মোস্তাফিজুর রহমান
০৫ এপ্রিল ২০২৬, ১১:২৪ এএম
দেশে সড়ক, নৌ ও রেলপথের দুর্ঘটনা ও নিহতের সংখ্যা নিয়ে একেক সংস্থা একেক রকম তথ্য সরবরাহ করে আসছে। দেখা যাচ্ছে সরকারি সংস্থার সঙ্গে বেসরকারি সংস্থার তথ্যের বিস্তর ফারাক। এতে জনমনে বিভ্রান্তি দেখা দিচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে, প্রকৃত দুর্ঘটনা ও নিহতের সংখ্যা আসলেই কত বা সংস্থাগুলোর তথ্যে গরমিল কেন?
সরকার বলছে, তারা নিজস্ব সোর্স থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান তৈরি করছে। তবে বেসরকারি সংস্থাগুলো বলছে, সেকেন্ডারি সোর্সের ভিত্তিতে দুর্ঘটনার প্রতিবেদন তৈরি করা হয়।
নিজেদের পরিসংখ্যানে অটুট থাকার পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থার প্রতিবেদনে দ্বিমত আছে সরকার সংশ্লিষ্টদের। তবে বেসরকারি সংস্থাগুলো বলছে, প্রকাশিত হওয়া কোনো পরিসংখ্যানই সঠিক নয়। তাদের ভাষ্য, প্রকৃত সংখ্যা আরও বহুগুণ বেশি।
সড়ক, নৌ ও রেলপথের দুর্ঘটনায় নিহত ও আহতের সংখ্যা মাসিক ও বার্ষিক প্রতিবেদন আকারে প্রকাশ করে আসছে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা। বিশেষ করে ঈদযাত্রাকে ঘিরে দুর্ঘটনার চিত্র বেশ গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করে সংস্থাগুলো। সরকারও তাদের প্রাপ্ত তথ্য প্রকাশ করে। কিন্তু বরাবরই সরকারি ও বেসরকারি ভিন্ন ভিন্ন তথ্যের কারণে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ায়।
বিগত ঈদেও একই পরিস্থিতি দেখা গেছে। গত ২৯ মার্চ সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ঈদযাত্রায় নৌ, সড়ক ও রেলপথ মিলে মোট ১৭০ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে মহাসড়কে ৪৭ জন। নৌপথে ২৮ জন ও রেলপথে ১৭ জন নিহত হন। আর বাকিরা এলজিআইডিসহ সাধারণ রুটে নিহত।
যদিও সরকারি তথ্য প্রকাশের একদিন পর গত ৩০ মার্চ এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি জানায়, ঈদযাত্রায় সব পথ মিলে মোট ৩৭৭ দুর্ঘটনায় ৩৯৪ জন নিহত হয়েছেন। এরমধ্যে ৩৪৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৫১ জন নিহত হন। আর রেলপথে ২৩টি দুর্ঘটনায় ৩৫ জন নিহত এবং নৌ-পথে ৮টি দুর্ঘটনায় ৮ জন নিহত এবং ৩ জন নিখোঁজ হয়েছেন।
সরকারের পক্ষ থেকে দুর্ঘটনা ও নিহতের সংখ্যা কমার দাবি করলেও যাত্রী কল্যাণ সমিতির পরিসংখ্যান বলছে, বিগত সময়ের তুলনায় এবার ঈদে সড়ক দুর্ঘটনা বেড়েছে ৮ দশমিক ৯৫ শতাংশ, প্রাণহানি ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ এবং আহত ২১ দশমিক ০৫ শতাংশ।
এদিকে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন নামের একটি বেসরকারি সংস্থাও ঈদযাত্রার প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সংস্থাটির পরিসংখ্যান বলছে, ঈদযাত্রায় সব পথ মিলে ৪১৩টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে ৩৪৮ জন নিহত হয়েছেন।
সংস্থাটির তথ্য বলছে, ৩৭৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৯৮ জন নিহত হন। ১১টি নৌ-পথ দুর্ঘটনায় ৯ জন নিহত ও ২ জন নিখোঁজ এবং ২৯টি রেলপথ দুর্ঘটনায় ৪১ জন নিহত হয়েছেন।
ঈদযাত্রা পরবর্তী এক সভা শেষে গত রোববার (২৯ মার্চ) নৌপরিবহন, সড়ক ও সেতু এবং রেলপথ মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেন, সড়ক দুর্ঘটনা এবার কমেছে। তিনি এও বলেন, বেসরকারি সংস্থাগুলো নিহতের যে পরিসংখ্যান দেন সেটির সঙ্গে তার দ্বিমত হবে। মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা বিআরটিএ, রোড সেফটি ও হাইওয়ে অথরিটি সবমিলিয়ে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিকভাবে তথ্য উপাত্ত কালেক্ট করি। সেখানে এবার মৃত্যুর সংখ্যা হচ্ছে নৌ সড়ক ও রেলপথে ১৭০ জন নিহত হয়েছেন। আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি, এটা বলা ঠিক হবে না। নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এবার কম হয়েছে। আগামীতে আরও কম হবে।’
তবে মন্ত্রীর দেওয়া তথ্যের সঙ্গে নিজের পরিসংখ্যানের মিল না থাকার বিষয়ে যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘আসলে আমাদেরটাও সঠিক নয়, মন্ত্রী মহোদয়েরটাও সঠিক নয়। আমরা সেকেন্ডারি সোর্স ব্যবহার করছি।’
মোজাম্মেল হক বলেন, ‘মন্ত্রী মহোদয় ওনারটার ব্যাখ্যা দেবেন। আমি আমারটার ব্যাখ্যা দিচ্ছি। আমি ওনারটার সাথে ডিফার করছি না। আমরা সেকেন্ডারি সোর্স থেকে যা পাচ্ছি তাই দিচ্ছি। এটা প্রাইমারি সোর্স নয়।’

‘আমরা মূলত গণমাধ্যমের সংবাদ থেকে নিচ্ছি। গণমাধ্যমে সব তথ্য আসে না। আবার যেটুকু আসে সেটুকুও পূর্ণাঙ্গ আসে না। আমরা যেটুকু বলছি। বাস্তবে এরচেয়ে কয়েক গুণ বেশি হচ্ছে’, যোগ করেন তিনি।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমানও বলেন, কিছু নিজস্ব তথ্য ছাড়া সেকেন্ডারি সোর্সের ওপর ভিত্তি করেই দুর্ঘটনার প্রতিবেদন তৈরি করেন। ‘আমরা ৯টি জাতীয় দৈনিক, ১৭টি জাতীয় ও আঞ্চলিক অনলাইন নিউজপোর্টাল, ইলেক্ট্রনিক গণমাধ্যম এবং নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে পরিসংখ্যান তৈরি করি। তবে এর বাইরেও অনেক দুর্ঘটনা ঘটছে, কিন্তু সেগুলো পরিসংখ্যানে আসে না’ বলেন তিনি।
দেশে সরকারি-বেসরকারি মিলে ৪ হাজারের মতো হাসপাতাল আছে। দুর্ঘটনায় আহত হয়ে হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা নেন। কিন্তু সেসব হাসপাতালের তথ্য অগোচরে থাকছে।
সড়ক বা অন্যান্য পথের দুর্ঘটনার গভীরতা বোঝাতে একটি সরকারি হাসপাতালের তথ্য সামনে এনেছে যাত্রী কলাণ সমিতি। সংস্থাটি বলছে, ১৪ মার্চ থেকে শুরুর পর ২৮ মার্চ ঈদযাত্রার শেষ সময় পর্যন্ত জাতীয় অর্থপেডিক (পঙ্গু) হাসপাতালে শুধু সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে ২১৭৮ জন ভর্তি হয়েছেন।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনও বলছে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও পঙ্গু হাসপাতালে ২ হাজারের বেশি সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে ভর্তি হয়েছেন।
সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘সরকার আমাদের হিসাব মানছে না, মানতে চায় না। এটা তো সেকেন্ডারি সোর্সের। কিন্তু আমরা যে তথ্যটা সরকারকে বোঝাতে চাই, দেশের মানুষকে সচেতন করতে চাই। আসলে ঘটনার গভীরতা কতটুকু।’
‘দেখুন, দেশে এত হাসপাতাল আছে। শুধু একটা হাসপাতালে দেখতে পাচ্ছি, ঈদযাত্রার সময় ২ হাজারের বেশি মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে ভর্তি হয়েছেন। তাহলে সারাদেশে দুর্ঘটনায় হতাহতের চিত্র কেমন হবে?’, প্রশ্ন তোলেন মোজাম্মেল।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব বলেন, ‘গণমাধ্যমে যা আসছে তার চেয়ে আসলে অনেক বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাহলে বুঝুন, ঘটনার গভীরতা আরও অনেক বেশি।’
‘এটা তো জাতিসংঘও বলছে, তোমরা যা তথ্য-উপাত্ত দিচ্ছো, তোমাদের এটা আর মূল ঘটনা আকাশ-পাতাল ফারাক’, যোগ করেন তিনি।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব আরও বলেন, ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) আমাদেরটা (প্রতিবেদন) বিশ্বাস করে না। কারণও আছে। এবারের ঈদযাত্রায় দেখুন, শুধু পঙ্গু হাসপাতাল ধরে আমরা যদি সড়ক দুর্ঘটনা হিসাব করি তাহলে ১৪০০ মতো পাচ্ছি। আর বাংলাদেশে হাসপাতাল আছে চার হাজার। যে কারণে বিশ্বাস করছে না।’
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, ‘সব হাসপাতালের তথ্য হিসাব করলে দুর্ঘটনার ভয়াবহ চিত্র উঠে আসবে।’
এএম/জেবি