একে সালমান
৩০ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:৫৪ পিএম
# নিয়োগের প্রলোভন দেখিয়ে নেওয়া হচ্ছে বিপুল অর্থ
# নেছারুলের ছেলের জন্য বিএনপি মহাসচিবের সুপারিশ
# উচ্চপর্যায়ের দোহাই দেওয়ায় তটস্থ মন্ত্রণালয়ে কর্মকর্তারা
# অস্থায়ী নিয়োগ হলে ফের বড় অনিয়মের শঙ্কা
দেশের মুসলিম বিবাহ ও তালাক নিবন্ধন ব্যবস্থায় আবারো ভর করেছে নিয়োগ বাণিজ্য ও অনিয়মের ছায়া। ২০১৩ সালের বিতর্কিত ‘অস্থায়ী কাজী’ নিয়োগের পুনরাবৃত্তির আশঙ্কায় আইন মন্ত্রণালয়ে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। বর্তমান রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে চক্রটির লাগামহীন তদবিরে অতিষ্ঠ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। অভিযোগ রয়েছে, মন্ত্রণালয়কে চাপে রাখতে সরকার ও ক্ষমতাসীন বিএনপির শীর্ষ নেতাদের নামও ব্যবহার করছে চক্রটি। এতে কর্মকর্তাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে আতঙ্ক।
এমন পরিস্থিতিতে অস্থায়ী নিয়োগ বন্ধের দাবি জানিয়ে আইনমন্ত্রীর কাছে চিঠি দিয়েছে নিকাহ রেজিস্ট্রারদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ মুসলিম নিকাহ্ রেজিস্ট্রার কল্যাণ সমিতি’।
সিন্ডিকেটের সামনের সারিতে যারা
তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সিন্ডিকেটটির নেতৃত্বে রয়েছেন নিকাহ রেজিস্ট্রার সমিতির সভাপতি ও জাতীয়তাবাদী ওলামা দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাওলানা নেছারুল হক। তার সঙ্গে প্রধান সহযোগী হিসেবে আছেন সংগঠনের মহাসচিব ও ওলামা দলের বর্তমান আহ্বায়ক সেলিম রেজা এবং নির্বাহী সভাপতি কাজী ইকবাল হোসাইন।
অভিযোগ রয়েছে, নেছারুল হক নিজে পটুয়াখালীর ওয়াজেদিয়া কামিল মাদরাসার অধ্যক্ষ। কিন্তু নিয়মে না থাকলেও তিনি দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাজী হিসেবে কর্মরত আছেন।
সম্প্রতি তিনি রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ঢাকার ১৫ নং ওয়ার্ড (গ্রীন রোড) এলাকায় নিজের ছেলেকে ‘অস্থায়ী কাজী’ হিসেবে নিয়োগ দিতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। এই নিয়োগের জন্য তিনি বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সুপারিশ সম্বলিত আবেদন মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছেন। দ্রুত ছেলের নিয়োগ সম্পন্ন করতে আইন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ওপর ‘প্রধানমন্ত্রীর দোহাই’ দিয়ে তিনি চাপ সৃষ্টি করছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
এছাড়াও জাতীয়তাবাদী ওলামা দলের কেন্দ্রীয় সদস্য ও বাংলাদেশ মুসলিম নিকাহ রেজিস্ট্রার সমিতি সলিম উল্লাহ এই সিন্ডিকেটের অন্যতম বলে জানা গেছে। এ পর্যন্ত অস্থায়ী নিয়োগ প্রত্যাশী প্রায় অর্ধশতাধিক লোকের কাছ থেকে বিপুল টাকা আগাম নিয়েছেন বলেও অভিযোগ আছে।
পুরোনো অনিয়মের পুনরাবৃত্তি
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৩ সালে তৎকালীন আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলামের প্রভাব খাটিয়ে ২০০৯ সালের বিধিমালা উপেক্ষা করে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছিল। সেই সময়ে অস্থায়ী নিয়োগের আড়ালে শত শত ভুয়া নিয়োগপত্র তৈরি এবং বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটে। তখনকার আইন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব হেমায়েত উদ্দিনের স্বাক্ষর জাল করার বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে, যা বর্তমানে হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন।
এমন পরিস্থিতির কারণে ২০১৪ সাল থেকে এই অস্থায়ী নিয়োগ পুরোপুরি বন্ধ থাকায় নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও সুশৃঙ্খলভাবে চলছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন পর আবারো সেই বিতর্কিত পদ্ধতিতে নিয়োগ দেওয়ার অপচেষ্টা মন্ত্রণালয়ে এক ধরণের ‘আতঙ্ক’ সৃষ্টি করেছে।
অস্থায়ী নিয়োগ না দিতে মন্ত্রীকে কাজীদের চিঠি
এদিকে অস্থায়ী নিয়োগ বন্ধসহ বেশ কিছু দাবিতে আইনমন্ত্রীর কাছে লিখিত আবেদন দিয়েছে ‘বাংলাদেশ মুসলিম নিকাহ্ রেজিস্ট্রার কল্যাণ সমিতি’। সেখানে তারা দাবি করেছেন, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায় (সিভিল আপিল নং-৪৮/২০১১) অনুযায়ী সামরিক সরকারের অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ায় এবং বিদ্যমান বিধিমালা সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত অস্থায়ী নিয়োগ দেওয়ার কোনো আইনি সুযোগ নেই। এছাড়াও ২০০৯ সালের বিধিমালা অনুযায়ী, স্থানীয় সংসদ সদস্য, ডেপুটি কমিশনার এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত কমিটির মাধ্যমে প্যানেল প্রস্তুত করে স্থায়ী নিয়োগ দেওয়াই আইনি বিধান। অস্থায়ী নিয়োগ এই বিধিমালার পরিপন্থী।
এছাড়াও আবেদনে কাজীদের পেশাগত বেশ কিছু দাবি-দাওয়া জানানো হয়েছে সংগঠনটির পক্ষ থেকে। অনিয়ম রোধের পাশাপাশি কল্যাণ সমিতি তাদের পেশাগত মানোন্নয়নে ৮ দফা দাবি উল্লেখ করেছে। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- নিকাহ্ রেজিস্ট্রারদের অবসরের বয়স ৬৭ থেকে বাড়িয়ে ৭৫ বছর করা, বাবার স্থলে যোগ্য পুত্রকে প্যানেল ছাড়াই সরাসরি নিয়োগের বিধান করা, মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে শাস্তি প্রদান বন্ধ করে আইনি সুরক্ষা প্রদান, বিবাহ নিবন্ধন ফি প্রতি হাজারে ১৪ টাকার পরিবর্তে ২০ টাকা করা এবং তালাক নিবন্ধন ফি ৩ হাজার টাকা নির্ধারণ করা, বাল্যবিবাহ রোধে বিবাহ সংক্রান্ত হলফনামার বিধান বাতিল করা এবং বর ও কনের বিবাহের বয়স পূনঃর্নিধারণ।
মন্ত্রণালয়ে চাপ, কর্মকর্তাদের উদ্বেগ
আইন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, এই সিন্ডিকেট একদিকে কর্মকর্তাদের চাপে রাখছে, অন্যদিকে সারাদেশের পদপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে নিয়োগের আশ্বাস দিয়ে বড় অংকের অর্থ লেনদেন করছে। বর্তমান কাজীরা আশঙ্কা করছেন, অস্থায়ী নিয়োগ চালু হলে আবারো ভুয়া কাজীর দাপট বাড়বে এবং এক অধিক্ষেত্রে একাধিক নিবন্ধক নিয়োগের মতো বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘সরকারের উচ্চ মহল অবহিত এমনটা জানিয়ে অস্থায়ী নিয়োগসহ বিভিন্ন বিষয়ে এসব লোক প্রতিনিয়ত মন্ত্রণালয়ে আসছেন। ঠিকঠাক যেন কাজ করা হয় সেই চাপও দিচ্ছেন। অথচ এখন দেশে এমন কোনো পরিস্থিতি নেই যে কাউকে অস্থায়ী নিয়োগ দিতে হবে। সবাই আতঙ্কে আছে কাজ না হলে কার বিষয়ে কোন ধরণের অভিযোগ দিয়ে বিপদে ফেলা হতে পারে।’
অভিযোগের বিষয়ে যা বললেন নেতারা
বাংলাদেশ নিকাহ রেজিস্ট্রার সমিতির সভাপতি ও ওলামা দলের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক সেলিম রেজা ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আমি এই মূহুর্তে মিনিস্ট্রিতে (সচিবালয়) আছি। আমরা সরকারের বিধির বাইরে কোনো কিছু করছি না।’
অস্থায়ী কাজী নিয়োগ দিতে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের চাপ প্রয়োগ করছেন- এমন প্রশ্নের জবাবে সেলিম রেজা বলেন, ‘আপনার কোন কথা থাকলে আপনি সামনাসামনি এসে বলেন। সামনে বসলে আপনাকে সব বুঝিয়ে দেওয়া যাবে। আমি ফোনে কিছু বলতে পারব না।’
নিকাহ রেজিস্ট্রার সমিতির নির্বাহী সভাপতি ইকবাল হোসাইন ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আমরা অস্থায়ী কাজী নিয়োগের জন্য কাউকে চাপ সৃষ্টি করিনি। আমরা মন্ত্রনালয়ের কাছে ৯ দফা দাবি দিয়েছি। পরবর্তী পর্যায়ে দেখলাম ফ্যাসিস্টের দোসররা ৯ দফা দাবি দিয়ে আরেকটা দাবি-দাওয়া দিয়েছে। আমাদের মূল দাবি হলো- পিতা গ্রেফতার হলে সন্তানকে সরাসরি নিয়োগ দিতে হবে। এটা আমাদের আগের দাবি ছিল। এ দাবি অনুযায়ী তারা কাজ না করে সরাসরি তারা তাদের ইচ্ছেমতো লোকজন নিয়োগ দিয়েছে। এখানে ইনজাস্টিস করা হয়েছে।’
অস্থায়ী কাজী নিয়োগ দিতে মন্ত্রণালয়ে চাপ সৃষ্টি করার অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘কিছু দোসর আছে। তারা আপনাদের মতো সাংবাদিকদের কান ভারী করার জন্য বিভিন্ন জায়গায় যাচ্ছে। সরকার কাকে নিয়োগ দেবে এটা সরকারের বিষয়। যে কেউ আবেদন করতে পারে। কিন্তু সরকারের সিদ্ধান্তে নিয়োগ হবে। কিছু চিটার-বাটপার আছে, তারা তাদের স্বার্থে অনেক ভূয়া নিয়োগ দিয়েছে। সেগুলো আমি সরকারের কাছে তথ্য প্রমাণ দিয়েছি।’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে শাহ নেছারুল হকের সঙ্গে কথা বলতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে হোয়াটসঅ্যাপে অভিযোগের বিষয় ক্ষুদেবার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি।
যা বলছে মন্ত্রণালয়
অস্থায়ী কাজী নিয়োগের বিষয়ে জানতে আইন মন্ত্রণালয়ে সংশ্লিষ্ট শাখায় যোগাযোগ করা হলে কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে রাজি হননি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কর্মকর্তা ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘অনেকদিন ব্ন্ধ থাকার পরও অনেকেই অস্থায়ী কাজী নিয়োগের জন্য চেষ্টা-তদবির করছেন। কিন্তু সরকারের এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেই।অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে অস্থায়ী একটা নিয়োগও হয়নি।’
একেএস/এমআর