ঢাকা মেইল ডেস্ক
১৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:৩৮ পিএম
‘আমাদের নিয়ে ৪ এপ্রিল টেকনাফ থেকে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে বোটটা (নৌকা) রওনা দিছে। ৮ এপ্রিল সকালে আন্দামান সাগরে ডুবে যায়। উদ্ধার হওয়ার আগে দুই দিন পানিতে ভাসছি।’ —এভাবেই নিজের অভিজ্ঞতা বলছিলেন আন্দামান সাগরে ডুবে যাওয়া ট্রলার থেকে বেঁচে ফেরা কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা রফিক।
ডুবে যাওয়ার আগেই ট্রলারটিতে থাকা অন্তত ৩০ জনের মৃত্যু হয় বলেও জানান রফিক। আরোহীদের মারধর করা হতো এবং মাছ রাখার কোল্ড স্টোরেজে পালাক্রমে লুকিয়ে রাখা হতো বলেও জানান তিনি।
‘বোটের মাঝি বলেছিল যারা মারা গেছে তাদের লাশ পানিতে ফেলে দিতে। আর যারা জীবিত আছে তাদের রেখে দিতে। কিছুক্ষণের মধ্যে আমাদের বোটই ডুবে যায়’, বলেন রফিক।
ট্রলারে কতজন ছিলেন জানতে চাইলে রফিক বলেন, ‘আমরা পুরুষ ছিলাম ২৪০ জন, মহিলা ছিল ২০ জন। বাচ্চা ছিল চারজন। আর বোটের স্টাফ ছিল ১৩ জন।’
অবৈধভাবে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে আন্দামান সাগরে ডুবে যাওয়া ওই ট্রলারে নিজের ছোট ভাই ছিল বলে নিশ্চিত হয়েছেন টেকনাফের বাসিন্দা নেজাম উদ্দিন, যদিও তাকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। বেঁচে ফেরা ব্যক্তিদের ছোট ভাই তারেকের ছবি দেখিয়ে ডুবে যাওয়া ট্রলারে তার থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছেন বলে তিনি জানান।
নেজাম জানান, গত ৪ এপ্রিল থেকেই তারেকের সঙ্গে যোগাযোগ নেই পরিবারের। নিখোঁজ হওয়ার আগে দালালের মাধ্যমে মালয়েশিয়া যাওয়ার চেষ্টা করছিল সে।
‘আমার ভাইকে পর্যটন ভিসায় মালয়েশিয়া পাঠানোর জন্য দেড় লাখ টাকা আর তার পাসপোর্ট দালালের কাছে দিছিলাম,’ বলেন নেজাম।
মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে ডুবে যাওয়া ট্রলার থেকে উদ্ধার হওয়া কয়েকজনকে কোস্টগার্ড দেশে ফিরিয়ে এনেছে— এমন খবর পেয়ে ছোট ভাইকে খুঁজতে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেন নেজাম। তিনি বলেন, ‘উদ্ধার হওয়া কয়েকজন ছবি দেখে বলছে যে আমার ভাই ওই বোটে ছিল, ডুবে যাওয়ার আগেও সে জীবিত ছিল।’
জীবিতরা উদ্ধার হলেন যেভাবে
গত ৯ এপ্রিল আন্দামান সাগর থেকে উদ্ধার হওয়া নয়জনকে গভীর সমুদ্রে টহলরত কোস্ট গার্ডের জাহাজ ‘মনসুর আলী’র কাছে হস্তান্তর করে বাংলাদেশের পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজ ‘মোটর ট্যাংকার মেঘনা প্রাইড’।
উদ্ধারকারীদের বরাত দিয়ে কোস্টগার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন জানান, ৯ এপ্রিল দুপুরে আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের কাছাকাছি এলাকা থেকে ভাসমান অবস্থায় আটজন পুরুষ ও একজন নারীকে উদ্ধার করে বাংলাদেশি জাহাজটি।
কোস্টগার্ড বলছে, গভীর সমুদ্রে বেশ কিছু মানুষকে পানির ড্রাম ও কাঠের টুকরো নিয়ে ভাসমান অবস্থায় দেখতে পায় তারা। পরে মধ্যরাতে কোস্ট গার্ডের কাছে তাদের হস্তান্তর করা হয়।
সুজন বলেন, ‘ট্রলারডুবির ঘটনা যেখানে ঘটেছে সেখানে আসলে কী হয়েছে বা কতজন ট্রলারে ছিল সে বিষয়ে আমাদের জানার সুযোগ ছিল না। আমাদের কাছে নয়জনকে হস্তান্তর করার পর আমরা তাদেরকে দেশের নিয়ে আসি।’
উদ্ধারকৃতদের বরাত দিয়ে কোস্টগার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা বলেন, ‘তারা প্রায় দুই দিন সমুদ্রে ড্রাম এবং কাঠের টুকরো আঁকড়ে ধরে ভেসেছিলেন।’
কোস্ট গার্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নিখোঁজদের কোনো হদিস এখন পর্যন্ত মেলেনি এবং ডুবে যাওয়া ট্রলারটিরও কোনো ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায়নি।
এদিকে গভীর সমুদ্রে বিপুল সংখ্যক যাত্রী নিয়ে ট্রলার ডুবির এই ঘটনায় যৌথ বিবৃতি দিয়েছে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা। সংস্থা দুটির মতে, অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই, তীব্র বাতাস এবং বৈরী আবহাওয়ার কারণে ট্রলারটি গভীর সমুদ্রে ডুবে যায়।
জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর সংগৃহীত তথ্য বলছে, ডুবে যাওয়া ট্রলারটিতে যাত্রী সংখ্যা ২৫০ বা তারও বেশি হতে পারে।
উদ্ধার ব্যক্তিদের এখন কী হবে?
গভীর সমুদ্রে ট্রলার ডুবির ঘটনায় বেঁচে ফেরা নয়জনের মধ্যে আট জন পুরুষ এবং একজন নারী। তাদের মধ্যে ছয়জন বাংলাদেশি এবং তিনজন রোহিঙ্গা। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের টেকনাফ থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে জানিয়েছে কোস্টগার্ড।
এই ঘটনায় কোস্ট গার্ড কর্মকর্তা এম শামসুল আলম মিয়া বাদী হয়ে একটি মানবপাচার মামলা করেছেন বলেও জানিয়েছে পুলিশ। মামলায় ১০ থেকে ১৫ জন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
টেকনাফ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম জানান, উদ্ধার হওয়া তিন রোহিঙ্গা নাগরিককে তাদের ক্যাম্পে পাঠানো হয়েছে। আর বাঙালি ছয়জনকে থানা হেফাজতে রেখে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
পুলিশ বলছে, উদ্ধার হওয়া ছয়জনের মধ্যে চারজনই ডুবে যাওয়া ট্রলারটির সদস্য বলে জানতে পেরেছেন তারা। মানবপাচার মামলায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে নিশ্চিত করেছেন ওসি। এছাড়া স্থানীয় পর্যায়ে মানবপাচারের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পুলিশ অভিযান শুরু করেছে বলেও জানান তিনি।
ওসি সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘গভীর সমুদ্রে মানবপাচারকারীদের বড় বোট থাকে। বিভিন্ন জায়গা থেকে ছোট ছোট বোটে করে গভীর সমুদ্রে থাকা বড় বোটে করে তারা রওনা দেয়। এক্ষেত্রে জেলে পরিচয়ও ব্যবহার করে তারা।’
পাচারকারীরা মূলত ভুক্তভোগীদের দারিদ্র্য এবং সামাজিক অসহায়ত্বকে পুঁজি করে। মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, পাচারকারীরা ভালো চাকরি, মোটা অংকের বেতন এবং সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখিয়েছিল। এমনকি অবিবাহিত নারীদের ক্ষেত্রে মালয়েশিয়ায় নিয়ে গিয়ে বিয়ের মিথ্যা প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছিল বলেও উল্লেখ রয়েছে।
থামছে না সমুদ্রপথে মানবপাচার
উন্নত জীবনের আশায় অভিবাসন প্রত্যাশীদের সমুদ্রপথে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা কোনোভাবেই থামছে না। এর ফলে একদিকে যেমন প্রতারণার শিকার হচ্ছেন লাখো মানুষ, অন্যদিকে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে সাগরের বুকে সলিল সমাধি হচ্ছে অনেকের।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ থেকে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে মানবপাচারের ঘটনা নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরেই এই রুটটি ব্যবহার করে আসছে মানবপাচারকারীরা।
২০১১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত মানবপাচারের প্রবণতা ভয়াবহ আকার ধারণ করে। ২০১৫ সালে মালয়েশিয়া এবং থাইল্যান্ডের সীমান্ত এলাকায় মানব পাচারের শিকার অভিবাসন প্রত্যাশীদের গণকবর পাওয়ার বিষয়টি নানা আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।
ব্র্যাক মাইগ্রেশন অ্যান্ড ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বলছেন, এই অঞ্চলে মানবপাচার নিয়ে অনেক বেশি আলোচনা শুরুর পর থেকে রোহিঙ্গা নারী ও কিশোরদেরকেই টার্গেট করেছিল পাচারকারীরা। কিন্তু গত দুই বছর ধরে আবারো বাংলাদেশি নাগরিকদেরও নানা প্রলোভন দেখিয়ে সমুদ্রপথে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
শরিফুল হাসান বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা বিজিবি গত এক দুই বছরে এরকম অসংখ্য বোট আটক করেছে। আবারো যে মানবপাচারকারীদের তৎপরতা বেড়েছে, টেকনাফ এবং মিয়ানমার সীমান্তবর্তী যেসব এলাকা থেকে বোট নেওয়া হয়, এগুলো যে রাতের আধারে ঘটে বিষয়টা তা নয়, এটি ওই এলাকার সাধারণ মানুষ, বিভিন্ন বাহিনীও অবগত।‘
শরিফুল হাসানের মতে, এগুলো কেবল মানবপাচার নয়, এর সঙ্গে অর্থ পাচার, মাদক চোরাচালান, জিম্মি- এমন নানা অপরাধ জড়িত। কিন্তু তারপরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না।
রোহিঙ্গা শরণার্থীদের কথা উল্লেখ করে শরিফ বলেন, মূলত অন্য দেশে যাওয়ার ট্রানজিট হিসেবেই বাংলাদেশকে ব্যবহার করছে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা। এই সংকটের কারণে বাংলাদেশিদের জন্য বিশ্বব্যাপী নিরাপদ অভিবাসনের যে সুযোগ সেখানেও প্রভাব পড়ছে বলে তিনি মনে করেন।
শরিফ বলেন, ‘আন্দামান সি ক্রাইসিস কিংবা ভূমধ্যসাগর ব্যবহার করে যে মানবপাচার চলছে সেটি ঠেকাতে রাষ্ট্রের গুরুত্ব দেওয়া দরকার। সংকটটি খুবই গুরুতর এবং কথা না বলে পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।’
এদিকে মানবপাচার রোধে অভিযান ও কার্যক্রম অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড। তারা বলছে, গত এক বছরে ১৫১ জন বাঙালি এবং ৪১৯ জন রোহিঙ্গাসহ মোট ৫৭০ জন মানবপাচারের শিকার ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করেছে তারা। এছাড়া মানবপাচার চক্রের সঙ্গে জড়িত ৪৮ জন পাচারকারীকে আটক করা হয়েছে বলেও দাবি বাহিনীটির। -বিবিসি বাংলা
ক.ম/