images

জাতীয়

বঞ্চনা ও নিপীড়নের শিকার গৃহকর্মীদের কথা কেউ ভাবে না!

মো. মেহেদী হাসান হাসিব

০১ মে ২০২৬, ০৭:১৬ এএম

আজ পহেলা মে। পালিত হচ্ছে বিশ্ব শ্রমিক দিবস। দিনটি এলে প্রতি বছর জোরালোভাবে আলোচিত হয় শ্রমিকদের কথা। নানা অঙ্গনে কর্মরত শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার নিয়ে কথা হয়। তবে তখনও আলোচনার বাইরেই থেকে যায় বাসা-বাড়িতে কর্মরত গৃহকর্মীরা। অথচ অনেক ঝুঁকি নিয়ে কর্মরত এই শিশু-কিশোরীরা পদে পদে শিকার হয় নানা বঞ্চনার। যৌন নিপীড়নসহ নানাভাবে হতে হয় নিগৃহীত। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সেগুলো চাপা পড়ে যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া কিছু ঘটনা সাময়িক আলোচনায় এলেও অসংখ্য নির্যাতনের ঘটনার কোনো বিচার হয় না।

২০১৯ সালের বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিস-বিলস-এর প্রকাশ করা গৃহশ্রমিকদের কর্মক্ষেত্রের পরিস্থিতি ও নির্যাতন নিয়ে এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকাসহ সারাদেশে যারা গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করে তাদের ৯৫ ভাগেরও বেশি নারী। নির্যাতন ও ধর্ষণের শিকার হয়েছেন যারা তাদের বেশির ভাগের বয়স ২১ থেকে ৩১ বছরের মধ্যে।

বিলস জানায়, দেশের গৃহকর্মীদের নির্যাতনের বাস্তব পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। কারণ অনেক নির্যাতনের ঘটনায় অর্থ ও চাপের মুখে সমঝোতা করা হয়। গৃহকর্মী বা তাদের পরিবারের সদস্য অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হওয়ার কারণে মামলা মোকদ্দমায় যেতে চান না বা যেতে সাহস পান না। প্রভাবশীলরা অনেক নির্যাতনের ঘটনা ধামাচাপা দিয়ে ফেলেন।

২০১৯ সালের মার্চ মাসে আইএলও বাংলাদেশের গৃহকর্মীদের নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাতে বলা হয়, যারা বাসাবাড়িতে সার্বক্ষণিক গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করেন তাদের শতকরা ১৩ ভাগ শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন। মানসিক নির্যাতনের শিকার হন ২৬ ভাগ। যৌন নির্যাতনের শিকার হন তিন ভাগ। আর মৌখিক নির্যাতনের শিকার হন শতকরা ৪৮ ভাগ। প্রতিবেদন অনুযায়ী রাতে ঘুমোনার সময় ৬৬ ভাগ গৃহকর্মীই নিজেদের নিরাপদ মনে করেন না।

অদৃশ্য শ্রম, অদেখা নির্যাতন

গৃহকর্মীরা দেশের অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজারের একটি বড় অংশ হলেও তাদের কাজের স্বীকৃতি, নিরাপত্তা কিংবা আইনি সুরক্ষা এখনো দুর্বল। অধিকাংশ গৃহকর্মীই দরিদ্র পরিবার থেকে আসা নারী ও শিশু, যাদের বয়স অনেক ক্ষেত্রে ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, শারীরিক নির্যাতন, মানসিক নিপীড়ন, খাদ্য বঞ্চনা এমনকি যৌন সহিংসতার ঘটনাও ঘটছে, কিন্তু এসবের বড় অংশই অপ্রকাশিত থেকে যায়।

বিচারপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে প্রবেশাধিকার সংকটকে বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম ঢাকা মেইলেকে বলেন, তারা কোথায় যাবে, কীভাবে বিচার চাইবে—এ বিষয়ে তাদের স্পষ্ট ধারণা নেই। অনেক ক্ষেত্রে তাদের চলাফেরাও নিয়ন্ত্রিত থাকে। এনজিওগুলো কিছু ক্ষেত্রে সহায়তা করলেও সবার কাছে পৌঁছানো সম্ভব হয় না।

ডা. ফওজিয়া বলেন, সংবাদমাধ্যমে যেসব ঘটনা প্রকাশ পায়, সেগুলোর কিছু বিচার হলেও অধিকাংশ ঘটনাই অদৃশ্য থেকে যায় এবং ভুক্তভোগীরা বিচার পায় না।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য আইনি কাঠামো জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেন ফাওজিয়া মোসলেম। তিনি বলেন, প্রথমত গৃহকর্মীদের শ্রমকে অর্থের বিনিময়ে স্বীকৃত পেশাগত শ্রম হিসেবে আইনে স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং এ বিষয়ে নাগরিক ও শ্রমিক—উভয় পক্ষকে সচেতন করতে হবে।

পারিবারিক সেবার সংস্কৃতি থেকে শ্রমের স্বীকৃতির লড়াই

দেশের সামাজিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে গৃহকর্মীদের কাজ দীর্ঘদিন ধরে পারিবারিক সেবার অংশ হিসেবেই দেখা হয়েছে, পেশাগত শ্রম হিসেবে নয়। ফলে তাদের কাজের স্বীকৃতি, ন্যায্য পারিশ্রমিক ও অধিকার নিশ্চিত করার প্রশ্নটি এখনো উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে। এই বাস্তবতায় গৃহকর্মীদের শ্রমকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে, যা তাদের ন্যায্য অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিতের লড়াইকে সামনে নিয়ে এসেছে।

ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, দেশের সামাজিক ইতিহাসে গৃহকর্মীদের অবস্থান অনেকটা পুরনো পারিবারিক সেবাদানের সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত। একসময় বংশপরম্পরায় জমিদার বা ভূমির মালিকদের পরিবারে সেবা দেওয়ার যে সংস্কৃতি ছিল, আধুনিক সময়েও গৃহকর্মীদের অনেক ক্ষেত্রে সেই মানসিকতার মধ্যেই দেখা হয়।

ফাওজিয়া মোসলেমের মতে, গৃহকর্মীদের শ্রমকে অর্থের বিনিময়ে প্রদত্ত পেশাগত শ্রম হিসেবে যথাযথভাবে স্বীকৃতি না দেওয়াই তাদের দুর্বলতার প্রধান কারণ। তিনি বলেন, তাদের কাজকে শ্রম হিসেবে না দেখে অনেক সময় মনে করা হয়, বাসায় রাখা হচ্ছে, খাওয়ানো হচ্ছে—এটাই যথেষ্ট। ফলে তাদের প্রাপ্য পারিশ্রমিক বা অধিকারকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না।

এছাড়া তিনি গৃহকর্মীদের জন্য নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা, ছুটি ও বিনোদনের সুযোগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি অভিযোগ জানানোর জন্য সহজলভ্য ও নির্দিষ্ট কাঠামো তৈরির ওপর জোর দেন। বলেন, থানা বা সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় কার্যালয়ের মাধ্যমে এমন ব্যবস্থা থাকতে পারে, যেখানে নির্দিষ্ট এলাকার গৃহকর্মীরা সহজেই অভিযোগ জানাতে পারবে।

অভিযোগ গ্রহণ থেকে শুরু করে বিচারব্যবস্থায় তা পৌঁছানোর একটি কার্যকর সংযোগ স্থাপনের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তার মতে, অভিযোগ গ্রহণকারী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিচারব্যবস্থার সরাসরি সমন্বয় থাকতে হবে, যাতে অভিযোগগুলো বাস্তবিক অর্থে বিচার পর্যন্ত পৌঁছায়।

গৃহকর্মীদের অধিকার সুরক্ষা ও বিচার নিশ্চিত করতে এসব বিষয়কে একটি সমন্বিত আইনি ব্যবস্থার আওতায় আনার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

দারিদ্র্য, কাঠামোগত দুর্বলতা ও সামাজিক ক্ষমতার প্রভাব

গৃহকর্মীদের ওপর নির্যাতন ও বিচার না পাওয়ার পেছনে দারিদ্র্য, সংগঠনের অভাব এবং সামাজিক ক্ষমতার বৈষম্য বড় ভূমিকা রাখছে বলে মনে করেন ঢাকা বলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও সমাজ বিজ্ঞানী ড. সাদেকা হালিম। তিনি বলেন, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে গৃহকর্মীদের শ্রম মূলত দারিদ্র্য দ্বারা চালিত। ‘দারিদ্র্যের কারণে নারীরা, বিশেষ করে শিশু সন্তান থাকা নারীরা, শহরে কাজের সন্ধানে আসে। অনেক ক্ষেত্রে তাদের স্বামীরাও সঙ্গে আসে—কেউ রিকশা চালায়, কেউ ছোটখাটো ব্যবসা করে,’ বলেন তিনি।

তার মতে, গৃহকর্মীরা অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের অন্য সদস্যদের তুলনায় বেশি আয় করলেও সামাজিকভাবে তারা ক্ষমতায়ন অর্জন করতে পারে না। ‘বাসাবাড়িতে কাজ করার ক্ষেত্রে তাদের অবস্থান এখনো দুর্বল থাকে,’ উল্লেখ করেন তিনি।

গৃহকর্মীদের অধিকার সুরক্ষায় কাঠামোগত ঘাটতির কথাও তুলে ধরেন এই বিশ্লেষক। ‘গার্মেন্টস শ্রমিকদের মতো তাদের কোনো ট্রেড ইউনিয়ন বা শক্তিশালী সংগঠন নেই। তারা সম্পূর্ণ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করে,’ বলেন ড. সাদেকা হালিম।

এই সমাজবিজ্ঞানী বলেন, গৃহকর্মীদের ক্ষেত্রে নিয়োগদাতারা সাধারণত তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র জমা রাখেন এবং স্থানীয় থানার সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন নিজেদের নিরাপত্তার জন্য। তবে গৃহকর্মীদের পক্ষ থেকে এমন কোনো সুরক্ষা কাঠামো কার্যকরভাবে গড়ে ওঠেনি।

শ্রম আইন ও নীতিমালার ক্ষেত্রেও বৈষম্যের বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, অফিস বা কারখানার কর্মীদের জন্য কাজের সময়, বেতন, ছুটি ও স্বাস্থ্য সুবিধা নিয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকলেও গৃহকর্মীদের ক্ষেত্রে এ ধরনের কোনো কার্যকর নীতি বাস্তবে প্রয়োগ নেই।

নির্যাতনের ঘটনাগুলোর বিচার প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার মতে, অনেক ক্ষেত্রে নির্যাতনের ঘটনা পরিবারগুলোর মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে মিটিয়ে ফেলা হয়। আদালতে গেলেও প্রভাবশালী পক্ষগুলো তাদের অর্থ, সামাজিক নেটওয়ার্ক ও ক্ষমতার কারণে পার পেয়ে যায়।

ড. সাদেকা হালিম বলেন, যারা নির্যাতনের শিকার হন, তারা সাধারণত দরিদ্র পরিবার থেকে আসেন। ফলে আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা তাদের থাকে না। অপরদিকে অভিযুক্তরা প্রভাবশালী হওয়ায় বিচার অনেক সময় তাদের পক্ষেই ঝুঁকে পড়ে।

শিশু গৃহকর্মীদের ওপর নির্যাতনের বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন এই সমাজবিজ্ঞানী। ‘অনেক ক্ষেত্রে অল্প বয়সী শিশুদের বাসায় এনে কাজ করানো হয়, তাদের যথাযথ খাবার দেওয়া হয় না, বাথরুমে আটকে রাখা হয় এবং নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হতে হয়,’ বলেন তিনি।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি নীতিমালা প্রণয়নের ওপর জোর দেন ড. সাদেকা হালিম। তিনি মনে করেন, শ্রম মন্ত্রণালয়ের উচিত অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরতদের জন্য সুস্পষ্ট বিধিমালা তৈরি করা। একই সঙ্গে নারী ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোকেও এ বিষয়ে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।

গৃহকর্মীদের অধিকার নিশ্চিত করতে সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া নির্যাতন ও বিচারহীনতার এই চক্র থেকে বের হওয়া কঠিন বলেও মন্তব্য করেন সাদেকা হালিম।

এমএইচএইচ/জেবি