images

জাতীয়

পুরান ঢাকার বাংলা কাওয়ালি: ‘উঠোনভরা সুরের দিন’ এখন অতীত

মাহফুজুর রহমান

১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১০:২৬ এএম

পুরান ঢাকার সরু গলি, পুরনো দালান, ছাদের আড্ডা আর উঠোনভরা মানুষের ভিড়—এই শহরের নিজস্ব এক সুর ছিল, এক আবহ ছিল। সেই আবহেরই গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল বাংলা কাওয়ালি। একসময় পয়লা বৈশাখ, ঈদ, মিলাদ বা বিশেষ সামাজিক আয়োজনে পুরান ঢাকার নানা মহল্লায় রাতভর জমে উঠত কাওয়ালির আসর। হারমোনিয়াম, তবলা, ঢোলকের তালে তালে গাওয়া হতো বাংলা-উর্দু মিশ্রিত আধ্যাত্মিক ও প্রেমভিত্তিক গান, যা শুধু বিনোদনই নয়, ছিল সামাজিক মিলনমেলারও একটি রূপ।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই কাওয়ালীর আসর এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। একসময় যে আয়োজন ছিল উৎসবের অপরিহার্য অংশ, তা এখন অনেকটাই স্মৃতির ভাঁজে বন্দি।

পুরান ঢাকার প্রবীণদের সঙ্গে কথা বললে উঠে আসে এক ভিন্ন সময়ের গল্প। নববর্ষ এলেই মহল্লায় মহল্লায় কাওয়ালির প্রস্তুতি শুরু হতো। উঠোন বা খোলা জায়গায় অস্থায়ী মঞ্চ তৈরি করা হতো। স্থানীয় শিল্পীদের পাশাপাশি বাইরের কাওয়াল দলও আমন্ত্রণ পেত। রাতভর চলত গান, আর তার ফাঁকে ফাঁকে চলত গল্প, হাসি, চা-নাশতা। এটি শুধু সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছিল না, বরং সামাজিক বন্ধনকে দৃঢ় করার এক অনন্য উপলক্ষ।

বাংলা কাওয়ালীর নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ছিল সুফি ধারার প্রভাব, পাশাপাশি স্থানীয় ভাষা ও সংস্কৃতির মিশেল। ফলে এটি সহজেই মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিল। ধর্মীয় আবহ থাকলেও এর গ্রহণযোগ্যতা ছিল সর্বজনীন।

তবে এই ঐতিহ্য কেন হারিয়ে যাচ্ছে—এ প্রশ্নের উত্তরে উঠে আসে একাধিক কারণ। নগরজীবনের পরিবর্তন একটি বড় কারণ। পুরান ঢাকার সেই খোলা উঠোন বা আড্ডার জায়গাগুলো এখন অনেকটাই হারিয়ে গেছে। পুরনো বাড়ি ভেঙে বহুতল ভবন হয়েছে, জায়গা কমেছে, মানুষের বসবাসের ধরন বদলেছে। ফলে এমন আয়োজনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ আর আগের মতো নেই।

এ ছাড়া প্রজন্মগত পরিবর্তনও বড় প্রভাব ফেলছে। নতুন প্রজন্মের আগ্রহ এখন ভিন্ন দিকে। তারা আধুনিক গান, ব্যান্ড মিউজিক বা ডিজিটাল কনটেন্টের দিকে বেশি ঝুঁকছে। কাওয়ালীর মতো ঐতিহ্যবাহী সংগীত অনেকের কাছেই এখন ‘পুরনো’ বা ‘স্লো’ বলে মনে হয়। ফলে এই ধারার প্রতি আগ্রহ কমে যাচ্ছে।

Dhaka-1ভার্চুয়াল বিনোদনের দাপটেও হারিয়ে যাচ্ছে এটি। আগে যেখানে মানুষ সরাসরি অংশ নিয়ে গান শুনত, এখন মোবাইল ফোনেই সব ধরনের বিনোদন পাওয়া যাচ্ছে। ইউটিউব, ফেসবুক বা অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে কনটেন্ট সহজলভ্য হওয়ায় সরাসরি অনুষ্ঠানের প্রতি আগ্রহ কমেছে।

অর্থনৈতিক বাস্তবতাও আরেকটি বড় কারণ। একটি কাওয়ালির আসর আয়োজন করতে খরচ হয়। শিল্পী আনা, সাউন্ড সিস্টেম, আয়োজন—সব মিলিয়ে ব্যয় বাড়ছে। আগের মতো পাড়াভিত্তিক উদ্যোগ এখন আর তেমন দেখা যায় না। ফলে এমন সমষ্টিগত আয়োজন কমে গেছে।

তবে পুরোপুরি যে এটি বিলুপ্ত হয়ে গেছে, তা নয়। এখনও পুরান ঢাকার কিছু এলাকায় সীমিত পরিসরে কাওয়ালীর আয়োজন হয়। কিছু সাংস্কৃতিক সংগঠন এই ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা করছে, তবে তা আগের মতো বিস্তৃত বা প্রাণবন্ত নয়।

সংস্কৃতি বিশ্লেষকদের মতে, বাংলা কাওয়ালি কেবল একটি সংগীতধারা নয়, এটি একটি সামাজিক ঐতিহ্য। এটি হারিয়ে যাওয়া মানে শুধু একটি গান হারানো নয়, বরং একটি সময়, একটি আবহ ও সামাজিক বন্ধনের ক্ষয়।

পয়লা বৈশাখের মতো উৎসবগুলো একসময় এই ধরনের আয়োজনকে কেন্দ্র করে প্রাণবন্ত হয়ে উঠত। এখন সেখানে এসেছে ডিজে মিউজিক, কনসার্ট বা ডিজিটাল বিনোদন। পরিবর্তন স্বাভাবিক, কিন্তু সেই পরিবর্তনের ভেতরেও ঐতিহ্যের কিছু অংশ ধরে রাখা গেলে সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা বজায় থাকে।

পুরান ঢাকার বাংলা কাওয়ালী হয়তো আগের মতো আর ফিরে আসবে না, কিন্তু সচেতন উদ্যোগ থাকলে এটি পুরোপুরি হারিয়ে যাবে না। নতুন প্রজন্মকে এই ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচয় করানো এবং ছোট পরিসরে হলেও আয়োজন চালু রাখা গেলে এই হারিয়ে যাওয়া সুরকে কিছুটা হলেও ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

পুরান ঢাকার ৭০ বছর বয়সী বাসিন্দা হাজী আবদুল মালেক বলেন, আমাদের তরুণ বয়সে কাওয়ালি মানেই ছিল উৎসবের প্রাণ। মহল্লার সবাই একসঙ্গে বসে রাতভর গান শুনতাম, গল্প করত, খাওয়া-দাওয়া চলত। এখন সেই পরিবেশ আর নেই। বাংলা কাওয়ালী একটি স্বতন্ত্র ধারার সংগীত, যা যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে। সরকার ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলো উদ্যোগ নিলে এই ধারাকে নতুনভাবে উপস্থাপন করে তরুণদের কাছে জনপ্রিয় করা সম্ভব।

পুরান ঢাকার তরুণ বাসিন্দা নাফিস ইসলাম বলেন, আমরা কাওয়ালির কথা শুনেছি, কিন্তু সরাসরি দেখার সুযোগ খুব কম পেয়েছি। যদি এটি আধুনিক উপস্থাপনায় আয়োজন করা হয়, তাহলে আমাদের মতো তরুণদের আগ্রহ বাড়তে পারে।

সবশেষে বলা যায়, বাংলা কাওয়ালি শুধু একটি সংগীত নয়, এটি পুরান ঢাকার আত্মার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। সেই আত্মা যেন পুরোপুরি হারিয়ে না যায়, সেটিই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

এম/এআর