মোস্তফা ইমরুল কায়েস
১৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:১২ এএম
বৈশাখের প্রথম দিন থেকে শুরু হতো মেলা। চলতো পুরো বৈশাখ জুড়ে। মেলায় মিলতো বাতাসাসহ নানা মিষ্টান্ন। বসতো নাগরদোলা, যাত্রাপালা, যাত্রাপার্টি, সার্কাস, বানরের নাচ, বায়োস্কপের দোকান। সকাল থেকে ভিড় জমতো। রাত অবধি মেলা চলতো। মেলার আমেজ উপভোগ করতে দূর-দূরান্ত থেকে আসতো লোকজন। তাদের সঙ্গে আসতো ছোট শিশুরাও।
সাধারণ বৈশাখের মেলাগুলো বসতো নদীর ঘাট, হাট-বাজার, মন্দির প্রাঙ্গণ কিংবা খোলা মাঠ ছিল মেলার প্রধান কেন্দ্র। বর্তমানে সেই ঐতিহ্য ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে বৈশাখের মেলা। কিন্তু কেন? বৈশাখকে এখন নানা রঙঢঙে পালন করা হলেও কেন সেই মেলা হারিয়ে যাচ্ছে। নেপথ্যের কারণ ও বাস্তবতা কি বলছে?
ঢাকা মেইলের পক্ষ থেকে দেশের নানা প্রান্তের লোকজনের সঙ্গে কথা এসব কারণ ও বাস্তবতা তুলে আনার চেষ্টা করা হয়েছে।
বৈশাখী মেলা একসময় ছিল বাঙালির জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশের সব জেলাতেই কমবেশি বৈশাখের মেলা বসতো। এসব মেলা স্থায়ী হতো এক থেকে ১৫ দিন পর্যন্ত।
মেলায় মাটির জিনিস, পুতুল বাঁশ-বেতের সামগ্রী, নকশিকাঁথা, হাতের কাজ, দেশীয় খাবার (মুড়কি, বাতাসা, জিলাপি) মিলতো। আর বিনোদন হিসেবে থাকতো নাগরদোলা, যাত্রাপালা, বায়োস্কোপ ও লাঠিখেলা। সব বয়সী মানুষই ছিল এসব মেলার দর্শনার্থী। কৃষক, জেলে, কামার, কুমার, তাঁতী-গ্রামীণ পেশাজীবীরা যেমন বিক্রেতা ছিলেন, তেমনি শহর থেকেও অনেক মানুষ মেলায় ঘুরতে আসতেন। মেলা ছিল এক অর্থে গ্রামীণ অর্থনীতির বড় কেন্দ্র।
ঢাকা ও আশপাশ বসতো এখনো বসে রমনা বৈশাখী মেলা (রমনা বটমূল এলাকা), বাংলা একাডেমি বৈশাখী মেলা, সাভার বৈশাখী মেলা ও নবাবগঞ্জ মেলা। এছাড়াও পুঠিয়া মন্দির বৈশাখী মেলা (রাজশাহী), বাঘা মেলা (রাজশাহী).দীঘাপতিয়া রাজবাড়ি মেলা (নাটোর), মহাস্থানগড় মেলা (বগুড়া), শাহজাদপুর মেলা (সিরাজগঞ্জ), উল্লাপাড়া হাট মেলা (সিরাজগঞ্জ) চাটমোহর বৈশাখী মেলা (পাবনা), ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, শেরপুর, জামালপুরে অঞ্চলে বসতো মুক্তাগাছা রাজবাড়ি মেলা, ত্রিশাল বৈশাখী মেলা,গৌরীপুর মেলা, দুর্গাপুর মেলা (নেত্রকোনা), বারহাট্টা মেলা (নেত্রকোনা), নালিতাবাড়ী মেলা (শেরপুর), শ্রীবরদী মেলা (শেরপুর), মাদারগঞ্জ হাট মেলা (জামালপুর)। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, নোয়াখালী, ফেনী, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান এলাকার অন্যতম ডিসি হিল বৈশাখী মেলা (চট্টগ্রাম), পটিয়া বৈশাখী মেলা, রামু বৈশাখী মেলা (কক্সবাজার), কোম্পানীগঞ্জ মেলা (নোয়াখালী), ফেনী বৈশাখী মেলা, খাগড়াছড়ি বৈশাখী উৎসব মেলা। খুলনা অঞ্চলের (যশোর, খুলনা, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, সাতক্ষীরা) জুড়ে যশোর শহর বৈশাখী মেলা, শৈলকুপা মেলা (ঝিনাইদহ), কুষ্টিয়া বৈশাখী মেলা, পাইকগাছা মেলা (খুলনা), কালিগঞ্জ মেলা (সাতক্ষীরা)। বরিশাল অঞ্চল জুড়ে(বরিশাল, পটুয়াখালী, ভোলা, ঝালকাঠি) বরিশাল শহর বৈশাখী মেলা, গলাচিপা মেলা (পটুয়াখালী) ভোলা সদর মেলা, নলছিটি বৈশাখী মেলা (ঝালকাঠি)। সিলেট অঞ্চল জুড়ে (সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ) জাফলং বৈশাখী মেলা (সিলেট), শ্রীমঙ্গল মেলা (মৌলভীবাজার), নবীগঞ্জ মেলা (হবিগঞ্জ), তাহিরপুর মেলা (সুনামগঞ্জ)। রংপুর অঞ্চল জুড়ে (রংপুর, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট) রংপুর শহর বৈশাখী মেলা, দিনাজপুর রাজবাড়ি মেলা, ঠাকুরগাঁও মেলা, কুড়িগ্রাম বৈশাখী হাট মেলা ও লালমনিরহাট গ্রামীণ মেলা।
কেন হারিয়ে যাচ্ছে বৈশাখী মেলা, মানুষ কী বলছে?
৭০ এর দশকের পর থেকে দিনাজপুর, নীলফামারী, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামের বিভিন্ন মেলায় ঘুরে বেড়াতেন আক্বাস আলী। তিনি দিনাজপুরের পার্বতীপুরের বাসিন্দা। তিনি ঢাকা মেইলকে বলেন, আগে বৈশাখের মানেই অন্যরকম আনন্দ। সেটা বুড়ো থেকে ছোট সবার মানে আনন্দ খেলতো। মেলা শুরু আগে থেকে মেলায় যাওয়ার জন্য সবার প্রস্তুতি শুরু হতো। মেলায় না গেলে যেনো ভাত হজম হবে না এমন অবস্থা ছিল। জীবনে তিনি বহু বৈশাখী মেলা ঘুরেছেন। কিন্তু ১৯৯৮ সালে বন্যার পর থেকে অঞ্চলটিতে মেলা কমছে বলে তার ধারণা।
তিনি এর নেপথ্যর কারণ হিসেবে জানালেন, আগে ধান কাটার পরই জমি পরে থাকতো। আমন কেটে জমি পড়ে থাকায় সেই জমিতে মেলা বসতো। জমির মালিকও তেমন বাধা দিতেন না। কারণ মেলা বসানোটা অনেকের কাছে গর্বের মনে হতো। ফলে তারা জমি দিতেন। কিন্তু কালের বিবর্তনে সেই জমিতে দুই ফসল ফলানো শুরু করলেন কৃষক। ফলে বৈশাখের সময় আর মেলাগুলো বসার মতো জায়গার সংকুলান চলছে। এ অবস্থা চলতে চলতে এখন আর মেলাই বসে না।
নীলফামারীর প্রবীণ আজগর আলী। থাকেন জেলাটির সদর উপজেলায়। তিনি তার জীবনে সদর উপজেলার দারোয়ানীর মেলা বসতে দেখেছেন বহুবার। কিন্তু গত এক যুগ থেকে আর সেই মেলা তেমন বসছে না।
কারণ হিসেবে তিনি জানালেন, নীলফামারীর দারোয়ারী টেক্সটাইল মিলের বিপরীত পাশে থাকা ফাঁকা জমিতে বসতো সেই মেলা। কিন্তু এখন সেই মিল বন্ধ। তবে এলাকাটি নানা ধরনের কারখানা গড়ে ওঠায় এখন আর মানুষ মেলার ব্যাাপারে আগ্রহী নয়। ফলে কেউ মেলাটি বসারও আর উদ্যোগ নেয় না।
তিনি আরও জানালেন, আগে মেলা বসার জন্য প্রশাসনের অনুমতি নিতে হতো। কিন্তু এখন প্রশাসন এসব মেলার ব্যাপারে কোন খোঁজ খবরই রাখে না। আর মেলা বসলেও আগের মতো দোকানপাট বসে না, সার্কাস ও যাত্রামেলাও বসে না। নাগরদোলা আসলেও মানুষের তেমন আগ্রহ নেই। কারণ সকলে এখন কর্মে ব্যস্ত।
রংপুরের ৭৫ বছর বয়সী প্রবীণ ব্যবসায়ী আব্দুল কাদের। তার যৌবন থেকে মেলায় মেলায় ঘুরে ঘুরে দোকান করতেন তিনি। তিনি বলেন, আমরা ছোটবেলায় মেলায় বাঁশের তৈরি জিনিস, মাটির হাঁড়ি-পাতিল বিক্রি করতাম। তখন একদিনে যা বিক্রি হতো, এখন এক মাসেও হয় না। মানুষ আর আগের মতো মেলায় আসে না। এখনো মেলা করি তবে বড় মেলা নয়। লোকজন ডাকলে যাই।
মেলা হারিয়ে যাওয়ার আরও কিছু কারণ
ঐতিহ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মেলাগুলো হারিয়ে যাওয়ার নেপথ্যে আরও অনেক কারণ রয়েছে। তার মধ্যে মানুষের মধ্যে কর্ম ব্যস্ততা, ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রভাব, জায়গার সংকুলান, সাংস্কৃতিক পরিবর্তন, অর্থনৈতিক পরিবর্তন ও নিরাপত্তার অভাব।
ঢাকার মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা নুরুননাহার বলেন, আগে আমরা মেলা মানেই আনন্দ বুঝতাম। মেলায় যেতেই হবে। কিন্তু্ এখনকার বাচ্চারা মেলা কি বোঝেই না। তারা মোবাইল ফোন নিয়েই ব্যস্ত। দিনাজপুরের পার্বতীপুরের একটি গ্রামের পল্লী চিকিৎসক অরুণ কুমার রায় বলেন, সেই মেলাগুলো শুধু কেনাকাটার জায়গা ছিল না। এটা ছিল সামাজিক মিলনমেলা। এখন সেই পরিবেশ আর নেই। মেলাও নেই।
তবে এখনও দেশের কিছু অঞ্চলে এই ঐতিহ্য টিকে আছে। সাংস্কৃতিক সংগঠন ও প্রশাসনের উদ্যোগে কিছু মেলা আয়োজন করা হয়, যেখানে নতুন প্রজন্মকে ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত করার চেষ্টা চলছে।
বাস্তবতা কি বলে?
বৈশাখী মেলা কেন হারিয়ে যাচ্ছে তা নিয়ে বিভিন্ন জেলার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মুলত ডিজিটাল যুগের প্রচলন শুরুর পর থেকে মেলাকে বিদায় জানাতে শুরু করেছে লোকজন। বিশেষ করে শহুরে লোকজন। কারণ আগে মেলায় যেসব পণ্য পাওয়া যেতো তা ছিল অনেকটা নিম্মমানের। ফলে স্থায়ী হতো না। আর এখন ঘরে বসেই অনলাইনে অর্ডার করলেই লোকজন সহজে কেনাকাটা করতে পারছে। পাশাপাশি মানুষ এখন প্রচণ্ড ব্যস্ত সময় পার করে। সারাক্ষণ তারা টাকার পেছনে ছুটছে। ফলে আনন্দ বিনোদন করার জন্য মেলায় যাওয়ার মতো লোকজন দিনদিন কমছে। সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো- এসব মেলার আয়োজনের জন্য স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের জায়গা বা নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয় না। ফলে আয়োজকরা নিরুৎসাহিত হয়ে এসব মেলা বন্ধ করে দিচ্ছেন।
রাজশাহীর বাগা উপজেলার নাজমুস সালেহী বলেন, আগে আমরা মেলায় যাইতাম পুতুল নাচ, যাত্রাপালা দেখার জন্য। কিন্তু এখন তো সে সবের চেয়ে ডিজিটালে ভালো বিনোদন আসছে। যা ঘরে বসে লোকজন দেখতে পাচ্ছে। ফলে মানুষ মেলায় যেতে আগ্রহী না। মানুষের হাতে এখন সময়ও কম। তারা চায় কম সময়ে কত লাভজনক বিনোদন দেখা যায়।
এমআইকে/এআরএম