images

জাতীয়

বৈশাখী উৎসবে নেই জৌলুস, বাদ্যযন্ত্রের আবেদন হারিয়েছে মালিবাগ 

মোস্তাফিজুর রহমান

১৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৯ এএম

এক সময় মালিবাগ ডিআইটি রোডে অনেকগুলো হারমোনিয়ামের দোকান ছিল। দোকানগুলোতে একতারা, দোতারা, তবলা, বাঁশি, বেহালা ও পিয়ানোসহ সব ধরনের বাদ্যযন্ত্রই পাওয়া যেত। সংগীত প্রিয় মানুষদের সমাগম থাকতো দোকানে দোকানে। কিন্তু কালের পরিক্রমায় সেই দোকানগুলো আর নেই। একে একে বন্ধ হয়ে এখন টিকে আছে মাত্র একটি। এই শেষ দোকানটিও বন্ধের উপক্রম।

মালিবাগে ৪৩ বছর ধরে বাদ্যযন্ত্রের ব্যবসা করে আসছেন মো. দেলোয়ার হোসেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া আখাউড়ার আজমপুরের এই বাসিন্দার এখানে দুটি দোকান ছিল। অন্যরা গুটিয়ে নিলে তারও একটি বন্ধ করে দিয়ে এখন একটি দোকানই ভরসা।   

দেলোয়ার হোসেন ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘বাদ্যযন্ত্রের ব্যবসা বাণিজ্য ভালো না। আমার ব্যবসার অবস্থা এখন খুবই খারাপ। দোকান ভাড়া দিতে পারছি না মাস শেষে। ২৩ হাজার টাকা দোকানের ভাড়া। এখনো টিকে আছি কোনো মতে।’

বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ। আর বৈশাখে লোকজ বাদ্যযন্ত্রের মূর্ছনা উৎসবের আমেজ বাড়িয়ে দেয় বহুগুণে। বাদ্যযন্ত্রের পসরা সাজিয়ে রাখা হয় বৈশাখের আয়োজনে আয়োজনে। বাদ্যযন্ত্রের তালে চলে লোকসংগীত ও নৃত্য।

একসময় শহরের আয়োজনগুলোর সেসব বাদ্যযন্ত্রের প্রধান উৎস ছিল মালিবাগ ডিআইটি রোডের দোকানগুলো। শুধু বৈশাখই নয়, বাঙালির যে কোনো উৎসব আয়োজনে বাদ্যযন্ত্রের কদর ছিল বেশ। আর বাদ্যযন্ত্রগুলো সংগ্রহে ওই দোকানগুলোতে ভিড় জমাতেন সংগীত প্রিয় মানুষরা। কিন্তু এখন সবই যেন অতীত।

music_4

সেই কথা উঠে এল বাদ্যযন্ত্র ব্যবসায়ী দেলোয়ার হোসেনের মুখেও।

‘আগে কোনো উৎসব এলে দোকানে এতো ভিড় থাকতো যে, কথা বলার সুযোগ থাকতো না। উৎসব ছাড়াই দিনেই ৪/৫টা হারমোনিয়াম বিক্রি হতো। তবলা তো অনেক বিক্রি হতো। দিনে কম হলেও ৩০/৫০ হাজার টাকার বাদ্যযন্ত্র বিক্রি হতো। এখন সারাদিনে ২ হাজার টাকাও বিক্রি হয় না কোনো কোনোদিন। খুব খারাপ অবস্থা’, বলেন তিনি।

পহেলা বৈশাখসহ বিভিন্ন উৎসব ঘিরে দোকানগুলোতে অতিরিক্ত চাহিদা থাকায় মালামাল আনতে হতো ঢাকার বাইরে থেকেও। বিশেষ করে মালিবাগের দোকানগুলোর মালামাল আসতো ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে। সেখানকার বাদ্যযন্ত্রের কদরও ছিল বেশ। এ কারণে অনেকে মালিবাগের দোকানগুলো পরিচিতি পেয়েছিল ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাদ্যযন্ত্র মার্কেট’ হিসেবেও।

কিন্তু এখন আর কোনো বাদ্যযন্ত্র ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে আসে না। ব্যবসায়ী দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে আগে (বাদ্যযন্ত্র) আনতাম। তখন অনেক চাহিদা ছিল। আমাদের কারিগররাও কাজ করে চাহিদা পূরণ করতে পারতেন না। কিন্তু এখন আর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে) আনা হয় না। মূলত ব্যবসাই যে ছোট হয়ে গেছে, এ কারণেই আনা হয় না।’

‘আগে আমারই কারিগর ছিল ২০/২২ জন। হারমোনিয়াম মাসে প্রোডাকশন হতো ৬০/৭০টা, এগুলো সব বিক্রি হয়ে যেত। এখন মাসে ১/২ টাও বেচতে পারি না’, যোগ করেন তিনি।

music_7

শেষটিও ‘চাকচিক্যহীন’

মালিবাগ ডিআইটি রোডের ৭৭ নম্বর দোকানটিই এ এলাকার শেষ বাদ্যযন্ত্রের দোকান। ‘মিউজিক প্যালেস’ নামের দোকানটিতে যাবতীয় দেশী ও বিদেশী বাদ্য যন্ত্রাদি প্রস্তুত, মেরামত ও সরবরাহ করা হয়।

বাঙালির প্রাণের উৎসবের পহেলা বৈশাখের আগের দিনও দোকানটি জাঁকজমকহীন। লোকজ সংগীতের প্রধান অনুষঙ্গ হারমোনিয়াম আছে অল্পকিছু। তবলা আছে কয়েক জোড়া। একটি একতারা থাকলেও দোতারা নেই।

অন্যান্য বাদ্যযন্ত্রও ছিল হাতে গোনা। তবে আধুনিক সংগীতের অনুষঙ্গ গিটার আছে বেশকিছু। যদিও খঞ্জনি, সানাইসহ অনেক বাদ্যযন্ত্র দেখা যায়নি।

কর্ণধার দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘গিটারই চলে, তাই রাখিও বেশি। তবে হারমোনিয়াম, তবলা, একতারা, দোতারা- এগুলো একেবারে বিক্রি কম। হারমোনিয়াম মাসে দুই একটা বিক্রি হয়।’

তবে দোকানটিতে না থাকলেও অর্ডার করলে যে কোনো বাদ্যযন্ত্র এনে দেওয়া হয়। কিছু বাদ্য যন্ত্র কারিগর দিয়ে তৈরি করে দেওয়া হয়। আবার বিদেশী বাদ্য যন্ত্রও সরবরাহ করে দোকানটি।

দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘বাজনার (বাদ্য যন্ত্র) সকল আইটেম আমরা সরবরাহ করি। যে কোনো ধরনের বাজনা আমাদের কাছে অর্ডার করলে সেটি এনে দেই।’

music_5

বাদ্যযন্ত্রের দাম কেমন?

দামদরের বিষয়ে এই ব্যবসায়ী বলেন, ‘হারমোনিয়াম ১৬ হাজার থেকে ৮০ হাজার টাকা পর্যন্ত আছে। তবে সব দোকানে নেই। অর্ডার করলে এনে দেওয়া হয়। দামি হারমোনিয়ামগুলো ইন্ডিয়া থেকে আনা হয়।’

দোকানটিতে বেশকিছু গিটার আছে। দেশি গিটার ছাড়াও ভারত, চায়না, ইন্দোনেশিয়ার পণ্য আছে। গিটারগুলো সাড়ে তিন হাজার থেকে ১৮ হাজার টাকা পর্যন্ত রয়েছে।

এছাড়া তবলার দাম ৬৫০০ টাকা, একতারা ৫০০ টাকা, দোতারা ৩০০০/৪০০০ টাকা, উকুলেলে (ছোট আকৃতির গিটার সদৃশ বাদ্যযন্ত্র) ৩৫০০/৫০০০ টাকায় বিক্রি হয়।

জানতে চাইলে ব্যবসায়ী দেলোয়ার বলেন,‘অনেক বছর ধরে ব্যবসা করি। ৪৩ বছরের বেশি হবে। আমি ছোটবেলায় এই ব্যবসা শুরু করেছি।’

music_6

আবেদন কেন কমল

ব্যবসা কমে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘মোবাইল বের হওয়ার পর থেকেই এই ব্যবসায় ভাটা পড়ে। এখন অনেকেই গানবাজনা করে না, মোবাইল নিয়ে সারাদিন পড়ে থাকে। এ কারণে এই ব্যবসা দিনদিন হ্রাস পাচ্ছে।’

অনেকেই বলছেন, প্রধানত প্রযুক্তির কারণে বাদ্যযন্ত্রের প্রতি মানুষের আগ্রহ কমেছে। এ কারণে মালিবাগের দোকানগুলো বন্ধ হয়ে গিয়েছে। তবে খোঁজ নিয়ে এও জানা গেছে, ঢাকার অন্যান্য এলাকার বাদ্যযন্ত্রের দোকানগুলো জনপ্রিয়তা বাড়ায় মালিবাগের দোকানগুলোতে প্রভাব পড়েছে।

বিশেষ করে রাজধানীর এলিফেন্ট রোডে বেশকিছু বাদ্যযন্ত্রের দোকান গড়ে উঠেছে। সেখানকার আলপনা প্লাজায় অনেকগুলো নামকরা বাদ্যযন্ত্রের দোকান রয়েছে। এগুলোতে গিটার, কি-বোর্ড, তবলা, হারমোনিয়ামসহ সব ধরনের বাদ্যযন্ত্রই পাওয়া যায়।

এছাড়াও পুরান ঢাকার শাঁখারি বাজারেও বেশকিছু বাদ্যযন্ত্রের দোকান রয়েছে। দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের জন্য এখন শাঁখারি বাজার সংগীত প্রেমীদের প্রধান গন্তব্য। এখানে হারমোনিয়াম, তবলা, ঢোল, সেতার, এসরাজ ও বাঁশিসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র পাওয়া যায়।

এএম/এআরএম