জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
৩১ মার্চ ২০২৬, ০৮:১১ এএম
জ্বালানি তেলের নতুন দাম ঘোষণার আগাম খবরে রাজধানীজুড়ে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। সোমবার রাত থেকেই পেট্রোল পাম্পগুলোতে ভিড় বাড়তে থাকে, তবে অধিকাংশ পাম্পে ‘তেল নেই’ নোটিশ ঝুলিয়ে দেওয়ায় ভোগান্তিতে পড়েছেন চালকরা। কোথাও কোথাও লাইনে অপেক্ষা করেও জ্বালানি না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন তারা।
মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) ভোর থেকে রাজধানীর তেজগাঁও, বাড্ডা, গুলশান ও রমনা এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, এসব এলাকার বেশিরভাগ তেলের পাম্প বন্ধ। দু-একটি পাম্প খোলা থাকলেও ‘অকটেন ও পেট্রোল শেষ’ বলে চালকদের ফিরিয়ে দিচ্ছেন পাম্প অপারেটররা।
তাদের দাবি, ডিপো থেকে সরবরাহ কম থাকায় তাদের কাছে জ্বালানি মজুত নেই। তবে অপেক্ষমাণ চালকদের অভিযোগ ভিন্ন। তাদের দাবি, তেলের দাম বাড়ার খবরে বেশি মুনাফার আশায় পাম্প মালিকরা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে তেল মজুত করে রেখেছেন।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্বব্যাপী অস্থির হয়ে উঠেছে তেলের বাজার। বাদ যায়নি বাংলাদেশও। তেল সংকটের আতঙ্কে প্রায় এক মাস ধরেই দেশের ফিলিং স্টেশনগুলোতে লম্বা লাইন দেখা যাচ্ছে। অনেক ফিলিং স্টেশনে ‘তেল নেই’ লেখা ব্যানার ঝুলিয়ে রাখতেও দেখা যায়। আবার ‘তেল নেই’ লেখা পাম্পে বিপুল মজুত পাওয়ার খবরও এসেছে গণমাধ্যমে।
এমন পরিস্থিতিতে গত শনিবার সরকারি দল বিএনপির সংসদীয় দলের বৈঠকে দেশের জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। ওই বৈঠক শেষে চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম বলেছিলেন, সংসদ সদস্যদের মাধ্যমে দেশবাসীকে জ্বালানি পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
তিনি বলেছিলেন, কোথাও যাতে তেলের দাম না বাড়ে এবং অস্থিরতা তৈরি না হয়, সেজন্য জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় রেখে সংসদ সদস্যদের নজর রাখতে বলা হয়েছে।

গতকাল জাতীয় সংসদে ৩০০ বিধিতে দেওয়া এক বিবৃতিতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ লাইন ‘সরবরাহ সংকটের চিত্র নয়’; বরং অতিরিক্ত কেনা ও মজুত করার প্রবণতাই এখন বড় সমস্যা।
বিবৃতিতে টুকু বলেন, বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতা, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা, বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে চাপে ফেলেছে। এর প্রভাব বাংলাদেশেও এসেছে। তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে সরকার আগাম প্রস্তুতি নিয়েছে এবং সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে কাজ করছে।
মন্ত্রী বলেন, এ পর্যন্ত বাংলাদেশের জ্বালানির কোনো ঘাটতি নাই। বরং আমরা গত বছরের তুলনায় সরবরাহ আরো বৃদ্ধি করেছি। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান সরকার ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেওয়ার দিন দেশে ডিজেলের মজুত ছিল ২ লাখ ৬ হাজার মেট্রিক টন। ৩০ মার্চ তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ১৮ হাজার মেট্রিক টনে। ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৯ মার্চ পর্যন্ত ৪১ দিনে ৪ লাখ ৮২ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল বিক্রি হয়েছে।
একই দিন সচিবালয়ে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের মুখপাত্র মনির হোসেন চৌধুরী জানান, বিশ্ববাজারের সঙ্গে সমন্বয় রেখে প্রতিমাসের মতো মঙ্গলবার জ্বালানি তেলের নতুন দাম ঘোষণা করা হবে। তিনি বলেন, ৩০ মার্চ পর্যন্ত সরকারের কাছে ১ লাখ ৩৩ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল মজুত রয়েছে এবং এপ্রিল মাসে আরও প্রায় দেড় লাখ মেট্রিক টন ডিজেল দেশে আসবে। ফলে আগামী মাসেও জ্বালানি সংকটের কোনো আশঙ্কা নেই।
জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের এ তথ্য প্রকাশের পর তেলের দাম বাড়তে পারে-এমন আশঙ্কায় পাম্পগুলোতে ভিড় বাড়তে থাকে। অনেক পাম্পে ‘তেল নেই’ নোটিশ ঝুলতে দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেন চালকেরা।

শাহবাগের মেঘনা মডেল পাম্পটি নিয়মিত তেল সরবরাহ করে থাকে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে পাম্পটি প্রতিদিন সকাল সাতটা থেকে কার্যক্রম শুরু করলেও আজ সকাল সাতটা ১০ মিনিটে গিয়ে দেখা যায় গেট বন্ধ। তখন পাম্পটির বাইরে শত শত যানবাহন অপেক্ষমাণ। তবে পাম্পের নিরাপত্তা প্রহরী জানিয়েছেন, সকাল আটটা থেকে জ্বালানি সরবরাহ শুরু হবে। তেল নিয়ে অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে সেখানে অনেক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
তেলের জন্য সেখানে অপেক্ষায় থাকা বেসরকারি চাকরিজীবী আফজালুল করীম বলেন, ‘গতকালই মোটরবাইকের তেল শেষ হয়েছে, এখন রিজার্ভে চলছে। ভোরে উঠে বেশ কয়েকটি এলাকা ঘুরে সব পাম্প বন্ধ পেয়ে শাহবাগে এসেছি। শুনেছিলাম এই পাম্প সাতটায় খোলে, কিন্তু পৌনে আটটা বাজলেও এখনো খোলার নাম নেই। কখন তেল নেব আর কখন অফিস যাব, কিছুই বুঝতে পারছি না।’
একই স্থানে অপেক্ষমাণ পুরান ঢাকার ব্যবসায়ী নিয়ন মতিউর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘বাসার আশপাশের সব পাম্প বন্ধ পেয়ে এখানে এসেছি। আজ থেকে দাম বাড়বে শুনেই হয়তো পাম্পগুলো এমন তালবাহানা শুরু করেছে।’
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দাম নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা না থাকলে এবং তদারকি জোরদার না করলে এমন অস্থিরতা জনভোগান্তি আরও বাড়িয়ে দেবে।
এজেড/এমআর