সাখাওয়াত হোসাইন
১৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:০৩ এএম
বাংলা নববর্ষকে বরণ ঘিরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে শেষ হয়েছে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’র সব প্রস্তুতি। লোকজ ঐতিহ্য ও প্রতীকের মেলবন্ধনে এবার শোভাযাত্রায় থাকছে পাঁচটি বড় মোটিফ-মোরগ, বেহালা, পায়রা, হাতি ও ঘোড়া। আয়োজকদের মতে, শোভাযাত্রার মাধ্যমে তুলে ধরা হবে ঐক্য, মানবিক মূল্যবোধ ও সাংস্কৃতিক চেতনার বার্তা।
মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) সকালে চারুকলা অনুষদে দেখা যায়, বৈশাখী শোভাযাত্রা শুরুর আগে শিক্ষার্থী ও শিল্পীরা শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তারা সবাই ব্যস্ত সময় পার করছেন। এতে অংশ নিতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে ছুটে আসছেন মানুষ।
এবারের শোভাযাত্রায় থাকা বড় মোটিফগুলো লোকজ প্রতীকের ধারায় যথাক্রমে শক্তি, সৃজন, শান্তি, গৌরব ও গতিময়তার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপিত হবে। পাশাপাশি বাংলার ঐতিহ্যবাহী পটচিত্র—গাজীরপট, আকবর, বনবিবি ও বেহুলার চিত্রও স্থান পাবে শোভাযাত্রায়।
‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ প্রাণবন্ত করতে ৩৫ জন বাদ্যযন্ত্রশিল্পী জাতীয় সংগীত, ‘এসো হে বৈশাখ’সহ দেশাত্মবোধক গান পরিবেশন করবেন। এছাড়া প্রায় ২০০ শিক্ষার্থী বহন করবেন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা।
‘নববর্ষের ঐকতান, গণতন্ত্রের পুনরুত্থান’ প্রতিপাদ্য নিয়ে সকাল ৯টায় চারুকলা অনুষদের সামনে থেকে শোভাযাত্রা বের হবে। সকাল ৮টা থেকে শুরু হবে প্রস্তুতি।
শোভাযাত্রাটি চারুকলা অনুষদের ৩ নম্বর (উত্তর) গেট থেকে শুরু করে শাহবাগ থানার সামনে গিয়ে ইউটার্ন নেবে। সেখান থেকে রাজু ভাস্কর্য, টিএসসি ও দোয়েল চত্বর ঘুরে বাংলা একাডেমির সামনে দিয়ে আবার চারুকলায় গিয়ে শেষ হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থী ও চিত্রশিল্পী রফিকুল ইসলাম ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘পহেলা বৈশাখের আয়োজন আমাদের গর্বের একটি আয়োজন। আমরা চেষ্টা করছি এমন কিছু উপস্থাপন করতে, যা দেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে আরও শক্তভাবে তুলে ধরবে। অনেক কষ্ট হলেও যখন দেখি মানুষ এত আগ্রহ নিয়ে দেখতে আসে, তখন সব পরিশ্রম সার্থক মনে হয়।’
তিনি আরো জানান, এবারের শোভাযাত্রায় পরিবেশ ও মানবিক মূল্যবোধের বার্তাকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
আজিমপুর থেকে পহেলা বৈশাখের শোভাযাত্রায় অংশ নিতে আসা তানহা তাসনীম ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘প্রতিবছরই আমি এখানে আসি, কিন্তু এবার প্রস্তুতিটা বেশি বড় ও আকর্ষণীয় মনে হচ্ছে। পরিবার নিয়ে এসেছি, সবাই খুব উপভোগ করছি। এই আয়োজন আমাদের শিকড়ের সঙ্গে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেয় এবং নতুন প্রজন্মকে সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহী করে তোলে।’
তানহা আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতেও এই আয়োজন আরও বিস্তৃত ও আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিতি লাভ করবে।
ঢাকার মিরপুর থেকে আসা রাহিদুল ইসলাম ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘এখানে এলে মনে হয় সংস্কৃতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হতে পারছি। শিল্পীদের হাতের কাজ, রঙের ব্যবহার আর প্রতীকী মোটিফগুলো সব মিলিয়ে এক অসাধারণ পরিবেশ ও চিত্র কর্ম। দিনরাত পরিশ্রম করে কীভাবে শিল্পীরা এতো সুন্দর আয়োজন করেছে তা দেখছি।’
রাহিদুল বলেন, ‘আমার মতে এই আয়োজন শুধু উৎসব নয়, এটা আমাদের পরিচয়কে বিশ্বে তুলে ধরার একটা মাধ্যম। তরুণ প্রজন্ম এখানে এসে যে অনুপ্রেরণা পায়, তা সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ। আমি চাই, এ ধরনের সাংস্কৃতিক আয়োজন আরও বেশি করে প্রচার পাক এবং সবাই এতে অংশ নিক।’
বৈশাখী শোভাযাত্রায় অংশ নিতে প্রথমবারের মতো নারায়ণগঞ্জ থেকে আসা শিরিন আহমেদ বলেন, ‘আমি প্রথমবারের মতো চারুকলায় মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশ নিতে এসেছি। এখানে এসে বুঝতে পারলাম, এটি শুধু শোভাযাত্রা নয়, বরং অনেক গভীর চিন্তা ও বার্তা বহন করে। প্রতিটি মুখোশ, প্রতিটি প্রতীক যেন সমাজের নানা দিক তুলে ধরছে।’
তিনি বলেন, ‘এখানকার পরিবেশটা খুবই চমৎকার এবং উৎসবমুখর। আমি মনে করি, এই ধরনের আয়োজন আমাদের সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখে এবং মানুষের মধ্যে সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দেয়। আজকের অভিজ্ঞতা আমার জন্য সত্যিই স্মরণীয় হয়ে থাকবে।’
চারুশিল্পী রাফিয়া ইসলাম বলেন, ‘এই আয়োজন শুধু আমাদের উৎসব নয়, বরং এটি একটি দায়িত্বও। আমরা চেষ্টা করি ঐতিহ্য ও সমসাময়িক বাস্তবতাকে একসঙ্গে তুলে ধরতে। এখানে কাজ করতে গিয়ে আমরা দলগতভাবে শিখি, ভাবি এবং নতুন কিছু সৃষ্টি করি।’
তিনি আরো বলেন, ‘প্রতিবছর পহেলা বৈশাখের শোভাযাত্রা আমাদের নতুনভাবে ভাবতে শেখায়। এটি শুধু শিল্পচর্চা নয়, বরং মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি, আশা এবং ইতিবাচকতার বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার একটি শক্তিশালী মাধ্যম।’
চারুকলা অনুষদের তরুণ শিল্পী তামান্না আখতার বলেন, ‘শোভাযাত্রা আমাদের সংস্কৃতির একটি জীবন্ত প্রকাশ। আমরা এখানে শুধু শিল্প তৈরি করছি না, বরং একটি সামাজিক বার্তা তুলে ধরার চেষ্টা করছি। প্রতিটি প্রতীকী অবয়বের পেছনে থাকে গভীর চিন্তা—অন্যায়, অন্ধকার ও অসঙ্গতি থেকে আলোর দিকে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান।’
তিনি আরো বলেন, ‘দিন-রাত পরিশ্রম করে আমরা যে কাজ করছি, তা দর্শনার্থীদের সামনে উপস্থাপিত হলে সব কষ্ট সার্থক মনে হয়।’
বৈশাখী শোভাযাত্রার সার্বিক প্রস্তুতি নিয়ে নববর্ষ উদযাপন কমিটির সদস্য সচিব ও চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. আজহারুল ইসলাম শেখ বলেন, ‘শোভাযাত্রাকে ঘিরে আমাদের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা রাতদিন কাজ নিরলসভাবে কাজ করেছেন।’
সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে তিনি বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। আমাদের প্রক্টরিয়াল টিম ও আমরা নিজেরাও যতটুকু সম্ভব সতর্কতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছি।’
এসএইচ/এমআর