images

জাতীয়

যেভাবে এলো বৈশাখী শোভাযাত্রা

মুহা. তারিক আবেদীন ইমন

১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১০:১৬ এএম

# ১৯৮৯ সালে ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ হিসেবে যাত্রা শুরু

# পরে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামে প্রতিষ্ঠা পায়

# ২০২৫ সালে হয় ‘বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা’

# এবার পালিত হচ্ছে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ নামে

# সময়ের সঙ্গে বদলেছে নাম, মূল চেতনা অপরিবর্তিত

# উৎসবের পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে ‘ইভেন্ট’ ভাবনাও

বাংলা নববর্ষ এখন শুধু একটি দিন নয়, বরং একটি দৃশ্যমান উৎসব। দল মত নির্বিশেষ সব মানুষের অংশগ্রহণ। এই দিনের মূল আকর্ষণ সর্বজনীন সমাজের অংশগ্রহণে একটি শোভাযাত্রা। রাজধানীর রাজপথ থেকে শুরু করে দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়া এই শোভাযাত্রা আজ বৈশাখ উদযাপনের অন্যতম কেন্দ্রীয় উপাদান। তবে এই শোভাযাত্রার যাত্রাপথ ছিল দীর্ঘ, পরিবর্তনশীল এবং সময়ের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

শুরুটা ছিল ভিন্ন নামে, ভিন্ন আঙ্গিকে। আশির দশকের শেষ দিকে, বিশেষ করে ১৯৮৯ সালে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থীরা বৈশাখ উপলক্ষে প্রথম যে শোভাযাত্রার আয়োজন করেন, সেটি ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ হিসেবেই পরিচিত ছিল। তখনকার প্রেক্ষাপটে এটি ছিল নিছক উৎসব নয়—বরং একটি সাংস্কৃতিক অবস্থান, এক ধরনের প্রতিরোধের ভাষা। সামরিক শাসনের সময়কার দমবন্ধ পরিবেশে বাঙালির নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয়কে প্রকাশ্যে তুলে ধরার একটি সাহসী প্রয়াস ছিল এই আয়োজন।

প্রথম দিককার সেই আনন্দ শোভাযাত্রায় দেখা যেত গ্রামীণ জীবন, লোকজ সংস্কৃতি, প্রকৃতি এবং প্রাণিজগতের নানা প্রতীক। বাঘ, পাখি, সূর্য, ঘোড়া, পেঁচা—এইসব প্রতীকী অবয়ব শুধু নান্দনিকতার জন্য নয়, বরং শক্তি, জাগরণ, অশুভের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং শুভশক্তির আহ্বানের বার্তা বহন করত। অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের তৈরি মুখোশ, রঙিন ব্যানার এবং কারুকার্য নিয়ে শোভাযাত্রায় যুক্ত হতেন। এতে ছিল স্বতঃস্ফূর্ততা, সৃজনশীলতা এবং এক ধরনের সম্মিলিত সাংস্কৃতিক উচ্ছ্বাস।

ধীরে ধীরে এই শোভাযাত্রা জনপ্রিয়তা পেতে থাকে। আশির দশকের শেষ থেকে নব্বইয়ের দশক—এই সময়টাতে এটি শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং শহরের অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোও এ ধরনের আয়োজন শুরু করে। শোভাযাত্রা হয়ে ওঠে নববর্ষ উদযাপনের একটি দৃশ্যমান প্রতীক।

পরবর্তী সময়ে এই আনন্দ শোভাযাত্রা নতুন একটি নাম পায়—‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’। নামের এই পরিবর্তনের মধ্যেও একটি দর্শন কাজ করেছিল। নতুন বছরের শুরুতে অশুভ শক্তিকে দূরে সরিয়ে শুভ, কল্যাণকর শক্তিকে আহ্বান করার প্রতীক হিসেবেই ‘মঙ্গল’ শব্দটি যুক্ত হয়। ফলে এটি শুধু আনন্দের প্রকাশ নয়, বরং একটি সামষ্টিক প্রার্থনা, একটি সাংস্কৃতিক ঘোষণা হয়ে ওঠে।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। প্রতি বছর নির্দিষ্ট থিম নিয়ে শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়, তৈরি হয় বিশালাকৃতির শিল্পকর্ম, যা দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করে। এটি কেবল একটি শোভাযাত্রা নয়, বরং একটি চলমান শিল্প প্রদর্শনীতে পরিণত হয়। ২০১৬ সালে ইউনেস্কো এই আয়োজনকে মানবতার অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, যা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এর গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে তোলে।

তবে এই শোভাযাত্রার নাম ও চরিত্র সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আবারও পরিবর্তনের মুখে পড়ে। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রেক্ষাপটের পরিবর্তনের সঙ্গে এর নামকরণেও ভিন্নতা দেখা যায়। ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ‘বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা’ নামে এটি পালিত হয়। সেই সময় নাম পরিবর্তনের পেছনে যুক্তি ছিল—শোভাযাত্রাটিকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং সার্বজনীন রূপ দেওয়া।

এর ধারাবাহিকতায় চলতি বছর বিএনপি সরকারের আমলে এই শোভাযাত্রার নাম দেওয়া হয়েছে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’। নামের এই পরিবর্তন নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা-সমালোচনা থাকলেও, বাস্তবতা হলো—শোভাযাত্রাটি এখনো তার মূল বৈশিষ্ট্য বহন করে চলছে। নাম বদলেছে, কিন্তু রঙ, প্রতীক, মানুষের অংশগ্রহণ—এসবের ধারাবাহিকতা এখনো বজায় রয়েছে।

তবে সময়ের সঙ্গে এই শোভাযাত্রার চরিত্রেও কিছু পরিবর্তন এসেছে। শুরুর দিকে যেখানে এটি ছিল মূলত সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের ভাষা, এখন সেখানে উৎসবের আমেজই বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। অনেকের কাছে এটি এখন একটি ‘ইভেন্ট’, যেখানে ছবি তোলা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা—এসবই বড় হয়ে উঠছে। তবু এর ভেতরে এখনো রয়েছে সেই পুরোনো চেতনার ছাপ।

এছাড়া বাণিজ্যিকীকরণ, নিরাপত্তাব্যবস্থা, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ—এসব বিষয়ও এখন এই আয়োজনের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। ফলে আগের সেই স্বতঃস্ফূর্ততা কিছুটা কমেছে বলে মনে করেন অনেকে। তবু প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ এই শোভাযাত্রায় অংশ নেয়, যা প্রমাণ করে—এটি এখনো মানুষের হৃদয়ের সঙ্গে যুক্ত।

শোভাযাত্রার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর অসাম্প্রদায়িক চরিত্র। এখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষ একসঙ্গে অংশ নেয়। এটি বাঙালির একটি যৌথ পরিচয়কে সামনে নিয়ে আসে, যা বিভাজনের বিপরীতে ঐক্যের বার্তা দেয়।

এই বৈশাখী শোভাযাত্রা একটি চলমান ইতিহাস। এটি শুরু হয়েছিল ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ হিসেবে, পরে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ হয়ে একটি সাংস্কৃতিক প্রতীক হয়ে ওঠে, আবার সময়ের প্রেক্ষাপটে ‘বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা’ বা ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। নাম বদলালেও এর মূল সুর একই—নতুন বছরকে বরণ করা, অশুভকে বিদায় জানানো এবং সম্মিলিতভাবে আনন্দ ভাগ করে নেওয়া। এই শোভাযাত্রা তাই শুধু একটি আয়োজন নয়; এটি সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হলেও বাঙালির সাংস্কৃতিক চেতনার এক জীবন্ত বহিঃপ্রকাশ।

টিএই/জেবি