images

জাতীয়

‘গোল্ডেন আওয়ার’ অবহেলায় বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু

মো. মেহেদী হাসান হাসিব

০৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:০৯ পিএম

সড়ক দুর্ঘটনার পর প্রথম এক ঘণ্টা ‘গোল্ডেন আওয়ার’ নামে পরিচিত। এই সময়ের মধ্যেই দ্রুত উদ্ধার ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে অসংখ্য প্রাণ বাঁচানো সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে এই গুরুত্বপূর্ণ সময়টি অবহেলিত থাকায় বাড়ছে সড়কে মৃত্যুর মিছিল। উদ্ধার বিলম্ব, যথাসময়ে হাসপাতালে না নেওয়া এবং জরুরি চিকিৎসাসেবার ঘাটতিই পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা বেশি হওয়ার কারণ জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক, পরিবহন বিশেষজ্ঞ এবং দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ড. হাদিউজ্জামান ঢাকা মেইলকে বলেন, সড়কে প্রাণহানি কমানোর জন্য সমন্বিত উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এই বিশেষজ্ঞ বলেন, আমি বিগত এক যুগ ধরে দেখছি, আমাদের উন্নয়ন অনেকটা এককেন্দ্রিক হয়েছে। আমরা রাস্তা চওড়া করছি, গতি বাড়ানোর চেষ্টা করছি, এক্সপ্রেসওয়ে বানিয়েছি, ফ্লাইওভার নির্মাণ করছি। কিন্তু সমস্যাটা হলো, সড়কের বিদ্যমান ঝুঁকিগুলো রেখেই আমরা গতি বাড়ানোর চেষ্টা করছি। এ কারণেই দুর্ঘটনা ঘটছে।

ড. হাদিউজ্জামান বলেন, এক্সপ্রেসওয়ে তৈরি করা হচ্ছে, কিন্তু সেই গতিতে গাড়ি চালানোর মতো চালক কি আমরা তৈরি করতে পেরেছি? চালকদের কি প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ আছে? এখনো অনেক চালকের উপযুক্ত ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই। অর্থাৎ আমরা ঝুঁকি রেখে গতি বাড়ানোর চেষ্টা করছি। এর ফলেই দুর্ঘটনা বাড়ছে। এসব দুর্ঘটনা সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া কমবে না।

বুয়েটের এই অধ্যাপক বলেন, দুর্ঘটনা যেখানেই ঘটুক না কেন, আশপাশের মানুষের দ্রুত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করে দিতে পারে একজন আহত মানুষের জীবন-মৃত্যু। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায়, মানুষ সাহায্যের বদলে ভিডিও ধারণে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

হাদিউজ্জামান বলেন, দুর্ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে আহত ব্যক্তিকে যত দ্রুত সম্ভব নিকটস্থ ট্রমা সেন্টার বা হাসপাতালে নিতে হবে, যেখানে জরুরি চিকিৎসাসেবা রয়েছে। কাছাকাছি এমন কোনো সুবিধা না থাকলে দ্রুত ফায়ার সার্ভিসে খবর দিয়ে উদ্ধার কার্যক্রম নিশ্চিত করতে হবে। গবেষণায় দেখা গেছে, এই ‘গোল্ডেন আওয়ার’-এর মধ্যে চিকিৎসা শুরু করা গেলে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা অনেকাংশে বাড়ে। তাই এই সময়টিকে কোনোভাবেই অবহেলা করা উচিত নয়।

Accident22

বুয়েটের এই অধ্যাপক আরও বলেন, দেশে ট্রমা কেয়ার ব্যবস্থার অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলেও বড় ঘাটতি রয়ে গেছে দক্ষ জনবলের। জরুরি সেবা দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষিত চিকিৎসক, নার্স ও কর্মীর অভাব এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন নয়, দক্ষ জনবল তৈরি, জরুরি সেবার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জনসচেতনতা গড়ে তোলার মাধ্যমেই দুর্ঘটনায় প্রাণহানি কমানো সম্ভব।

এই বিশেষজ্ঞ বলেন, উচ্চ আদালতের নির্দেশনা রয়েছে—দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে নেওয়ার পর কোনো ধরনের প্রশ্ন বা আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই তাৎক্ষণিক চিকিৎসা শুরু করতে হবে। তবে বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সঙ্গে স্বজন না থাকা বা খরচ নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে চিকিৎসা দিতে গড়িমসি করা হয়, যা গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করে।

সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হচ্ছে না কেন—এ বিষয়ে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী ঢাকা মেইলকে বলেন, আমাদের পারিপার্শ্বিক বিভিন্ন উপাদান মারাত্মকভাবে প্রভাব ফেলে। উন্নত বিশ্বে বাসের সিটে সিটবেল্টের ব্যবস্থা থাকে। এছাড়া অন্যান্য যানবাহনেও সিটবেল্ট ব্যবহারের ফলে দুর্ঘটনা হলেও অনেক প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হয় এবং মৃত্যুর হার কমে। কিন্তু আমাদের দেশে এ ধরনের ব্যবস্থা নেই।

মোজাম্মেল হক বলেন, আমাদের সড়কে চলাচলকারী যানবাহনে দুর্ঘটনার সময় যাত্রীদের সুরক্ষা দেবে—এমন কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেই। পাশাপাশি সামগ্রিক যে বিশৃঙ্খলা রয়েছে, তা সমাধানে কার্যকর উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে না। দেশে আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগ নেই। আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে সড়কে দুর্ঘটনা কমবে, পাশাপাশি প্রাণহানিও কমে আসবে।

এমএইচএইচ/জেবি