images

জাতীয়

শ্রমবাজারে বড় বৈষম্যের শিকার নারীরা

আব্দুল হাকিম

০১ মে ২০২৬, ০৬:৫৯ এএম

দেশের শ্রমবাজারে নারীর উপস্থিতি বাড়লেও আয়, সুযোগ এবং মর্যাদার প্রশ্নে তারা এখনো পিছিয়ে রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) বলছে, কর্মক্ষম জনসংখ্যায় নারীর সংখ্যা পুরুষের চেয়ে বেশি হলেও শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ, কর্মসংস্থান এবং আয়ের ক্ষেত্রে নারীরা এখনো বড় ধরনের বৈষম্যের শিকার।

বিবিএস জরিপ অনুযায়ী, দেশে মোট কর্মক্ষম জনসংখ্যা ১২১.৮২ মিলিয়ন। এর মধ্যে পুরুষ ৬০.০৯ মিলিয়ন (৬ কোটি ৯২ হাজার) এবং নারী ৬১.৭৩ মিলিয়ন (৬ কোটি ১৭ লাখ ৩০ হাজার)। অর্থাৎ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীতে নারীর সংখ্যা সামান্য বেশি হলেও শ্রমবাজারে তাদের উপস্থিতি সেই অনুপাতে প্রতিফলিত হয়নি। শহর ও পল্লির বিভাজনেও পার্থক্য রয়েছে। পল্লিতে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বেশি হলেও কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং আয় কাঠামো তুলনামূলক দুর্বল।

মোট কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর মধ্যে ৭১.৭১ মিলিয়ন (৭ কোটি ১৭ লাখ ১০ হাজার) মানুষ শ্রমশক্তিতে অন্তর্ভুক্ত। এর মধ্যে পুরুষ শ্রমশক্তি ৪৮.০২ মিলিয়ন (৪ কোটি ৮০ লাখ ২০ হাজার), মোটের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। অন্যদিকে নারী শ্রমশক্তি মাত্র ২৩.৬৯ মিলিয়ন (২ কোটি ৩৬ লাখ ৯০ হাজার), অর্থাৎ এক-তৃতীয়াংশেরও কম। শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার বিশ্লেষণ করলে বৈষম্যের চিত্র আরও স্পষ্ট হয়। কর্মক্ষম পুরুষদের মধ্যে শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ৭৯.৯৬ শতাংশ, যেখানে নারীদের ক্ষেত্রে তা মাত্র ৩৮.৪০ শতাংশ। এই ব্যবধান শ্রমবাজারে নারীর প্রবেশের ক্ষেত্রে কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার ইঙ্গিত দেয়।

কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও একই ধরনের বৈষম্য লক্ষ্য করা যায়। দেশে মোট কর্মে নিয়োজিত মানুষের সংখ্যা ৬৯.০৯ মিলিয়ন (৬ কোটি ৯০ লাখ ৯০ হাজার)। এর মধ্যে পুরুষ ৪৬.২২ মিলিয়ন (৪ কোটি ৬২ লাখ ২০ হাজার) এবং নারী ২২.৮৭ মিলিয়ন (২ কোটি ২৮ লাখ ৭০ হাজার)। অর্থাৎ কর্মসংস্থানে নারীর উপস্থিতি থাকলেও তা পুরুষের তুলনায় অনেক কম। খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, কৃষি খাতে সবচেয়ে বেশি মানুষ কর্মরত, এরপর সেবা ও শিল্প খাত। তবে নারীরা মূলত কৃষি এবং অনানুষ্ঠানিক সেবা খাতে বেশি যুক্ত, যেখানে আয় কম এবং কাজের নিরাপত্তা সীমিত।

worker-1সাক্ষরতার ক্ষেত্রেও একটি ইতিবাচক দিক রয়েছে। কর্মে নিয়োজিত মানুষের মধ্যে ৮১ শতাংশের বেশি সাক্ষর। তবে নিরক্ষর জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ এখনো শ্রমবাজারে রয়েছে, যা উৎপাদনশীলতা ও আয়ের ওপর প্রভাব ফেলছে। নারীদের ক্ষেত্রে এই চ্যালেঞ্জ আরও বেশি, কারণ অনেক নারী শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়ে কম দক্ষতার কাজে যুক্ত হচ্ছেন।

পেশাভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, কর্মে নিয়োজিত মানুষের সবচেয়ে বড় অংশ নিজস্ব ব্যবসা বা স্ব-কর্মসংস্থানে যুক্ত। এর পরেই রয়েছে কর্মচারী শ্রেণি। অবৈতনিক পারিবারিক শ্রমিকের একটি বড় অংশ নারী, যারা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকলেও তাদের শ্রমের কোনো সরাসরি আর্থিক মূল্যায়ন হয় না। এটি নারীর অর্থনৈতিক অবদানের অদৃশ্য রূপ, যা জাতীয় হিসাবেও পুরোপুরি প্রতিফলিত হয় না।

অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। মোট কর্মে নিয়োজিত মানুষের ৮৪ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন। এই খাতে নারীর উপস্থিতি অত্যন্ত বেশি। গ্রামাঞ্চলে অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান শহরের তুলনায় বেশি হলেও উভয় ক্ষেত্রেই নারীরা অনিরাপদ ও অস্থায়ী কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ। অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজের অর্থ হলো—নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা নেই, নেই চাকরির নিরাপত্তা, নেই সামাজিক সুরক্ষা।

আয়ের ক্ষেত্রে বৈষম্য আরও স্পষ্ট। বেতন বা মজুরিভিত্তিক কর্মীদের গড় মাসিক আয় ১৫ হাজার ৫৫৪ টাকা। এর মধ্যে পুরুষদের গড় আয় ১৬ হাজার ১০৫ টাকা, আর নারীদের গড় আয় মাত্র ১২ হাজার ৬৮১ টাকা। একই ধরনের কাজ করেও নারীরা কম পারিশ্রমিক পাচ্ছেন, যা শ্রমবাজারে বৈষম্যের একটি বড় দৃষ্টান্ত।

বেকারত্বের চিত্র তুলনামূলক স্থিতিশীল হলেও এর ভেতরের বাস্তবতা ভিন্ন। দেশে মোট বেকার মানুষের সংখ্যা ২.৬২ মিলিয়ন (২৬ লাখ ২০ হাজার) এবং বেকারত্বের হার ৩.৬৬ শতাংশ। পুরুষ ও নারীর বেকারত্বের হার কাছাকাছি হলেও অনেক নারী কাজের সন্ধান না করে শ্রমশক্তির বাইরে থাকেন, যেটি প্রকৃত বেকারত্বের চিত্রকে আংশিকভাবে আড়াল করে।

worker-2শ্রমের অপূর্ণ ব্যবহারের দিকটিও গুরুত্বপূর্ণ। প্রায় ৬.৩০ মিলিয়ন (৬৩ লাখ) মানুষ শ্রমের অপূর্ণ ব্যবহারের মধ্যে রয়েছেন। এদের মধ্যে বেকার, আংশিক কর্মসংস্থানে যুক্ত এবং সম্ভাব্য শ্রমশক্তি অন্তর্ভুক্ত। নারীদের একটি বড় অংশ এই শ্রেণিতে পড়ে, যারা কাজ করতে আগ্রহী হলেও সুযোগ বা পরিবেশের অভাবে শ্রমবাজারে সক্রিয় হতে পারছেন না।

যুব শ্রমশক্তি দেশের অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মোট শ্রমশক্তির একটি বড় অংশ যুব জনগোষ্ঠী। তবে এই গোষ্ঠীর মধ্যেও বৈষম্য রয়েছে। অনেক যুব নারী শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা প্রশিক্ষণের বাইরে রয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, শ্রমবাজারে নারীর এই বৈষম্যের পেছনে রয়েছে সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক নানা কারণ। পারিবারিক দায়িত্বের চাপ, নিরাপদ কর্মপরিবেশের অভাব, মাতৃত্বকালীন সুবিধার সীমাবদ্ধতা এবং সামাজিক মানসিকতা নারীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণকে সীমিত করে। এছাড়া শ্রম আইন থাকলেও তার কার্যকর প্রয়োগে ঘাটতি রয়েছে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নারীদের সমান সুযোগ ও মজুরি নিশ্চিত করা গেলে দেশের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। শ্রমবাজারে নারীর পূর্ণ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে উৎপাদনশীলতা বাড়বে, আয় বৈষম্য কমবে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) ও অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশা ঢাকা মেইলকে বলেন, গত এক দশকে শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণে কিছু অগ্রগতি দেখা গেলেও সাম্প্রতিক সময়ে সেই প্রবণতা স্থবির হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে নারীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণের হার কমে যাওয়া উদ্বেগের বিষয়। তিনি উল্লেখ করেন, দেশের অধিকাংশ নারী এখনো কৃষি ও অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করছেন, যেখানে কাজের স্বীকৃতি ও সুযোগ সীমিত। ব্যবস্থাপনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানেও নারীদের উপস্থিতি খুবই কম।

ঢাবি অধ্যাপক বলেন, শ্রমবাজারের পিতৃতান্ত্রিক কাঠামো, সামাজিক নিয়ন্ত্রণ, গৃহস্থালি ও পরিচর্যার বাড়তি দায়িত্ব, শিশুযত্ন সুবিধার অভাব এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতা নারীদের অংশগ্রহণে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। পাশাপাশি নারীদের অনানুষ্ঠানিক ও অদৃশ্য শ্রম অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও তা নীতিনির্ধারণ বা জাতীয় আয়ের হিসাবের মধ্যে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না।

বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ ঢাকা মেইলকে বলেন, বিদ্যমান পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবন্ধকতা দূর করে একটি জেন্ডার-সংবেদনশীল শ্রমবাজার গড়ে তোলা জরুরি। তিনি শ্রম আইন সংস্কার, নারীবান্ধব কর্মঘণ্টা নির্ধারণ, নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থা এবং কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে কঠোর নীতিমালা প্রণয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, বিপণন সহায়তা এবং ডিজিটাল প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণের আহ্বান জানান।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন ঢাকা মেইলকে বলেন, নারীর আর্থিক ক্ষমতায়নের পথে প্রধান বাধাগুলোর একটি হলো তাদের মূলধারার অর্থনীতিতে পূর্ণাঙ্গভাবে অন্তর্ভুক্ত না করা এবং তাদের শ্রমকে যথাযথ মূল্যায়ন না করা। তিনি মনে করেন, শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ হ্রাস একটি কাঠামোগত সমস্যার ইঙ্গিত দেয়, যা সমন্বিত ও লক্ষ্যভিত্তিক নীতিগত উদ্যোগের মাধ্যমে সমাধান করা প্রয়োজন।

worker-3বাংলাদেশ সেন্টার ফর ওয়ার্কার্স সলিডারিটির নির্বাহী পরিচালক কল্পনা আক্তার বলেন, দেশের অর্থনীতি আজ অনেকটাই নারী শ্রমিকদের কাঁধে দাঁড়িয়ে আছে। তৈরি পোশাক, কৃষি, চা–বাগান, গৃহকর্ম, নির্মাণ, হোটেল-রেস্তোরাঁ ও সেবা খাতসহ প্রায় সব ক্ষেত্রেই নারীরা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। কিন্তু এই অবদান সত্ত্বেও কর্মক্ষেত্রে তারা নানাভাবে বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। মজুরি, নিরাপত্তা, মাতৃত্বকালীন সুবিধা, নেতৃত্বের সুযোগ এবং সামাজিক মর্যাদার ক্ষেত্রে নারীদের সামনে এখনো অদৃশ্য বাধা রয়ে গেছে।

কল্পনা আক্তার বলেন, শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ আগের তুলনায় বাড়লেও তাদের অধিকাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন, যেখানে নেই শ্রম আইনের সুরক্ষা, নেই ন্যায্য মজুরি বা স্থায়ী নিরাপত্তা। তৈরি পোশাক শিল্প, কৃষি কিংবা গৃহকর্ম—প্রতিটি খাতেই নারীরা পুরুষদের তুলনায় কম পারিশ্রমিক পান এবং পদোন্নতির সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হন। অনেক ক্ষেত্রে মাতৃত্বকালীন ছুটি বা কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার নিশ্চয়তাও থাকে না, যা নারীদের কর্মজীবনকে আরও অনিশ্চিত করে তোলে।

এই বৈষম্য শুধু লিঙ্গভিত্তিক নয় জানিয়ে তিনি বলেন, এটি সামাজিক, অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর প্রতিফলন। শ্রম আইন থাকলেও তার যথাযথ প্রয়োগ না হওয়ায় ‘সমান কাজের জন্য সমান মজুরি’ বাস্তবায়ন হচ্ছে না। নারীদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ, সমান মজুরি এবং নেতৃত্বে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে না পারলে এই বৈষম্য দূর হবে না। এজন্য কার্যকর নীতি বাস্তবায়ন, শ্রম আইন প্রয়োগ এবং সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি।

এএইচ/জেবি