নিজস্ব প্রতিবেদক
১১ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:০৪ পিএম
সারাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতায় গত তিন মাসে (জানুয়ারি-মার্চ ’২৬) অন্তত ৬১০টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৩৬ জন এবং আহত হয়েছেন চার হাজার ৭৮ জন। এর মধ্যে নিজেরা সহিংসতায় জড়িয়ে বিএনপি নেতাকর্মীদেরই ২৪ জন নিহত ও ১৫৮৫ জন হয়েছে। এছাড়া বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে সংঘর্ষে সাতজন নিহত ও এক হাজার ৬৫৪ জন আহত হয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) এক প্রতিবেদনে শনিবার এসব তথ্য জানিয়েছে। দেশের ১৬টি জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ এবং এইচআরএসএসের সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে চলতি বছরের জানুয়ারি-মার্চ ত্রৈমাসিক মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গত তিন মাসে আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে সহিংসতা, বিভিন্ন দলের সমাবেশ কেন্দ্রিক সহিংসতা, প্রার্থীর সমর্থকের মধ্যে সংঘর্ষ, হামলা, বাড়ি-ঘর, যানবাহন, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ও রাজনৈতিক দলের কার্যালয় ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও চাঁদাবাজি কেন্দ্রিক অধিকাংশ সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ওপর পৃথক হামলা, গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা এবং দেশব্যাপী ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
গত তিন মাসে সহিংসতার ৬১০টি ঘটনার মধ্যে বিএনপির অন্তর্কোন্দলে ১৯৪টি ঘটনায় নিহত ২৪ জন এবং আহত হয়েছেন অন্তত এক হাজার ৫৮৫ জন। বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে সংঘর্ষের ২৬০টি ঘটনায় আহত হয়েছে সাতজন নিহত এবং আহত হয়েছে এক হাজার ৬৫৪ জন। বিএনপি-আওয়ামী লীগের মধ্যে সংঘর্ষের ৩৬টি ঘটনায় নিহত তিনজন এবং আহত ২১৯ জন।
এছাড়া ২৩টি বিএনপি-এনসিপি মধ্যে সংঘর্ষে আহত ২০৪ জন, আওয়ামী লীগ-এনসিপির মধ্যে তিনটি সংঘর্ষে আহত ৫১ জন, ৬০টি বিএনপি-অন্যান্য দলের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছে ১৬৯ জন। এর বাইরে বিভিন্ন দলের মধ্যে ৩৪টি ঘটনায় দুজন নিহত এবং আহত হয়েছেন ১৯৬ জন।
৬১০টি সহিংসতার ঘটনার ৫৭৩টিই (৯৪ শতাংশ) ঘটেছে বিএনপির অন্তর্কোন্দলে ও বিএনপির সঙ্গে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মধ্যে। নিহত ৩৬ জনের মধ্যে বিএনপির ২৮ জন (৭৮ শতাংশ), জামায়াতের চারজন (১১ শতাংশ) ও আওয়ামী লীগের একজন এবং অন্যান্য তিনজন।
এর পাশাপাশি দুষ্কৃতকারীদের দ্বারা রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা-কর্মীদের ওপর হামলার অন্তত ৩৪টি ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলায় কমপক্ষে ২৯ জন আহত হয়। এর মধ্যে বিএনপির ১২ জন, আওয়ামীলীগের চারজন, জামায়াতের তিনজন ও অন্যান্য দলের তিনজনসহ মোট ২২ জন নিহত হয়েছেন। এ সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতায় অর্ধশতাধিক রাজনৈতিক ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।
এছাড়াও সারাদেশে আধিপত্য বিস্তার, দখলদারিত্ব, নির্বাচনি সহিংসতা, রাজনৈতিক সহিংসতা ও চাঁদাবাজি কেন্দ্রীক সাত শতাধিক বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠা, দলীয় কার্যালয়ে সংঘর্ষ, হামলা, লুটপাট, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।
প্রতিবেদনে এইচআরএসএস বলছে, গত জানুয়ারি-মার্চ এই তিন মাসে দেশের রাজনৈতিক সহিংসতার চিত্র বিশ্লেষণ করলে একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়। জানুয়ারি মাসে মোট ১৫১টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় আটজন নিহত এবং এক হাজার ২৩৩ জন আহত হন, যা তুলনামূলকভাবে কম হলেও রাজনৈতিক উত্তেজনার একটি সূচনা পর্যায় নির্দেশ করে।
তবে ফেব্রুয়ারি মাসে এই সহিংসতা হঠাৎ করেই ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়; এ মাসে ৩৪৬টি ঘটনায় অন্তত ১০ জন নিহত এবং ১৯৩৩ জন আহত হন। অন্যদিকে মার্চ মাসে সহিংসতার মোট সংখ্যা কমে ১১৩ টিতে দাঁড়ালেও নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৮ জনে পৌঁছায় এবং আহত হন ৯১২ জন। এটি নির্দেশ করে যে সহিংসতার প্রকৃতি আরও তীব্র ও প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে। এ সময় নির্বাচন-পরবর্তী প্রতিশোধমূলক সংঘর্ষ, আধিপত্য বিস্তার এবং রাজনৈতিক বিরোধ সহিংসতার প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করেছে।
এই সামগ্রিক সহিংসতার প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক পরিস্থিতির অস্থিরতা আরও তীব্র হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। বলা হয়, অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের মে মাসে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ ঘোষণা করে, যার ফলে দলটি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি।
তবে নির্বাচন শেষ হওয়ার পরপরই ঢাকাসহ অন্তত ৩০টি জেলা ও উপজেলায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা দলীয় কার্যালয়ে পুনরায় প্রবেশের চেষ্টা করছেন বা কোথাও কোথাও অবস্থান নিয়েছেন বলে সংবাদমাধ্যমে জানা গেছে। এর ফলে বিভিন্ন স্থানে কার্যালয় পুনর্দখলকে কেন্দ্র করে পাল্টা দখল, হামলা, ভাঙচুর ও উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, যা দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও অস্থিতিশীল করে তুলছে।
ক.ম/