images

জাতীয়

‎‘গরিবদের জিজ্ঞেস করে কে, কাজ না করলে খাবার জোটে না’

নিজস্ব প্রতিবেদক

০১ মে ২০২৬, ১১:৪৫ এএম

ভোরের আলো ফোটার আগেই শহরের বিভিন্ন মোড়, বাজারের পাশে কিংবা নির্মাণাধীন ভবনের সামনে জড়ো হন দিনমজুররা। কারো হাতে রংয়ের কাজ করার সরঞ্জাম, কারো হাতে খুন্তি, আবার কেউ শুধু খালি হাতে একটাই অপেক্ষা, আজ কোনো কাজ মিলবে কি না। কারণ কাজ না পেলে সেদিন পরিবারের হাঁড়িতে চুলা জ্বলে না।

‎রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলা শহরে প্রতিদিন শত শত শ্রমিক কাজের আশায় নির্দিষ্ট পয়েন্টে দাঁড়িয়ে থাকেন। ঠিকাদার বা শ্রমদাতা এসে সেখান থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী শ্রমিক নিয়ে যান। কিন্তু অপেক্ষারত শ্রমিক সবাই কাজ পান না। অনেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও খালি হাতে বাড়ি ফেরেন।

‎‎শুক্রবার (১ মে) সকালে রাজধানীর মোহাম্মদপুর টাউন হল, কারওয়ান বাজার ও শিয়া মসজিদসহ বেশ কয়েকটি এলাকা ঘুরে কাজের সন্ধানে শ্রমিকদের অপেক্ষা করতে দেখা যায়।

‎‎শ্রমিকরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কাজের সন্ধানে দিনের পর দিন অপেক্ষা করি। দেখা গেছে দীর্ঘ অপেক্ষার পর সপ্তাহে একটা কাজ পাই। তাও দুই থেকে তিনদিনের মধ্যে শেষ হয়ে যায়। এ দুই তিনদিন কাজ করে যা আয় হয়। তা দিয়েই সংসারের খরচ চলে যায়। মে দিবস আসে; কিন্তু তা কাগজে কলমে। আমাদের জীবন মানের কোন উন্নতি নেই।

‎‎অনিশ্চিত আয়ে টিকে থাকার লড়াই

‎দিনমজুরদের আয়ের কোনো নিশ্চয়তা নেই। কখনো সপ্তাহে তিন-চার দিন কাজ মেলে, আবার কখনো টানা কয়েকদিন কোনো কাজই থাকে না। এর মধ্যে বাড়িভাড়া, বাজার খরচ, ওষুধ সব কিছু চালানো তাদের জন্য হয়ে ওঠে দুঃসহ।

‎‎এ নিয়ে শ্রমিকদের মধ্যে কোনো ক্ষোভ নেই। তবে, দীর্ঘশ্বাস আছে। তারা জানান, যেদিন কাজ পাই, সেদিন ভালোভাবে খাই। যেদিন কাজ পাই না, সেদিন ধার করে চলতে হয়। অনেক সময় পরিবারের সদস্যদের পছন্দের খাবার তুলে দিতে পারি না।

‎মোহাম্মদপুর টাউন হল এলাকায় কাজের জন্য অপেক্ষা করছেন রাজশাহী থেকে আসা ইয়ার উদ্দিন। তিনি ঢাকা মেইলকে বলেন, আমি পেশায় একজন রঙ মিস্ত্রী। গত ৩-৪ বছর টাউন হলে এসে কাজ করি। এখানে প্রতিদিন ভোর থেকে অপেক্ষা করলে কোনোদিন কাজ পাই আবার কোনো সময় এক সপ্তাহ কাজের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। এক বছর কাজ করে যা আয় করি বছর শেষে তা নিয়ে বাড়ি যাই। আমাদের মে দিবস বলতে কোনো দিবস নেই। এ দিবসে কেউ কোনো খোঁজ নেয় না। নিজেদের রোজগার নিজেরাই করে খেতে হয়।

‎‎আরেক শ্রমিক মোকাব্বের আলী বলেন, আমি প্রায় ১ যুগের বেশি সময় ধরে কাঠমিস্ত্রীর কাজ করি। কাজ করে যা আয় করি তা দিয়েই আমার সংসার চলে। আজকে মে দিবস। আমাদের শ্রমিকদের জীবন মান উন্নয়নের দিন। অথচ, এ টাউন হলে গত কয়েক দশক ধরে কাজের সন্ধানে অনেক লোক অপেক্ষা করে। কেউ এ দিবসে এসে আমাদের কোনো খোঁজ নেয়নি।

‎‎তিনি আরো বলেন, দেশে এত শ্রমিক সংগঠন। তারা আমাদের মতো নিম্ন আয়ের শ্রমিকদের কোনো খোঁজ নেয় না। তারা সংগঠন করে, সংগঠনে উচ্চ পর্যায়ের শ্রমিকরা সকল সুযোগ সুবিধা পায়। আমরা সবসময় সকল সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছি। আমাদের কোনো দিবস নেই। সরকারের আমাদের নিয়ে মাথাব্যাথা নেই। সবাই সরকারের সকল সুযোগ-সুবিধা ভোগ করলেও আমরা সকল সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত।

‎‎আরেক শ্রমিক মোতাহার মিয়া বলেন, আগে ৫০০-৬০০ টাকায় বাজার করা যেত, এখন ১ হাজার টাকা নিয়েও ভালোভাবে বাজার করা যায় না। পরিবারের চাহিদা মেটাতে গিয়ে ধার-দেনা করতে হচ্ছে। আগে কাজ ছিল, কাজের মূল্যায়ন ছিল। কাজ করে যে টাকা আয় করতাম তা দিয়ে সংসারের খরচ চালিয়ে কিছু সঞ্চয় করতে পারতাম। কিন্তু এখন বাজারে সবকিছুর দাম বেড়ে যাওয়ায় এখন আর কোনো হিসাব মেলাতে পারি না। আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের হিসাব মেলে না।

‎‎তিনি আরো বলেন, আমরা যদি কাজে বের হই। তাহলে আমাদের পরিবারের চুলা জ্বলে। আজকে মে দিবস হিসেবে সকাল থেকে আমাদের কর্মবিরতি চলছে। কিন্তু এ কর্মবিরতি দিয়ে আমাদের লাভ কি? আমরা কাজ না করলে তো কেউ এসে আমাদের খবর নেয় না। পেটে খাবার জোটে না।

‎‎দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে মোহাম্মদপুরের টাউন হলে কাজের জন্য প্রতিদিন ভোর থেকে অপেক্ষা করেন কয়েকশ’ শ্রমিক। তাদের সবার আক্ষেপ, মে দিবস শ্রমিকদের দিবস হলেও সরকারের পক্ষ থেকে তাদের জন্য কোনো দিবস নির্ধারিত নেই। কেউ নিম্ন আয়ের এসব শ্রমিকদের জিজ্ঞেস করে না। তারা সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সহায়তা পায়নি কখনো।

‎‎শ্রমিকের জীবন মান উন্নয়নে কাজ করা স্থানীয় সংগঠক পারভেজ হাসান সুমন বলেন, গত কয়েক বছরে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, ডিম, মাছ-মাংসসহ সবকিছুর দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। এতে করে শ্রমজীবী মানুষের আয় ও ব্যয়ের মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে এসব শ্রমজীবীরা নিত্যদিনের পণ্যের চাহিদার পাশাপাশি তারা চিকিৎসাহীনতায় ভোগে। ছোট রোগ থেকে বড় ধরনের কোনো রোগে তারা ব্যয়বহুল খরচ মিটিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে তা নির্ণয় করতে পারে না। তাদের চিকিৎসার একমাত্র ভরসা হলো- বাড়ির পাশে বাজারের ফার্মেসি দোকান।

‎‎তিনি আরো বলেন, আমরা চাই সরকার নিম্ন আয়ের শ্রমিকদের জীবন মান উন্নয়নে এগিয়ে আসবে। সকল শ্রমিকের পাশাপাশি, ভাসমান শ্রমিকদের বিষয়ে সরকার কাজ করবে। কারণ এ শহরে ভাসমান শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি সুবিধা বঞ্চিত। কিন্তু তাদের বড় একটা অংশ শহরের চাকা সচল রাখতে কাজ করে।

‎‎একেএস/এফএ