বাসচালক হিসেবে কাজ করছি। এখন শরীরে শক্তি নাই। প্রায় সময় অসুস্থ হয়ে পড়ি। গতো পাঁচ বছর ধরে উত্তরবঙ্গে গাড়ি চালাই। আমি এখন কোম্পানির চালক হিসেবে মাসিক বেতনে কাজ করি। কিন্তু আমাদের বেতনের সঙ্গে বোনাস থাকলেও বেশি সুযোগ সুবিধা নাই। আমরা অবসরে গেলেও কোনো অবসর ভাতা নাই। অসুস্থ হলেও কোম্পানি ফোন দিয়ে খবর নেয়। কিন্তু তেমন কোনো সহায়তা করে না। আমরা অসুস্থ হই, পরিবারের সদস্যরা অসুস্থ হয়, আমরা নানা সমস্যায় পড়ি। কিন্তু আমাদের সংগঠন কিংবা মালিকের পক্ষ থেকে তেমন কোনো সহায়তা পাই না।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমরা সরকারের কাছে আবেদন করি। অন্তত সরকার শ্রমিক সংগঠনগুলোকে একত্রে করে শ্রমিকদের সহায়তায় যেন কাজ করে। সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে কথা হয় বাসচালক আবেদ আলীর সঙ্গে। তিনি ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আমি ৩০-৩২ বছর ধরে সড়কে বাস চালাই। বাস চালাতে গিয়ে নানা ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে। অনেক সময় দুর্ঘটনার শিকার হয়েছি। কিন্তু শ্রমিক সংগঠনগুলো থেকে তেমন সহায়তা পাইনি। আমাদের পরিবারের সদস্যা অসুস্থ হলেও তপমন কোনো সহায়তা আসে না। আমরা যারা চালক আছি, সংগঠনগুলো তেমন খোঁজ খবর রাখে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের দেশে সংগঠন থাকলেও শ্রমিকদের কোনো কাজে আসে না। কেউ আহত হলে তাদের খবর নেয় না। আমাদের কোনো অবসর ভাতা, অসুস্থ ভাতা কিংবা উৎসব ভাতা নেই। আমরা কোনোভাবে দিন এনে দিন খাই। যদি কাজ না করি তাহলে পরিবারের সদস্যরা না খেয়ে দিন পার করতে হয়।’
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা কেন্দ্রের সাবেক পরিচালক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ড. হাদিউজ্জামান ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘করোনার সময় আমরা দেখেছি পরিবহন শ্রমিকরা কতটাই না মানবেতর জীবনযাপন করেছেন। গাড়ি না চললে তাদের মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে। শ্রম আইনে পরিবহনশ্রমিকদের কর্মঘণ্টা ও নিয়োগপত্র দেওয়ার যে বিধান রযেছে, সেগুলো কিন্তু পরিবহন মালিকরা মানছেন না। পরিবহন শ্রমিকদের ইচ্ছেমতো ব্যবহার করছেন বেশিরভাগ মালিক। তাদের চুক্তিভিত্তিক গাড়ি চালাতে বাধ্য করে, গাড়ি না চালালে তাদের আয় বন্ধ হয়ে যায়।’
তিনি আরো বলেন, ‘এই শ্রমিকদের উন্নয়নের নাম করে যেসব তহবিল হয়, সেগুলোও অনেক প্রশ্নবিদ্ধ থাকে। ঠিকমতো শ্রমিকদের কাছে কোন আর্থিক সহায়তা পৌঁছায় না। শ্রমিকদের উন্নয়নে আইন আছে। সেগুলো শুধু কাগজে-কলমে। যদি প্রতিটি সংগঠন শ্রমিকদের উন্নয়নে কাজ করে। তাহলে শ্রমিকদের আর মানবেতর জীবন যাপন করতে হবে না।’
একেএস/এমআর