images

জাতীয়

রোদ-বৃষ্টি-ঝড়েও থামে না নির্মাণ শ্রমিকদের জীবনসংগ্রাম

মুহা. তারিক আবেদীন ইমন

০১ মে ২০২৬, ০৬:৫৭ এএম

রাজধানীর আকাশে যখন আগুনঝরা রোদ, তখনও থামে না ছেনি-হাতুড়ির শব্দ। আবার কালো মেঘে ঢেকে গিয়ে ঝড়-বৃষ্টি নামলেও বন্ধ হয় না ইট, বালু আর সিমেন্টের কাজ। শহরের বহুতল ভবন, সেতু ও সড়ক-সবকিছুর পেছনে প্রতিদিন নিজের জীবনকে বাজি রেখে যে মানুষগুলো কাজ করে, তারা নির্মাণ শ্রমিক। প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করেই যাদের প্রতিটি দিন শুরু হয় এবং শেষ হয়।

ঢাকার বিভিন্ন নির্মাণস্থলে দেখা যায়, সকাল থেকে রাত অবধি কাজ করছেন শ্রমিকরা। মাথার ওপর তপ্ত রোদ, পায়ের নিচে ধুলো-বালু, চারপাশে যন্ত্রের শব্দ-এই পরিবেশই তাদের নিত্যদিনের বাস্তবতা। গরমে ঘাম ঝরে, শরীর ক্লান্ত হয়, কিন্তু কাজ থামে না। কারণ দিন শেষে কাজ মানেই আয়, আর সেই আয়ের ওপর নির্ভর করে তাদের পরিবার।

রাজধানীর মান্ডার একটি নির্মাণ প্রকল্পে কাজ করছেন নির্মাণ শ্রমিক ফখরুল। কাঁধে বালুর বোঝা। ঢাকা মেইলকে তিনি বলেন, ‘রোদ-বৃষ্টি আমাদের দেখে না। কাজ বন্ধ করলে পেট চলবে না। তাই যত কষ্টই হোক, কাজ করতেই হয়।’ কথার মাঝেই আবার কাজে ফিরে যান তিনি।

Emon_worker-1একই প্রকল্পে কাজ করা সাজ্জাদ জানান, বৃষ্টি হলে কাজ করা আরও কঠিন হয়ে যায়। মাটি পিচ্ছিল হয়ে যায়, উঠানামা করতে ভয় লাগে। তবুও থামার উপায় নেই। বৃষ্টি হলে অনেক সময় কাপড় ভিজে থাকে, ঠান্ডা লাগে, কিন্তু কাজ না করলে টাকা পাওয়া যাবে না।

নির্মাণ শ্রমিকদের জীবনে নিরাপত্তা ঝুঁকিও কম নয়। অনেক ক্ষেত্রেই পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকে না। হেলমেট, সেফটি বেল্ট বা অন্যান্য সুরক্ষা সরঞ্জাম ছাড়াই কাজ করতে দেখা যায় অনেককে। উচ্চতায় কাজ করার সময় সামান্য ভুলেই বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তবুও ঝুঁকি নিয়েই তারা কাজ চালিয়ে যান।

ঢাকার মতিঝিলের একটি বহুতল ভবনের নির্মাণকাজে নিয়োজিত শ্রমিক শহিদুল বলেন, ‘ভাই, ভয় তো লাগে। কিন্তু কাজ না করলে চলবে কীভাবে? আমরা গরিব মানুষ, ঝুঁকি নিতেই হয়। অনেক সময় নিরাপত্তা সরঞ্জাম থাকলেও তা সবার জন্য যথেষ্ট নয়।’

এই শ্রমিকদের অধিকাংশই গ্রাম থেকে আসা। ভালো আয়ের আশায় তারা শহরে পাড়ি জমান। কিন্তু বাস্তবতা অনেক কঠিন। অস্থায়ী বসবাস, অনিশ্চিত আয়, স্বাস্থ্যঝুঁকি-সব মিলিয়ে তাদের জীবনযাপন সহজ নয়। তবুও পরিবারের জন্য ভালো কিছু করার স্বপ্নে তারা লড়ে যান প্রতিদিন।

তাদের কাজের সময়ও নির্দিষ্ট নয়। অনেক সময় ভোর থেকে শুরু হয়ে সন্ধ্যা বা রাত পর্যন্ত কাজ চলে। কাজের ধরন ও প্রকল্পের সময়সীমার ওপর নির্ভর করে তাদের কাজের চাপ বাড়ে বা কমে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিশ্রামের সুযোগ সীমিত।

শ্রমিকরা জানান, গরমের সময় কাজ করা সবচেয়ে কষ্টকর। সূর্যের তাপে শরীর পুড়ে যায়, মাথা ঘোরে, অনেক সময় অসুস্থও হয়ে পড়েন। আবার বর্ষাকালে বৃষ্টি ও কাদার কারণে কাজের পরিবেশ হয়ে ওঠে আরও ঝুঁকিপূর্ণ। তবুও কাজ থামে না।

Emon_worker-2রাজধানীর মালিবাগ এলাকায় কাজ করা শ্রমিক বাহালুল বলেন, ‘রোদে কাজ করলে মাথা ঝিমঝিম করে। মাঝে মাঝে বসে পানি খাই, তারপর আবার কাজে নামি। বৃষ্টি হলে কাদা হয়ে যায়, পা পিছলে পড়ে যাওয়ার ভয় থাকে।’

নির্মাণ খাত দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই খাতের ওপর নির্ভর করে হাজার হাজার শ্রমিকের জীবিকা। শহরের অবকাঠামোগত উন্নয়নে তাদের অবদান অপরিসীম। কিন্তু সেই তুলনায় তাদের জীবনমান এখনও পিছিয়ে।

শ্রমিকরা বলেন, কাজের কষ্টের তুলনায় মজুরি খুব বেশি নয়। আবার অসুস্থ হলে বা দুর্ঘটনা ঘটলে অনেক সময় যথাযথ সহায়তা পাওয়া যায় না। নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা বা বীমার সুবিধাও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তাদের নাগালের বাইরে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নির্মাণ শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও কল্যাণে আরও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। শ্রম আইন বাস্তবায়ন, সুরক্ষা সরঞ্জাম নিশ্চিত করা, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার করা হলে তাদের জীবনমান উন্নত হতে পারে।

সব প্রতিকূলতা সত্ত্বেও নির্মাণ শ্রমিকরা থেমে নেই। প্রখর রোদ, ঝড় কিংবা বৃষ্টি—কোনো কিছুই তাদের কাজ থেকে বিরত রাখতে পারে না। দিন শেষে ক্লান্ত শরীরে তারা যখন বাসায় ফেরেন, তখনও পরের দিনের কাজের চিন্তা থাকে মাথায়। কারণ তাদের জীবনে থেমে থাকার সুযোগ নেই। কাজই তাদের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন, আর সেই কাজ নিয়েই তারা এগিয়ে চলেছেন প্রতিদিন।

টিএই/এমআর