images

জাতীয়

জ্বালানি তেলের সংকট ও বিদ্যুতের ভোগান্তিতে ‘কিছুটা স্বস্তি’

নিজস্ব প্রতিবেদক

২৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:৫৭ পিএম

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে দেশে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে জ্বালানি সংকট তীব্র আকার ধারণ করে। এর ধাক্কা লাগে বিদ্যুতেও। সক্ষমতা থাকলেও জ্বালানি সংকটের কারণে ব্যাহত হয় বিদ্যুৎ উৎপাদন। এতে একদিকে জ্বালানি তেলের পাম্পগুলোতে দীর্ঘ সারি, অন্যদিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিংয়ে নাজেহাল জনজীবন। তাপপ্রবাহের কারণে মানুষের কষ্ট চরম আকার ধারণ করে।

তবে সরকারের নানা উদ্যোগে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। পাম্পগুলোতে কমেছে মানুষের সারি, অন্যদিকে সারাদেশে ঝড়-বৃষ্টিতে বিদ্যুতের চাহিদা কমে যাওয়ায় লোডশেডিংও কিছুটা সহনীয় মাত্রায় এসেছে। এতে আগের তুলনায় কিছুটা হলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে। যদিও এখনো ভোগান্তি শেষ হয়নি।   

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি একযোগে ইরানে হামলা চালায় ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। পাল্টা জবাব দেয় ইরানও। এতে যুদ্ধ পরিস্থিতি বিরাজ করে গোটা মধ্যপ্রাচ্যে। এক মাসের বেশি সময় যুদ্ধ চলার পর সাময়িক যুদ্ধবিরতি চলছে। স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় আলোচনা করছে দুই পক্ষই। এই যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেল সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এর প্রভাব পড়ে গোটা বিশ্বে।

আরও পড়ুন

কমে এসেছে পাম্পে গ্রাহকদের লাইন, গতি বাড়ায় ফিরছে স্বস্তি

বাদ যায়নি বাংলাদেশও। জ্বালানি সংকট তীব্র আকার ধারণ করে। ফিলিং স্টেশনগুলোয় তেলের জন্য হাহাকার শুরু হয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও তেল না পাওয়ার অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা। অপরদিকে সরকার দাবি করে, স্বাভাবিক সময়ের তুলনা বেশি তেল সরবরাহ করলেও তা অল্প সময়েই শেষ হয়ে যাচ্ছে। এর জন্য চোরাচালানকেও দায়ী করা হয়। এক পর্যায়ে সরকার জ্বালানি তেলের দাম বাড়াতে বাধ্য হয়।

Oil-crysis
জ্বালানি তেলের জন্য দীর্ঘ সারি ছিল কয়েক দিন আগেও। ছবি: ঢাকা মেইল

দাম বাড়ানোর পর জ্বালানি তেলের সরবরাহ বৃদ্ধি, জ্বালানি সংগ্রহে ফুয়েল পাসের পরিধি বাড়ানো, চোরাচালান রোধে নজরদারিসহ বেশ কিছু উদ্যোগের ফলে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হতে থাকে। সবশেষ সোমবার (২৭ এপ্রিল) রাজধানীর বেশ কিছু পাম্প ঘুরে দেখা গেছে, সেখানে নেই আগের মতো দীর্ঘ লাইন, নেই বিশৃঙ্খলাও। যারা তেল নিতে আসছেন অল্প সময়েই পেয়ে যাচ্ছেন।

শাহবাগের মেঘনা মডেল সার্ভিস পাম্পে ‎মোটরসাইকেলের জ্বালানি সংগ্রহে লাইনে অপেক্ষা করছিলেন শামীম আহমেদ। জানতে চাইলে তিনি বলেন, আগে এখানে কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ লাইন হতো। এখানকার অলিগলি ঘুরে লাইন এসে পাম্পে লাগতো। কিন্তু এখন অল্প সময়েই তেল নেওয়া যায়।

আরও পড়ুন

লোডশেডিং নিয়ে ‘সুখবর’ দিলেন বিদ্যুৎমন্ত্রী

মৎস্য ভবন সংলগ্ন রমনা ফিলিং স্টেশনেও দেখা যায় একই চিত্র। কয়েক দিন আগেও প্রেসক্লাব, সেগুনবাগিচা ও বারডেম হাসপাতাল এলাকা পর্যন্ত দীর্ঘ যানবাহনের সারি থাকতো। সোমবার পুরো এলাকা ছিল প্রায় যানজটমুক্ত।

এদিকে রাজধানীর বাইরেও বিভিন্ন এলাকায় পাম্পগুলোতে ভিড় কমে আসার খবর পাওয়া গেছে। কোনো কোনো এলাকায় পাম্প ফাঁকা পড়ে রয়েছে এমন খবরও আসছে। তবে কোথাও কোথাও ভিড় আগের মতোই অব্যাহত আছে বলেও জানা গেছে। বিশেষ করে কৃষিনির্ভর এলাকাগুলোতে ডিজেলের জন্যা কৃষকদের মধ্যে হাহাকার বিরাজ করছে।

জ্বালানি তেল নিয়ে আরেকটি স্বস্তির খবর হলো, সৌদি আরব থেকে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে এই প্রথম বিকল্প রুট ব্যবহার করে আনা হচ্ছে জ্বালানি তেল। এক লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল বোঝাই জাহাজ ‘এমটি নিনেমিয়া’ সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে ২১ এপ্রিল রওনা দিয়েছে। ৫ মে নাগাদ চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পৌঁছবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এই তেল নিরাপদে সঠিক সময়ে চট্টগ্রাম পৌঁছলে বন্ধ হয়ে যাওয়া ইস্টার্ন রিফাইনারি পুনরায় চালু হবে। আর বিকল্প রুট দিয়েই ধারাবাহিকভাবে সৌদি আরব থেকে জ্বালানি তেল চট্টগ্রামে পৌঁছবে। একইসঙ্গে সংযুক্ত আরব-আমিরাতের ফুজাইরা বন্দর থেকেও বিকল্প রুট ব্যবহার করে জ্বালানি তেল আনার চিন্তা করছে সরকার। বিকল্প রুট পুরোপুরি চালু হয়ে গেলে হরমুজের ওপর নির্ভরতা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।

Loadsheding
লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল জীবন। ছবি: সংগৃহীত

এদিকে জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হতে থাকে। ফলে সারাদেশে অসহনীয় মাত্রায় পৌঁছে লোডশেডিং। কোথাও কোথাও দিন-রাতের বেশির ভাগ সময়ই বিদ্যুৎ থাকে না বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। তীব্র গরমে এতে প্রচণ্ড ভোগান্তিতে পড়ে সাধারণ মানুষ। তবে গত দুই তিন দিন ধরে দেশে ‘ঝুমুল’ নামে একটি বৃষ্টি বলয় সক্রিয় হয়েছে। এর প্রভাবে সারাদেশে ঝড়-বৃষ্টি শুরু হয়েছে। এতে তাপমাত্রা কমে জনজীবনে ফিরেছে স্বস্তি। কমেছে বিদ্যুতের চাহিদা। আর এর প্রভাবে কমেছে লোডশেডিংয়ের মাত্রাও। বৃষ্টি বলয় আগামী আরও কয়েক দিন সক্রিয় থাকবে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদফতর। এতে লোডশেডিংয়ের মাত্রা কিছুটা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সোমবার (২৭ এপ্রিল) বেলা ৩টায় বিদ্যুতের চাহিদা নেমে আসে ১১ হাজার ৩১৭ মেগাওয়াটে, আর সরবরাহ করা হয় ১ হাজার ২৯৪ মেগাওয়াট। ফলে লোডশেডিং কমে দাঁড়ায় ২৩ মেগাওয়াটে। অর্থাৎ একদিনেই চাহিদা কমেছে ২ হাজার ৪৭৯ মেগাওয়াট। সোমবার যে হারে ঝড়-বৃষ্টি হচ্ছে দেশের বিভিন্ন এলাকায়, সে হিসাবে লোডশেডিং শূন্যে নামতে পারে বলে জানিয়েছে পিডিবি।

আরও পড়ুন

জ্বালানি সংকটে দিশেহারা কৃষক, ফসলে বিপর্যয়ের শঙ্কা

তাপপ্রবাহে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সর্বোচ্চ লোডশেডিং আড়াই থেকে তিন হাজার মেগাওয়াটে গিয়ে দাঁড়ায়। এরপর রোববার (২৬ এপ্রিল) হঠাৎ বৃষ্টি হওয়ায় তাপমাত্রা কমে যায়। ঢাকায় কয়েক ঘণ্টায় ৩২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়। আবহাওয়া অধিদফতর জানায়, চলতি সপ্তাহজুড়েই ঝড়-বৃষ্টি থাকতে পারে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। এতে বিদ্যুতে আপাতত স্বস্তি মিলতে পারে।

সোমবার (২৭ এপ্রিল) সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত বাংলাদেশ-চীন নবায়নযোগ্য জ্বালানি ফোরামের আলোচনায় অংশ নিয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানিয়েছেন, আগামী সপ্তাহ থেকে দেশে বিদ্যুতের অবস্থা ভালো হবে এবং লোডশেডিং কমে আসবে। মন্ত্রী বলেন, ‘আগামী ৫ বছরে সরকার ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করতে চায়। আগামী সপ্তাহ থেকে দেশে বিদ্যুতের অবস্থা ভালো হবে। কমে আসবে লোডশেডিং।’

জেবি