মোস্তাফিজুর রহমান
০৫ এপ্রিল ২০২৬, ১২:১৮ পিএম
দুই দশকের বেশি সময় ধরে ড্রাইভিং পেশায় আছেন জলিল করী। হেভি লাইসেন্সধারী এই চালক টানা ১৮ বছর ধরে একটি পরিবহন কোম্পানির বাস চালাচ্ছেন। তিনি নিজেই মনে করেন, দেশের বেশির ভাগ চালকের মনোভাবই ‘বেপরোয়া’।
সড়কে যত দুর্ঘটনা ঘটছে তার বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই চালকের বেপরোয়া মনোভাবের বিষয়টি সামনে আসছে। তবে দুর্ঘটনার দায় না নিলেও জলিলের মতো অনেক চালকই নিজেদের বেপরোয়া মনোভাবের বিষয়টি স্বীকার করছেন। যদিও বেপরোয়া মানসিকতার নেপথ্যে কাজের অব্যবস্থাপনাসহ বেশ কিছু কারণ ও বাস্তবতার কথাও টানছেন এই চালকরা। এটাও বলছেন, তারা পরিবহন খাতের বেহাল পরিস্থিতির শিকার হয়ে বেপরোয়া হতে ‘বাধ্য’ হচ্ছেন।
তবে এই ‘বাধ্য’ হওয়ার বিষয়টির সঙ্গে পুরোপুরি মানতে চান না মনোবিজ্ঞানীরা। তাদের মতে, চালকের পেশাটাই ‘চাপমূলক’। অতিরিক্ত চাপ নিয়েই তাদের কাজ করতে হয়। অবশ্য, চালকদের বেপরোয়া মানসিকতার জন্য আইন প্রয়োগে শিথিলতাসহ অন্যান্য কারণকেও দায়ী করেন বিশেষজ্ঞরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আয়েশা মাহমুদা ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘বেশির ভাগ চালকেরই বেপোরোয়া মনোভাব দেখতে পাচ্ছি। এর প্রধান কারণ রুটে কম্পিটিশন (প্রতিযোগিতা)। এরপর যদি বলি, তারা দায়িত্বজ্ঞানহীন। তারপর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির শিথিলতা। এসব কারণেই তাদের মধ্যে বেপরোয়া মনোভাব দেখা যায়।’
এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘যদি এরকম হয় যে, আমি কোনো ঝামেলা করলে অবশ্যই পানিশমেন্ট (শাস্তি) পাবো, এটা যদি একেবারে এনশিওর থাকে, তাহলে বেপরোয়া গাড়ি চালানোর ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করবে চালকরা। কিন্তু যখন তারা মনে করে যে, যাই করি না কেন আমি তো পার পেয়েই যাবো, তখনই আর কেউ কোনো কিছু মান্যগণ্য করতে চায় না।’
‘শোনেন, এই পেশাটাই (ড্রাইভিং) এমন। চাপমূলক পেশা। কিন্তু তারপরেও যদি ল’ এনফোর্সমেন্ট এজেন্সিগুলো সতর্ক থাকে তাহলে কিছুটা কন্ট্রোল করা যাবে।’
এই মনোবিজ্ঞানী আরও মনে করেন, চালকদের মন-মানসিকতা পরিবর্তনে কাউন্সেলিং করা যেতে পারে। ‘যেমন আমি বেপরোয়া কাজ করব কি করব না, সে ক্ষেত্রে কাউন্সেলিং করা যেতে পারে। আমাকে আমার ভেতরে মূল্যবোধের কনসেন্স (সচেতনতা) জাগিয়ে তুলতে হবে। এসব বিষয়ে কাউন্সেলিং দিলে একটু কন্ট্রোল হতে পারে,’ বলেন অধ্যাপক আয়েশা মাহমুদা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক বলেন, ‘বিষয়টি (গাড়ি চালানো) এমনই যে, অসতর্ক হলেই ঝামেলা। কাজেই যথাযথ সতর্ক থেকেই যেন চলা যায়, সেটাই এনশিওর করতে হবে। ল’ অ্যান্ড এনফোর্সমেন্ট এজেন্সিগুলোকে কড়া নজরদারি রাখতে হবে। খামখেয়ালি করে গাড়ি চালালে হবে না। দায়িত্ব নিয়ে রিস্ক এড়িয়ে গাড়ি চালাতে হবে, তবেই দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব।’
কুড়ি বছর আগে কুড়িগ্রাম তিস্তা নদী ভাঙনে ভিটেমাটি হারিয়ে এলাকাছাড়া হন আখিলুর রহমান। ১৭ বছর ধরে বিভিন্ন যানবাহন চালাচ্ছেন। বর্তমানে ঢাকা টু মঠখোলা (কিশোরগঞ্জ, পাকুন্দিয়া) রুটে মনোহরদী পরিবহনের বাস চালান তিনি। কথা হলে চালক আখিল ঢাকা মেইলকে বলেন, তার বউ-সন্তান আছে। ছেলে পড়াশোনা করছে। নিজের কোনো ঘড়বাড়ি বা সহায় সম্পদ বলতে কিছুই নেই।
‘প্রতি টিপে ৩০০ টাকা বেতন পাই। বেশি দিনই দুই টিপের বেশি দিতে পারি না। কোনো কোনোদিন তিন টিপ হয়। এতে যে টাকা পাওয়া যায় তা দিয়ে সংসার চলানো যায় না। এর মধ্যে রাস্তায় খাওয়াসহ টুকটাক অনেক খরচ আছে। তার ওপর মাসে ১৫ দিন গাড়ি চালাতে পারি। নিজের পরিস্থিতিই যদি এমন হয় তাহলে মাথা কীভাবে ঠিক থাকে? কাজ (ড্রাইভিং) শিখছি, তাই অন্য কাজেও মন বসে না। কম টাকায় কষ্ট করে জীবন চালাচ্ছি।'
চালকদের কষ্টের গল্প আলাদা আলাদা, তাদের মানসিক চাপ সবারই প্রায় একই। বাসচালক জলিল করী (৪৩) বাড়ি নরসিংদীর শিবপুরে। দুই ছেলের একজন ক্লাস ওয়ান ও অন্যজন এইচএসসিতে (শহীদ আসাদ কলেজ) পড়ে। জলিল বলেন, ‘সংসারের যে খরচ তা মেটাতে মাসের ২০ দিন টানা বাস চালাই। পারিবারিক চাপ, রাস্তাঘাটের চাপ- সব মিলিয়ে একটা কঠিন সময়ের মধ্যে থাকতে হয়।’
‘আমার দেখা, প্রায় ড্রাইভারই অভাব অনটন আছেন। প্রত্যেকেই নানামুখি চাপে থাকেন। আসলে চালকদের মানসিকভাবে স্বাভাবিক থাকাটাই কঠিন’, বলেন এই চালক।
বেশ কয়েকজন চালকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের কাজের মূল্যায়ন, সম্মান, বেতন-ভাতাসহ বিশৃঙ্খল পরিবেশের কারণেই তাদের মন মানসিকতায় নৈতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
নাম প্রকাশ না করে অনেক চালক এটাও বলছেন, পরিবহন খাতে মাদকের বিস্তার চরম পর্যায়ে। অনেক চালক মাদকসেবী। অনেক চালকের বেপরোয়া মানসিকতার এটি বড় কারণ।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) তথ্য বলছে, গত ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা ৬৫ লাখ ৯৪ হাজার ৩২০টি। এরমধ্যে বাস রয়েছে ৫৭ হাজার ৭৩০টি। কত নিবন্ধিত চালক রয়েছেন সেই হিসাব পাওয়া যায়নি। তবে ৭০ লাখের মতো নিবন্ধিত চালক রয়েছেন বলে বিআরটিএ সূত্র জানায়।
সড়ক এখন রীতিমতো মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিনই ঝরছে বহু প্রাণ। বিগত ঈদুল ফিতরেও শত শত মানুষের প্রাণ ঝরেছে সড়কে।
সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলোর বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, দুর্ঘটনার বড় কারণ চালকদের বেপরোয়া গতি এবং মনোভাব।
চালকের বেপরোয়া মনোভাবে দুর্ঘটনার ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) এক গবেষণায়। দুর্ঘটনার কারণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে বুয়েটের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউট (এআরআই)।
ইনস্টিটিউটি ১৮ বছরের (১৯৯৮-১৫) দুর্ঘটনা বিশ্লেষণ করে চালকের মনোভাবে কতটা দায়ী তা তুলে ধরেছে। বিশ্লেষণ বলছে, শুধু অতিরিক্ত গতির কারণেই ৫৩ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে। যানবাহনের অতিরিক্ত গতির কারণ চালকের বেপরোয়া মন মানসিকতা।
আবার একই বিশ্লেষণে সরাসরি চালকের বেপরোয়া মনোভাবে ৩৭ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে উঠে এসেছে। অর্থাৎ, ৯০ শতাংশ দুর্ঘটনার জন্যই চালকের বেপরোয়া মানসিকতা দায়ী বলে এআরআই তুলে ধরেছে।
দুর্ঘটনার জন্য সাধারণত চালককেই দায়ী করা হয়। কিন্তু সব দোষ চালকের ওপর বর্তানো ঠিক নয় বলে মনে করেন পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক ড. শামসুল হক।
বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক এই পরিচালক ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘চালকরা এমনিতেই পারিবারিক বিভিন্ন চাপে থাকেন। তাছাড়া ঠিকঠাক বেতন পান না, মালিকরাও তাদের বেতন-ভাতা ও সুবিধা নিয়ে হেলাফেলা করেন। মালিকরা তাদের ওপর কাজ চাপিয়ে দেন। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, অতিরিক্ত সময় টানা গাড়ি চালান। অনেকে ক্লান্তি-অবসাদ কাটাতে মাদকাসক্তও হয়ে পড়েন। নানাবিধ কারণে চালকরা হতাশাগ্রস্ত। তারা মানসিকভাবে বেপরোয়া হয়ে পড়েন।’
এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘দেখা যায় একেকটা রুটে বহু কোম্পানির গাড়ি নামাচ্ছেন কোম্পানিগুলো। ফলে মুনাফার জন্য বাস মালিকরা প্রতিযোগিতায় নামেন। যার বলি হন চালকরা। তারা নিজেদের স্বাস্থ্যের দিকেও খেয়াল রাখতে পারেন না। তাদের ন্যূনতম বিশ্রাম নেওয়ার অবকাশ নেই।’
এই পরিবহন বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, ‘চালকদের মানসিকতা ঠিক করতে হলে প্রথমত আমাদের সিস্টেমের পরিবর্তন আনতে হবে। একজন চালক টানা দীর্ঘক্ষণ গাড়ি চালাচ্ছেন, এগুলো নিয়মতান্ত্রিক করতে হবে। চালকদের বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য বিষয়গুলো শৃঙ্খলার মধ্যে আনা গেলে বেপরোয়া মনোভাব রোধ করা সম্ভব।’
রোড সেফটি ফাউন্ডেশন নামের একটি বেসরকারি সংস্থার নির্বাহী পরিচালক হিসেবে কাজ করছেন সাইদুর রহমান। তিনি ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘চালকের বেপোরোয়া মনোভাবের কারণ মালিক পক্ষ ও সরকার সংশ্লিষ্টদের। কর্তৃপক্ষ ঠিক হলে, সচেষ্ট হলে চালকরা ঠিক না হয়ে যাবে কোথায়?’
সাইদুর রহমান বলেন, ‘চালকদের মানসিকতা ইতিবাচক করতে হলে প্রথমেই তাদের বেতন, কর্মঘণ্টা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে। এই পেশায় যারা যুক্ত হবেন তাদের দক্ষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। তবেই নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করা সম্ভব।’
যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘মালিকপক্ষ এবং শ্রমিক ফেডারেশনের প্রভাবের কারণে চালকরা তাদের অধিকার থেকে যেমন বঞ্চিত হচ্ছেন, তেমনি তারা অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নামছেন। এ বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে সমাধান করতে হবে। খোঁজ নিয়ে দেখুন, একজন চালক টানা কত ঘণ্টা গাড়ি চালান। যদি এত ঘণ্টা গাড়িই চালান, তাহলে তারা কীভাবে মানসিকভাবে ঠিক থাকবেন? তাদের অধিকার আগে নিশ্চিত করা হোক আর প্রতিযোগতায় নামতে চাপে না ফেলা হোক, তবেই তাদের বেপোরোয়া হওয়ার সুযোগ থাকবে না।’
বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) জানায়, তারা পেশাজীবী গাড়ি চালকদের পেশাগত দক্ষতা ও সচেতনতা বৃদ্ধিমূলক ‘রিফ্রেশার্স প্রশিক্ষণ’ দিচ্ছে। অতিরিক্ত গতির বিরুদ্ধে পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ অভিযান চালাচ্ছে।
এদিকে যানবাহনের গতি ও চালকদের নজরদারিতে রাখতে সব পরিবহনে জিপিএস সিস্টেম চালুর নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সম্প্রতি (২৯ মার্চ) সড়ক দুর্ঘটনা রোধ ও সড়কে সার্বিক নিরাপত্তা বৃদ্ধিতে কার্যকর পদক্ষেপ নির্ধারণে উচ্চপর্যায়ের এক সভায় ওই সিদ্ধান্ত হয়। পরে বিষয়টি গণমাধ্যমকে জানান নৌপরিবহন, সড়ক ও সেতু এবং রেলপথ মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।
মন্ত্রী রবিউল বলেন, ‘জিপিএস সিস্টেম চালু হলে পরিবহনগুলো নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে। বাসগুলোর স্পিড, ট্রাফিকসহ সবকিছুই জিপিএসের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা হবে।’
সড়ক পরিবহন মালিক শ্রমিক সংগঠনের প্রধান সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস এমপি বলেন, ‘পরিবহন মালিক পক্ষ ও শ্রমিক পক্ষের সম্মতিতেই জিপিএস চালুর সিদ্ধান্ত হয়েছে।’
জিপিএস সিস্টেমের মাধ্যমে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি ব্যাখ্যা করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ভারপ্রাপ্ত কমিশনার (অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার) মো. সরওয়ার বলেন, ‘জিপিএস সিস্টেম চালু হলে আমরা পরিবহনগুলো নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে। ধরুন, কোনো গাড়ির ঢাকায় প্রবেশ করার পারমিট নেই। এখন ওই গাড়ি নিয়ে চালক ঢাকায় ঢুকলেই মামলা হবে। চালক ওভার স্পিড করলেই জিপিএসে ধরা পড়বে, আমরা ব্যবস্থা নিতে পারবো।’
এদিকে, পেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে চালকদের ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক। তবে পরবর্তী সময়ে চালকরা মাদকাসক্ত হচ্ছে কি না সে বিষয়ে কোনো তৎপরতা নেই। এ ব্যাপারে নজরদারি বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
এএম/জেবি