images

জাতীয়

রমনা বটমূলে বোমা হামলা: ২৫ বছরেও হয়নি বিচার

নিজস্ব প্রতিবেদক

১৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:৪২ এএম

২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল (পহেলা বৈশাখ) রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানস্থলে বিস্ফোরিত হয় দুটি বোমা। নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদের (হুজি) নৃশংস ওই বোমা হামলায় প্রাণ হারান ১০ জন। আহত হন অনেকেই। এ ঘটনায় হুজি নেতা মুফতি হান্নানসহ ১৪ জনকে আসামি করে ওই দিনই রমনা থানার পুলিশ বাদী হয়ে হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে আলাদা দুটি মামলা দায়ের করে। হত্যা মামলায় রায় হলেও বিস্ফোরক মামলার বিচার শেষ হয়নি ২৫ বছরেও।

বর্তমানে মামলাটি ঢাকা মহানগর বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-১৫-তে বিচারাধীন রয়েছে। সর্বশেষ গত ৩১ মার্চ এ মামলায় আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য দিন ধার্য ছিল। তবে আসামিরা দেশের বিভিন্ন মামলায় গ্রেফতার থাকায় তাদের আদালতে হাজির করা হয়নি। এজন্য আদালত এ মামলায় আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য আগামী ৯ জুলাই দিন ধার্য করেছেন।

এদিকে দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে বিস্ফোরক মামলাটির বিচার শেষ করা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী।

তিনি বলেন, দেশের আলোচিত ঘটনার মামলার মধ্যে একটি রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা হামলা। এ ঘটনায় হত্যা মামলার বিচার শেষ হলেও বিস্ফোরক আইনে করা মামলাটির বিচার করা সম্ভব হয়নি। দীর্ঘদিন এ মামলাটির বিচার হাইকোর্ট থেকে স্থগিত ছিল। তবে বর্তমানে মামলাটির স্থগিতাদেশ নেই। এ মামলায় ৮৪ জনের মধ্যে ৫৪ জন সাক্ষ্য দিয়েছে। আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য আছে। আশা করছি দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে মামলাটির বিচার শেষ করতে পারব। রায়ে সব আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি প্রত্যাশা করছি আমরা।

এদিকে আসামি পক্ষের আইনজীবী মো. ইদি আমিন বলেন, আমরা আসামিপক্ষ থেকে মামলাটি দ্রুত শেষ করার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছি, কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষ থেকে অবহেলা করা হয়েছে। আমরা আদালতকে অনেকবার মেনশন করেছি। আসামিদের ৩৪২ ধারার কার্যক্রম হয়ে যাক, কিন্তু প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে শুনানির সময়ে তাদের আদালতে হাজির করা হচ্ছে না। এ কারণে মামলাটি দীর্ঘদিন ধরে একইভাবে পড়ে রয়েছে। আসামিরা এরই মধ্যে ২০ থেকে ২৫ বছর ধরে জেলহাজতে আটক রয়েছে। এ মামলায় সাজা দিলে আর কতই দেবেন আদালত। এই মামলায় আসামিদের বেশি সাজা ভোগ হয়ে যাচ্ছে।

এদিকে, বিস্ফোরক মামলার রায় ঘোষণা না হলেও রায় এসেছে হত্যা মামলার। গত বছর হাইকোর্ট থেকে এই মামলাটির রায় দেওয়া হলেও চূড়ান্ত রায়ের অনুলিপি প্রকাশিত হয়নি। এই বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, যত দ্রুত সম্ভব হাইকোর্টে দেওয়া রায়টি প্রকাশের জন্য কথা বলব।

তিনি জানান, রায়টি প্রকাশ হওয়ার পর আমরা পুরো বিষয়টি পর্যলোচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করব। পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত এই বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে তা বলা ঠিক হবে না। গত বছর রায় হলেও এখনও তা প্রকাশ হয়নি তা একটু হতাশারই। আমি চেষ্টা করব যত দ্রুত সম্ভব এই রায়টি যেন প্রকাশ হয় সে ব্যাপারে চেষ্টা করার।

এদিকে হত্যা মামলার আসামি পক্ষের আইনজীবী শিশির মনির বলেন, এই মামলায় ১৪ জনকে সাজা দিয়েছিল নিম্ন আদালত। তার বিচার হয়েছে হাইকোর্টে। সেখানে নয়জনকে সাজা দেওয়া হয়ছে। এই ৯ জনের মধ্যে ২ জনকে যাবজ্জীবন সাজা দেওয়া হয়েছে এবং ৭ জনকে ১০ বছর সাজা দেওয়া হয়েছে। ১০ বছর করে দেওয়া ৭ জনের ভেতর দুইজন মুক্তি পেয়েছেন আর বাকিরা ভিন্ন মামলা থাকায় এখনও জেলে আছেন। এই মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় এখনও প্রকাশ হয়নি। পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করলে আসামিপক্ষ আপিল বিভাগে আপিল করবে। এরপর আপিল বিভাগে শুনানির পর পূর্ণাঙ্গ সিদ্ধান্ত হবে। আমরা আশা করছি এই মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় দ্রুতই প্রকাশ হবে।

মামলার নথি থেকে জানা যায়, ২০০৮ সালের ২৯ নভেম্বর শীর্ষ হুজি নেতা মুফতি আবদুল হান্নানসহ ১৪ জনকে অভিযুক্ত করে সিআইডির পরিদর্শক আবু হেনা মো. ইউসুফ আদালতে হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে আলাদা দুটি সম্পূরক চার্জশিট দাখিল করেন। এর মধ্যে ২০১৪ সালের ২৩ জুন ঢাকার দ্বিতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক মো. রুহুল আমিন হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে মুফতি হান্নান, বিএনপি নেতা ও সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর ভাই মাওলানা তাজউদ্দিনসহ আটজনের মৃত্যুদণ্ড এবং ছয়জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন বিচারক।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অন্য আসামিরা হলেন— মাওলানা তাজউদ্দিন (পলাতক), মাওলানা আকবর হোসাইন, মুফতি আব্দুল হাই (পলাতক), হাফেজ জাহাঙ্গীর আলম বদর (পলাতক), মাওলানা আবু বকর, মুফতি শফিকুর রহমান (পলাতক) ও আরিফ হাসান সুমন। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন— হাফেজ মাওলানা আবু তাহের, মাওলানা সাব্বির, হাফেজ ইয়াহিয়া, মাওলানা শওকত ওসমান ওরফে শেখ ফরিদ, মাওলানা আব্দুর রউফ ও মাওলানা শাহাদাৎ উল্লাহ জুয়েল।

তবে হত্যা মামলাটির কিছু আসামির সাজা কমিয়ে ২০২৫ সালের ১৩ মে রায় ঘোষণা করেন হাইকোর্ট। রায়ে আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মো. তাজউদ্দিনের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন করা হয়। এ ছাড়া মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আকবর, আরিফ, হাফেজ জাহাঙ্গীর, আবু বকর, আবদুল হাই, শফিকুর রহমান এবং যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত সাব্বির, শেখ ফরিদ ও আবু তাহেরের সাজা কমিয়ে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেন হাইকোর্ট।

এদিকে বিস্ফোরক আইনে করা মামলায় ২০১৪ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ মুফতি হান্নানসহ হত্যা মামলার ১৪ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন। এরমধ্যে ২০১৭ সালের ১২ এপ্রিল রাতে মুফতি হান্নানের আরেক মামলায় ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। আর যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আবদুর রউফ ও ইয়াহিয়া মারা যাওয়ায় তাদের এ মামলার বিচারিক কার্যক্রম থেকে বাদ দেওয়া হয়।

এফএ