নিজস্ব প্রতিবেদক
২১ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৫ পিএম
দরিদ্র মানুষের ভূমির অধিকার নিশ্চিত করতে বিদ্যমান আইন ও নীতিমালার কার্যকর প্রয়োগের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বক্তারা।
তারা বলছেন, ভূমি প্রশ্ন কেবল অর্থনৈতিক বিষয় নয়; এটি সামাজিক ন্যায়, মানবাধিকার এবং আইনের শাসনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। আইন থাকলেও বাস্তব প্রয়োগের ঘাটতির কারণে দরিদ্র জনগোষ্ঠী এখনো ভূমি অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে বাংলাদেশ কৃষক ফেডারেশন আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন।
বক্তারা উল্লেখ করেন, দেশের সংবিধানে নাগরিকের মৌলিক প্রয়োজন নিশ্চিত করার যে নির্দেশনা রয়েছে, তা বাস্তবায়নের সঙ্গে ভূমির ন্যায্য বণ্টন সরাসরি সম্পর্কিত। রাষ্ট্রীয় মালিকানা, সমবায় মালিকানা ও ব্যক্তিগত মালিকানার সাংবিধানিক স্বীকৃতি থাকলেও দরিদ্র মানুষের ভূমিতে প্রবেশাধিকারে এখনো বৈষম্য রয়ে গেছে।
তারা বলেন, ১৯৫০ সালের স্টেট অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড টেন্যান্সি আইনের মাধ্যমে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত করা হলেও জমির সর্বোচ্চ মালিকানা সীমা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে বড় জমির মালিকরা নানা কৌশলে আইন এড়িয়ে গেছেন এবং ভূমি সংস্কারের লক্ষ্য অনেকাংশে অপূর্ণ রয়ে গেছে।
বক্তারা আরও বলেন, ১৯৮৪ সালের ভূমি সংস্কার অধ্যাদেশে একজন ব্যক্তির মালিকানাধীন জমির সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ এবং বর্গাচাষিদের অধিকার স্বীকৃতি দেওয়া হলেও বাস্তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব অধিকার কার্যকর হয়নি। লিখিত চুক্তির অভাবে বর্গাচাষিরা আইনি সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
খাসজমি বণ্টনের বিষয়ে বক্তারা বলেন, ভূমিহীন পরিবারের মধ্যে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে খাসজমি বিতরণের নীতিমালা থাকলেও বাস্তবে প্রভাবশালীদের দখল, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে প্রকৃত ভূমিহীনরা সেই সুবিধা পাচ্ছেন না। চরাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ দখলদারদের কাছ থেকে খাসজমি উদ্ধার করে ভূমিহীনদের মধ্যে বিতরণের দাবি জানান তারা।
ভূমি নিবন্ধন ও হস্তান্তর প্রক্রিয়ায় জটিলতা, উচ্চ ব্যয় এবং দুর্নীতির কারণে দরিদ্র মানুষের জন্য আইনি সেবা গ্রহণ কঠিন হয়ে পড়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়। একইসঙ্গে বিভিন্ন ধরনের ভূমি রেকর্ড—সিএস, এসএ, আরএস ও বিএস—এর অসামঞ্জস্য ভূমি বিরোধ বাড়িয়ে তুলছে বলে মন্তব্য করেন বক্তারা।
ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা ও ব্যয়বহুল বিচার প্রক্রিয়ার কারণে দরিদ্র মানুষের ন্যায়বিচার প্রাপ্তি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে উল্লেখ করে তারা বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি পদ্ধতি (এডিআর) আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেন। পাশাপাশি দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ ভূমি ট্রাইব্যুনাল গঠনের প্রস্তাবও তুলে ধরা হয়।
নারীর ভূমির অধিকার প্রসঙ্গে বক্তারা বলেন, আইনে উত্তরাধিকার স্বীকৃতি থাকলেও সামাজিক প্রতিবন্ধকতার কারণে অনেক নারী তাদের প্রাপ্য অংশ পান না। এ ক্ষেত্রে নারীর নামে ভূমি নিবন্ধনে প্রণোদনা ও সচেতনতা বাড়ানোর ওপর জোর দেন তারা।
গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা বলেন, দরিদ্রের ভূমি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা মানে শুধু জমি বণ্টন নয়; এটি একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ লক্ষ্যে আইনের কার্যকর প্রয়োগের পাশাপাশি কৃষক সংগঠন, নাগরিক সমাজ, আইনজীবী ও গবেষকদের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
এমআর/এএইচ