images

জাতীয়

‘সংবিধানের দোহাই দিয়ে জুলাই বিপ্লবকে নস্যাৎ করার ষড়যন্ত্র চলছে’

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

১৩ এপ্রিল ২০২৬, ০২:৫২ পিএম

বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রফেসর ড. দিলারা চৌধুরী অভিযোগ করেছেন, বর্তমান সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ‘আইনের কচকচানি’ এবং ‘অর্ধসত্য’ ভাষ্যের মাধ্যমে জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার মহাবিপ্লবের মূল আকাঙ্ক্ষাকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে।

তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, সংবিধান মানুষের জন্য, মানুষ সংবিধানের জন্য নয়। জনগণের ইচ্ছা বা গণভোটের রায়কে যারা আইনি জটিলতায় আটকাতে চান, তারা আসলে প্রকারান্তরে স্বৈরতন্ত্রকেই ফিরিয়ে আনতে চাচ্ছেন।

সোমবার (১৩ এপ্রিল) রাজধানীর ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ (আইডিইবি) মিলনায়তনে আয়োজিত এক জাতীয় সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন। ‘গণভোটের রায়ের বিরুদ্ধে সরকার: সংকটের মুখোমুখি দেশ’ শীর্ষক এই সেমিনারের আয়োজন করে ১১ দলীয় ঐক্য।

ড. দিলারা চৌধুরী তার বক্তব্যের শুরুতে বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এই জনপদ একটি সক্রিয় বদ্বীপ। এদেশের মানুষ যুগ যুগ ধরে অন্যের তাঁবেদারিতে ছিল। ১৯৪৭ সালে জমিদারি প্রথা থেকে মুক্তির লড়াই হয়েছিল, কিন্তু তা ফলপ্রসূ হয়নি। এরপর ১৯৭১ সালে আমরা লড়াই করেছি, কিন্তু তাতেও সাধারণ মানুষের মুক্তি মেলেনি। সবশেষে ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব আমাদের নতুন আশার আলো দেখিয়েছে। আমি আশা করেছিলাম এই আন্দোলনের পর দেশে একটি সুস্থ রাজনীতি আসবে, বৈষম্য দূর হবে এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা সেই সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হচ্ছি।

গণভোট ও আইনি চাতুরতা নিয়ে সমালোচনা

সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বক্তব্যের সমালোচনা করে এই রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বলেন, গণভোট নিয়ে বর্তমানে যারা সংসদে আছেন বা দায়িত্বে আছেন, তাদের মধ্যে এক ধরনের অনীহা দেখা যাচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ অনেকেই সাংবিধানিক আইনের নানা জটিল প্যাঁচ সামনে আনছেন। তারা একবার বলছেন ‘সাংবিধানিক সার্বভৌমত্ব’, আবার বলছেন ‘সংবিধানে এটি নেই’। এটি আসলে এক ধরনের রাজনৈতিক চাতুরতা।

ব্রিটিশ পার্লামেন্টের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, সেখানে লিখিত সংবিধান না থাকা সত্ত্বেও ব্রেক্সিট গণভোটের সময় জনগণের সামান্য সংখ্যাগরিষ্ঠতার রায়কেও পার্লামেন্ট সম্মান জানিয়েছে। কারণ জনগণের ইচ্ছাই সবকিছুর ঊর্ধ্বে।

তিনি আরও যোগ করেন, অর্ধেক সত্য বলা পুরা মিথ্যার চেয়েও ভয়ংকর। সরকার পক্ষ থেকে সাংবিধানিক স্পিরিট বা মূল দর্শনকে এড়িয়ে কেবল শব্দ নিয়ে খেলা করা হচ্ছে, যা জুলাই আন্দোলনের শহীদ ও আহতদের সাথে এক ধরনের প্রতারণা।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও সচিবালয় প্রসঙ্গ

বিচার বিভাগের ওপর হস্তক্ষেপের প্রচেষ্টায় উদ্বেগ প্রকাশ করে ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা একটি সাংবিধানিক রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি। বর্তমান সরকার বিচার বিভাগের জন্য আলাদা সচিবালয় দিতে চাইছে না এবং অজুহাত হিসেবে জনগণের টাকার কথা বলছে। এটি হাস্যকর। বিচারকদের নিয়োগ, বদলি ও শাসন বিভাগ থেকে বিচ্ছেদ নিশ্চিত না করলে দেশ পুনরায় স্বৈরতন্ত্রের পথে হাঁটবে। শেখ হাসিনার সরকারও সংবিধানকে ব্যবহার করেই কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু করে সবকিছু দমন করতে চেয়েছিল। পলিটিক্যাল প্রশ্নগুলোকে যখন বিচার বিভাগে টেনে আনা হয়, তখন বিচারব্যবস্থাই ধ্বংস হয়ে যায়।

অলিগার্ক ও দুর্নীতির পুরনো প্রেতাত্মা

দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন, দুদক চেয়ারম্যানকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, মানবাধিকার কমিশন ও পুলিশ কমিশনের কার্যকারিতা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি করা হচ্ছে। আমরা দেখতে পাচ্ছি এস আলমের মতো অলিগার্করা আবার সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে। হাসিনারা আমলে যেভাবে অলিগার্কদের রাজত্ব ছিল, বর্তমানেও তার প্রতিধ্বনি শোনা যাচ্ছে। যদি জুলাই সনদ ও গণভোটের দাবিকে গুরুত্ব না দেওয়া হয়, তবে এই হাজার হাজার তরুণের রক্ত ও পঙ্গুত্ব বৃথা যাবে।

বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে ড. দিলারা চৌধুরী দেশের আইনজীবী ও সচেতন নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, সরকার সংবিধান সংস্কারের চেয়ে সংশোধনকে প্রাধান্য দিচ্ছে যাতে পরবর্তীতে জুডিশিয়াল রিভিউর মাধ্যমে সবকিছু নস্যাৎ করা যায়। এই ছলচাতুরির বিরুদ্ধে আমাদের দেশের মেধাবী আইনজীবীদের উচিত সরকারকে চ্যালেঞ্জ করা। বর্তমান সরকার যদি সংসদে একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত নিতে চায় এবং বিরোধীদের কথা বলতে না দেয়, তবে আমাদের রাজপথে এবং সংসদের ভেতরে—উভয় জায়গায় জোরালো আওয়াজ তুলতে হবে।

সেমিনারে তিনি সুস্পষ্টভাবে দাবি করেন, জুলাই বিপ্লবের স্পিরিট রক্ষায় অবিলম্বে গণভোটের বৈধতা দিতে হবে এবং দলীয় নেতার পক্ষ হয়ে অন্যের কথা বলার যে অপসংস্কৃতি তা বন্ধ করতে হবে।

টিএই/এএস