নিজস্ব প্রতিবেদক
২৯ এপ্রিল ২০২৬, ১০:৫৩ পিএম
রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় শহীদ শাহনেওয়াজ হলের সামনে বটতলা এলাকায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাইম আহমেদ টিটন নিহতের ঘটনায় অপরাধীদের নানা সূত্র ধরে তদন্ত করছে পুলিশ।
এ ঘটনায় মোহাম্মদপুরের আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলালকে প্রধান আসামি করে নিউমার্কেট থানায় হত্যা মামলা করেছেন নিহতের বড় ভাই খন্দকার সাঈদ আক্তার রিপন।
বুধবার (২৯ এপ্রিল) সকালে নিউমার্কেট থানায় উপস্থিত হয়ে তিনি মামলাটি করেন।
এদিকে পুলিশের একটি সূত্র বলছে, ২০০১ সালে সরকার ঘোষিত ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকায় ২ নম্বরে থাকা টিটন ছিলেন দেশের অপরাধ জগতের এক পরিচিত নাম। পুলিশের ধারণা, শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের জেরেই তিনি হত্যার শিকার হয়েছেন।
টিটন আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমনের শ্যালক ছিলেন। ১৯৯০-এর দশকের শুরুর দিকে স্থানীয় অপরাধী চক্রের মাধ্যমে অপরাধজগতে প্রবেশ করে টিটন ধীরে ধীরে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেন। একাধিক হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্ব দেওয়া ছাড়াও তিনি অস্ত্র ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিলেন। তার বিরুদ্ধে বহু হত্যা মামলা ছিল, যার মধ্যে ব্যবসায়ী বাবর এলাহী হত্যা অন্যতম। এই হত্যা মামলায় তার মৃত্যুদণ্ড হয়। তবে ২০২৪ সালের ১২ আগস্ট জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র জানিয়েছে।
মামলার এজাহারে বাদী উল্লেখ করেন, টিটন অতীতে পরিবারের আর্থিক ক্ষতির জন্য অনুশোচনা প্রকাশ করে বড় ভাইয়ের সঙ্গে মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। তিনি নতুন করে ব্যবসা শুরু করার চেষ্টা করছিলেন এবং একটি গরুর হাটের ইজারা (শিডিউল) কেনার কথাও জানান। এজাহারে ঘটনার পেছনে গরুর হাটের ইজারা (শিডিউল) নিয়ে বিরোধকে দায়ী করা হয়েছে।
এই ইজারা নিয়ে এনামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্ছি হেলাল, বাদল ওরফে কিলার বাদল ওরফে কাইল্লা বাদল, শাজাহান ও রনি ওরফে ভাঙ্গারি রনি সহ কয়েকজনের সঙ্গে টিটনের বিরোধ তৈরি হয়। ২৭ এপ্রিল টিটন তার বড় ভাইকে ফোন করে জানান, প্রতিপক্ষ তাকে ডেকেছে এবং তারা সমঝোতার মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসা করতে চায়। পরদিন ২৮ এপ্রিল সন্ধ্যা আনুমানিক ৭টা ৫০ মিনিটে শাহনেওয়াজ হলের সামনে বটতলা পাকা সড়কে টিটনের ওপর হামলা চালানো হয়। এজাহারে বলা হয়, মোটরসাইকেলে করে আসা দুইজন অস্ত্রধারী ব্যক্তি এবং তাদের সঙ্গে থাকা আরও ৫ থেকে ৭ জনের পরিকল্পনায় টিটনকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি চালানো হয়।
গুলিতে তার ডান কানের উপরের অংশ, বাম ভ্রুর উপরের কপাল, পিঠের বাম পাশের নিচে ও ডান পাশের ওপরের অংশ, বাম হাতের কনুইয়ের উপরের সামনের দিক ও নিচের অংশ এবং বাম বগলের নিচে গুরুতর আঘাত লাগে। এতে তিনি রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। পরে স্থানীয় লোকজন তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক রাত ৮ টা ২৭ মিনিটে তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এজাহারে আরও বলা হয়, খবর পেয়ে বাদী যশোর থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে ২৯ এপ্রিল ভোর আনুমানিক ৬ টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পৌঁছে ভাইয়ের লাশ শনাক্ত করেন। এ সময় তিনি নিউমার্কেট থানা পুলিশের প্রস্তুত করা সুরতহাল রিপোর্টের সময় উপস্থিত ছিলেন। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে থানায় মামলা করতে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে বলেও এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশের একটি সূত্র থেকে জানা যায়, পিচ্চি হেলালের হয়ে হত্যার পরিকল্পনায় রায়ের বাজারের জুয়েল রাজ, নাক্কা সোহেল,লালমাটিয়ার জাহিদ হোসেন মোড়ল,জাকির হোসেন রোডের মেহেদী হাসান রুবেল ওরফে তার চোর রুবেল জড়িত।
পুলিশের আরেকটি সূত্রে জানা যায়, বাদল ওরফে কাইল্লা বাদলের স্ত্রীকে টিটন একটি বাসায় রাখেন। এ নিয়ে কাইল্লা বাদলের সঙ্গে দ্বন্দ্ব চলছিল। জাকির হোসেন রোডের মেহেদী হাসান রুবেল ওরফে তার চোর রুবেল ধানমন্ডি এলাকায় মাটির নিচ দিয়ে ডিপিডিসির কাজ চলছে। সেখান থেকে টনকে টন টিএনটি এবং ডিপিডিসির তার উত্তোলন করে সেগুলো লক্ষ লক্ষ টাকায় বিক্রি করে। এই তার চুরির ঘটনায় টিটন তার কাছে ভাগ চায়। এটি নিয়ে তার সঙ্গেও দ্বন্দ্ব চলছিল।
পুলিশের আরেকটি সূত্র থেকে জানা যায়, জেল থেকে বের হওয়ার পর টিটন শীর্ষ সন্ত্রাসী পিচ্চি হেলালের সঙ্গে যোগ দেয়। এ নিয়ে আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজেদুল হক ইমনের সঙ্গে দ্বন্দ্ব চলছিল। টিটন সাজেদুল হক ইমনের ছোট বউ নীলার বড় ভাই। তবে থানায় শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমনের বিরুদ্ধে মামলা করেননি নিহত লিটনের ভাই।
এদিকে বুধবার বিকালে এক সংবাদ সম্মেলনে ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, এই হত্যার ঘটনায় গোয়েন্দারা মাঠে কাজ করছে। এরইমধ্যে বেশ কয়েকজনকে শনাক্তও করা হয়েছে। দ্রুত একটা ভালো ফলাফল মিলবে।
একেএস/এএইচ