মুহা. তারিক আবেদীন ইমন
১৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:১৯ এএম
# মূল্যস্ফীতির চাপে ইলিশ এখন অনেকের নাগালের বাইরে
# সামাজিক বন্ধন দুর্বল হওয়ায় মিলনমেলার আমেজে ভাটা
# নতুন প্রজন্মের কাছে গুরুত্ব পাচ্ছে না পান্তা ইলিশ
# ভার্চুয়াল দুনিয়ার দাপটে কমছে সরাসরি অংশগ্রহণ
# বদলে যাওয়া বাস্তবতায় নতুন রূপ নিচ্ছে বৈশাখ উদযাপন
বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন একটা সময় অন্যরকম এক উচ্ছ্বাসের নাম ছিল। ভোরের সূর্য ওঠার আগেই নগরীর পার্ক, সাংস্কৃতিক প্রাঙ্গণ, বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা কিংবা মেলার মাঠগুলোতে ভিড় জমাত নানা বয়সী মানুষ। লাল-সাদা পোশাকে সজ্জিত নারী-পুরুষ, শিশুদের হাসি, বন্ধুদের আড্ডা—সব মিলিয়ে এক প্রাণবন্ত পরিবেশ। আর এই আয়োজনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল পান্তা-ইলিশ, যা ধীরে ধীরে বৈশাখ উদযাপনের এক প্রতীক হয়ে উঠেছিল। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এই দৃশ্যপট বদলাতে শুরু করেছে। এখনো বৈশাখ আসে, মানুষ উদযাপন করে, কিন্তু সেই আগের মতো পান্তা-ইলিশকে ঘিরে উন্মাদনা আর দেখা যায় না। অনেক ক্ষেত্রেই এটি এখন সীমিত পরিসরে, প্রতীকীভাবে বা বিশেষ শ্রেণির মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।
পান্তা-ইলিশের ঐতিহ্যটি আসলে খুব প্রাচীন নয়। গ্রামীণ বাংলায় পান্তা ভাত ছিল সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন খাবার, বিশেষ করে কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের। অন্যদিকে ইলিশ ছিল উৎসব বা বিশেষ উপলক্ষের মাছ। শহুরে সংস্কৃতির বিকাশ, রেস্তোরাঁ সংস্কৃতি এবং মিডিয়ার প্রচারণার মাধ্যমে এই দুইয়ের সংমিশ্রণ নব্বইয়ের দশকের পর থেকে বৈশাখের একটি জনপ্রিয় অংশ হয়ে ওঠে। ধীরে ধীরে এটি এমন একটি সামাজিক রীতিতে পরিণত হয়, যেখানে পরিবার-পরিজন বা বন্ধুদের সঙ্গে বসে পান্তা-ইলিশ খাওয়া মানেই ছিল এক ধরনের উৎসবমুখর মিলন।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অর্থনৈতিক বাস্তবতা এই চিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। মূল্যস্ফীতির কারণে ইলিশ মাছের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। একটি মাঝারি আকারের ইলিশ কিনতে যে পরিমাণ অর্থ প্রয়োজন, তা অনেক পরিবারের জন্য অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। শুধু ইলিশ নয়, চাল, ডাল, পেঁয়াজ, মরিচসহ অন্যান্য উপকরণের দামও বেড়েছে। ফলে একটি পান্তা-ইলিশের আয়োজন এখন অনেকের জন্য বিলাসিতার পর্যায়ে চলে গেছে। আগে যেখানে বৈশাখ মানেই বাড়তি খরচের প্রস্তুতি ছিল, এখন সেখানে অনেকেই হিসাব করে খরচ করছেন এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে দিচ্ছেন।
অন্যদিকে, প্রজন্মগত পরিবর্তনও এই রূপান্তরের একটি বড় কারণ। নতুন প্রজন্মের কাছে বৈশাখের অর্থ অনেকটাই বদলে গেছে। তারা ঐতিহ্যগত খাবারের চেয়ে অভিজ্ঞতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। বৈশাখ এখন তাদের কাছে একটি ‘ইভেন্ট’—যেখানে বন্ধুদের সঙ্গে ঘোরাঘুরি, ছবি তোলা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা—এসবই প্রধান হয়ে উঠেছে। পান্তা-ইলিশ খাওয়া তাদের কাছে আর বাধ্যতামূলক কোনো বিষয় নয়, বরং এটি ঐচ্ছিক।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব এই পরিবর্তনকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। আগে মানুষ সরাসরি অংশগ্রহণের মাধ্যমে উৎসব উপভোগ করত, এখন অনেকেই ভার্চুয়ালি অংশ নেয়। লাইভ ভিডিও দেখা, ছবি শেয়ার করা বা অনলাইনে শুভেচ্ছা বিনিময়ের মাধ্যমে উৎসবের একটি বড় অংশ এখন ডিজিটাল হয়ে গেছে। ফলে বাস্তবিক মিলনমেলার পরিসর কিছুটা সংকুচিত হয়েছে, যা পান্তা-ইলিশের মতো সমবেতভাবে উপভোগ করার ঐতিহ্যকে প্রভাবিত করছে।
এছাড়া সামাজিক বন্ধনেও পরিবর্তন এসেছে। একসময় বৈশাখ ছিল সব শ্রেণি-পেশার মানুষের একসঙ্গে মিলিত হওয়ার একটি উপলক্ষ। কিন্তু নগরজীবনের ব্যস্ততা, ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা এবং বিভিন্ন বাস্তব কারণে এখন মানুষ আগের মতো করে একত্রিত হতে পারছে না। পরিবারভিত্তিক বা ছোট পরিসরে উদযাপন বাড়ছে, বড় আয়োজনের প্রতি আগ্রহ কিছুটা কমেছে।
পান্তা-ইলিশের বাণিজ্যিকীকরণও এর জৌলুস কমে যাওয়ার একটি কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় বৈশাখ উপলক্ষে উচ্চমূল্যের প্যাকেজ চালু করা হয়, যা অনেকের নাগালের বাইরে। ফলে এটি একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে এবং উৎসবের সার্বজনীনতা কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এদিকে পরিবেশগত কারণেও ইলিশের প্রাপ্যতা ও দাম প্রভাবিত হচ্ছে। নদ-নদীর দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং অতিরিক্ত আহরণের কারণে ইলিশের সরবরাহে চাপ তৈরি হচ্ছে। ফলে বাজারে দাম বাড়ছে, যা সরাসরি পান্তা-ইলিশের জনপ্রিয়তায় প্রভাব ফেলছে। এই পরিবর্তনের মধ্যে অনেকেই বিকল্পের দিকে ঝুঁকছেন। পান্তার সঙ্গে স্বল্প মূল্যের মাছ, ভর্তা, শুটকি বা দেশি ছোট মাছ দিয়ে বৈশাখ উদযাপন করা হচ্ছে। গ্রামাঞ্চলে স্থানীয় খাবারের প্রচলন এখনো বেশ শক্তিশালী। এতে খরচ কম হচ্ছে, আবার স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গেও সংযোগ বজায় থাকছে।
সবকিছু মিলিয়ে বলা যায়, পান্তা-ইলিশের জৌলুস কমে গেলেও বৈশাখের চেতনা পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। বরং এটি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন রূপ নিচ্ছে। মানুষের জীবনযাত্রা, রুচি ও সামর্থ্যের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে উৎসবও পরিবর্তিত হচ্ছে। কেউ হয়তো আর পান্তা-ইলিশ খাচ্ছেন না, কিন্তু নতুন পোশাক পরছেন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন—এসবই বৈশাখ উদযাপনের অংশ হয়ে থাকছে।
টিএই/জেবি