images

জাতীয়

ইউএস-বাংলার নামে কক্সবাজারে ভুয়া রিসোর্টের শেয়ার বিক্রির নামে প্রতারণা

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

২১ এপ্রিল ২০২৬, ১০:৫৪ এএম

দেশের স্বনামধন্য ইউএস-বাংলা গ্রুপের নাম ভাঙিয়ে রাজধানীর গুলশানে অফিস খুলে বসেছে একটি প্রতারক চক্র। সেখান থেকে ‘ইউএস-বাংলা হোটেলস অ্যান্ড রিসোর্ট’ নামে একটি হোটেলের মালিকানার শেয়ার বিক্রি করছে তারা। সাধারণ মানুষের বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের জন্য ‘ইউএস-বাংলা গ্রুপ’ এর সিস্টার কনসার্ন দাবি করছে ভুয়া প্রতিষ্ঠানটি। তবে ইউএস-বাংলা গ্রুপ নিশ্চিত করেছে তাদের কক্সবাজারের ইনানীতে এই নামে কোনো হোটেল বা রিসোর্টের প্রকল্প নেই।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স, ইউএস-বাংলা অ্যাসেটস লিমিটেড, ফুডিকে নিজেদের বলে তারা কক্সবাজারে কথিত হোটেল প্রকল্পে বিনিয়োগের প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।

প্রতারণার বিষয়টি নিশ্চিত হতে গ্রাহক সেজে বিষয়টি যাচাই করা হলে তারা প্রতিবারই নিজেদের ইউএস-বাংলা গ্রুপের একটি ‘সিস্টার কনসার্ন’ প্রতিষ্ঠান দাবি করে। যার রেকর্ড প্রতিবেদকের কাছে আছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই চক্রটির মূলহোতা নিজেকে মো. জাহাঙ্গীর নামে পরিচয় দিয়েছে। প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে জাহাঙ্গীর নিজেকে ইউএস-বাংলার হেড অব সেলস হিসেবে জানান। রাজধানীর গুলশানে-১ নম্বরের অবস্থিত এডব্লিউআর টাওয়ারের ষষ্ঠ তলায় দলবল নিয়ে অফিস খুলেছেন প্রতারক জাহাঙ্গীর। তিনি তার ক্রেতাদের কাছে ও বিনিয়োগে আগ্রহীদের কাছে বলছে এই অফিসটি ইউএস-বাংলা গ্রুপের। জাহাঙ্গীর এই অফিসে বসে কথিত ইউএস-বাংলা হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট নামে একটি ৪ তারকা হোটেলে বিনিয়োগ করার জন্য আগ্রহীদের প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করে আসছেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, শুধু অফিস খুলে নয়, অনলাইনেও সমানতালে প্রতারণার কাজ চালাচ্ছেন জাহাঙ্গীর। মানুষজনকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলতে ‘ইউএস-বাংলা হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট’ নামে একটি ওয়েবসাইট খুলেছে চক্রটি। প্রতারক চক্রটি তাদের কার্যক্রমকে বিশ্বাসযোগ্য করতে একটি সুসজ্জিত ও আকর্ষণীয় ওয়েবসাইট তৈরি করেছে। প্রথম দেখায় ওয়েবসাইটটি একটি প্রতিষ্ঠিত বিলাসবহুল হোটেল প্রকল্পের অফিসিয়াল প্ল্যাটফর্ম বলেই মনে হয়, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে সহজেই আস্থা তৈরি করতে সক্ষম।

ওয়েবসাইটের প্রধান পাতায় বড় আকারে ইউএস-বাংলার নাম ব্যবহার করে স্বাগত বার্তা দেওয়া হয়েছে। কক্সবাজারের ইনানী সৈকতে একটি নতুন বিলাসবহুল হোটেল যাত্রার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি বুকিং ও গ্যালারি দেখার জন্য আলাদা অপশন রাখা হয়েছে, যা দেখে মনে হয় হোটেলটি ইতোমধ্যেই চালু আছে বা খুব শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে।

পুরো ওয়েবসাইটজুড়ে আধুনিক ও দৃষ্টিনন্দন বহুতল ভবনের ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। এসব ছবি এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যাতে দর্শনার্থীরা সহজেই বিশ্বাস করেন, এটি একটি নির্মাণাধীন বা প্রায় সম্পন্ন ফোর-স্টার মানের হোটেল প্রকল্প। কিন্তু অনুসন্ধানে জানা যায়, বাস্তবে এই নামে কোনো হোটেল নির্মাণকাজ শুরুই হয়নি।

তবে ওয়েবসাইট বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, কোথাও প্রকল্পের অনুমোদন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ছাড়পত্র বা প্রকৃত ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের সুনির্দিষ্ট তথ্য উল্লেখ নেই। ইউএস-বাংলার নাম ব্যবহার করে ভুয়া এই প্রকল্পটির বাস্তব কোনো ভিত্তি না থাকলেও কৃত্রিমভাবে একটি বিশ্বাসযোগ্য পরিবেশ তৈরি করে সম্ভাব্য গ্রাহকদের বিনিয়োগে প্রলুব্ধ করার উদ্দেশ্যেই এই ওয়েবসাইটটি তৈরি করা হয়েছে।

চক্রটির তৈরি ভুয়া ওয়েবসাইটেও প্রতারণার স্পষ্ট চিহ্ন মিলেছে। সেখানে কথিত হোটেল ও রিসোর্টকে ‘অত্যাধুনিক’ ও ‘উন্নত মানের’ দাবি করে একাধিক কাস্টমার রিভিউ প্রকাশ করা হয়েছে।

তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, যে হোটেল প্রকল্পের কথা বলা হচ্ছে তার বাস্তবে কোনো অস্তিত্বই নেই। ফলে এসব কাস্টমার রিভিউ সম্পূর্ণ মনগড়া ও বিভ্রান্তিকর, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনের উদ্দেশ্যেই সাজানো হয়েছে।

যোগাযোগ অংশে গুলশান-১ এলাকার এডব্লিউআর টাওয়ারের ষষ্ঠ তলার ঠিকানা দেওয়া আছে। এছাড়া ওয়েবসাইটে যোগাযোগের জন্য দেওয়া আছে ‪+880 1994-444558 নম্বরটি। আর নম্বরটি ব্যবহার করেন এই চক্রের প্রধান জাহাঙ্গীর।

চক্রটির প্রতারণার ফাঁদ উন্মোচনের জন্য চক্রের মূলহোতা জাহাঙ্গীরের সঙ্গে বিনিয়োগকারী সেজে যোগাযোগ করা হলে জানানো হয়, তিনি ও তার বড় ভাই মিলে ১৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করতে আগ্রহী। এতেই জাহাঙ্গীর বেশ উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠেন এবং ইউ-এস বাংলার নাম ব্যবহার করে ধাপে ধাপে বিশ্বাস স্থাপনের চেষ্টা করেন। তিনি কথিত হোটেল প্রকল্পের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা, লাভের সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা বলে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন এবং এভাবেই সুপরিকল্পিতভাবে প্রতারণার জাল বিস্তার করতে থাকেন।

কথোপকথনের এক পর্যায়ে প্রতারক জাহাঙ্গীর নিজেকে ইউএস-বাংলা গ্রুপের হেড অব সেলস পরিচয় দিয়ে বলেন, ইউএস বাংলা হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টের নামে কথিত ৪ তারকা হোটেলটি কক্সবাজারে নির্মাণাধীন এবং সেখানে শেয়ার কিনে ভবিষ্যতে লাভবান হওয়া যাবে। প্রতি শেয়ারের মূল্য ৫ লাখ থেকে ৬ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে বৈশাখী অফারে বর্তমানে বুকিং দিলে ৫ লাখ টাকা প্রতি শেয়ারের দাম। প্রাথমিকভাবে ১ লাখ টাকা দিলেই বুকিং নিশ্চিত করা যাবে বলেও প্রচার করা হচ্ছে।

আলোচনার এক পর্যায়ে জাহাঙ্গীর ইতোমধ্যে অনেকের কাছ থেকেই টাকা নিয়েছেন বলে স্বীকার করেছেন। তবে সেই বিনিয়োগকারীরা প্রকৃতপক্ষে কী পেয়েছেন, প্রকল্পের অগ্রগতি কোথায় এসব বিষয়ে কোনো স্বচ্ছ তথ্য দেননি তিনি। এছাড়া কোনো বৈধ কাগজপত্র, সরকারি অনুমোদন বা নিবন্ধনের প্রমাণও দেখাতে পারেনি জাহাঙ্গীর।

কথোপকথনের এক পর্যায়ে জাহাঙ্গীর জানতে পারেন এই প্রতিবেদক সনাতন ধর্মাবলম্বী। তখন বিজয় কুমার নামে আরেক ব্যক্তিকে ডেকে আনেন জাহাঙ্গীর। তাকে একটি ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে জাহাঙ্গীর বলেন ‘তিনিও হিন্দু। অনেক হিন্দু ধর্মের মানুষ এই প্রকল্পে বিনিয়োগ করছে।’ এসময় ধর্ম পরিচয়কে সামনে এনে বিনিয়োগে উৎসাহিত করার জন্য নানা কৌশলে চেষ্টা শুরু করে জাহাঙ্গীর।

আলোচনার মধ্যে যুক্ত হয়ে বিজয় কুমার বলেন, আমি নিজে একটি শেয়ার কিনেছি। আমাদের ধর্মের অনেক লোক এখানে শেয়ার কিনছে। আর ইউএস-বাংলা গ্রুপ সম্পর্কে তো জানেন স্যার, নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ করার জন্য। আমার আপন মামা দুটি শেয়ার কিনেছে। এছাড়া আমার বন্ধু পুলিশের এসআই সেও শেয়ার কিনেছে। নির্দ্বিধায় চোখ বন্ধ করে শেয়ার কিনতে পারেন।

এরপর জাহাঙ্গীর বলেন, স্যার আপনি দেখলেন তো আপনার ধর্মের অনেক লোক এখানে বিনিয়োগ করছে। এছাড়া অনেক জজ সাহেব থেকে শুরু করে বড় বড় আমলারা ইউএস-বাংলার গ্রুপের নাম সুনামের কারণে এখানে বড় বড় অংকের বিনিয়োগ করছেন।

কাজ শেষে শেয়ার বুঝিয়ে দেওয়ার বিষয়ে প্রতারক জাহাঙ্গীর বলেন, ৫ বছরের মধ্যে প্রকল্প হস্তান্তর করা হবে। ২০৩১ সালে বিনিয়োগকারীদের প্রকল্প বুঝিয়ে দেওয়া হবে। আমরা সরকার থেকে লাইসেন্স প্রাপ্ত এবং ইউএস-বাংলা গ্রুপের সরাসরি সিস্টার কনসার্ন এটি। এছাড়া কিস্তিতেও বিনিয়োগ করা যাবে।

এ বিষয়ে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) মো. কামরুল ইসলাম বলেন, ইউএস-বাংলা গ্রুপের অধীনে বা সিস্টার কনসার্ন কিংবা অঙ্গ প্রতিষ্ঠান হিসেবে ‘ইউএস বাংলা হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট’ নামে কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব নেই। এ ধরনের কোনো প্রকল্প বা প্রতিষ্ঠান ইউএস-বাংলার সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়।

কামরুল ইসলাম আরও বলেন, আমরা স্পষ্টভাবে জানাতে চাই এই ধরনের বিভ্রান্তিকর ও ভুয়া প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কোনো ধরনের বিনিয়োগ, লেনদেন বা যোগাযোগ থেকে সবাইকে বিরত থাকার অনুরোধ করছি। এ বিষয়ে ইউএস-বাংলা গ্রুপ আইনগত ব্যবস্থা নেবে বলেও জানান তিনি।

এমআর