জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
২৭ মার্চ ২০২৬, ০৯:১১ পিএম
তেলের সংকট নেই, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে— এমন আশ্বাস দেওয়া হলেও রাজধানীর পাম্পগুলোতে জ্বালানি তেলের সংকট এখনো কাটেনি।
শুক্রবার (২৭ মার্চ) ছুটির দিনেও সকাল থেকেই পাম্পে পাম্পে দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। দুপুর গড়াতে কোথাও কোথাও জ্বালানি সংগ্রহের লাইনের কারণে শহরে যানজটের ঘটনাও ঘটেছে।
পাম্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তারা সরকারি ডিপো থেকেই চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি তেল সংগ্রহ করতে পারছেন না। কারও কারও দাবি, চাহিদার তিন ভাগের এক ভাগ তেলও পাচ্ছেন না। এ কারণে গ্রাহকদের সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
পাম্প সংশ্লিষ্টদের অনেকেই বলছেন, প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেল সংগ্রহে তাদের পক্ষ থেকে কোনো ঘাটতি রাখা হচ্ছে না। কিন্তু ডিপো থেকেই কম সরবরাহ করা হচ্ছে। এ কারণেই সংকট তৈরি হচ্ছে।
রাজধানীর রাজারবাগের রহমান ট্রেডার্স নামের একটি ফিলিং স্টেশনে দৈনিক তিন ট্যাঙ্কার অকটেনের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে পাম্পটি পাচ্ছে মাত্র এক ট্যাঙ্কার বলে জানিয়েছেন হিসাবরক্ষক মোজাম্মেল।
আরও পড়ুন: অবৈধ তেল কারবারিদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে প্রশাসন
তিনি বলেন, ‘আমাদের এখান থেকে অনেক জ্বালানি তেল সংগ্রহ করে পুলিশ। সাধারণ মানুষেরও চাহিদা বেশি। স্বাভাবিক সময়ে আমাদের তিন গাড়ি (ট্যাঙ্কার) অকটেন লাগে। এখন যেভাবে গ্রাহক আসছেন, তাতে চার থেকে পাঁচ গাড়ির চাহিদা রয়েছে। কিন্তু আমরা পাচ্ছি মাত্র এক গাড়ি। তাহলে কীভাবে তেল দেব?’
মোজাম্মেল আরও বলেন, ‘আমাদের চেষ্টার কোনো ত্রুটি নেই। মূলত ডিপো থেকেই প্রয়োজন অনুযায়ী তেল পাচ্ছি না, তাই চাহিদা মেটাতে পারছি না।’
রহমান ট্রেডার্সের অপারেটর ফয়সালও একই কথা বলেন। তিনি জানান, ‘আজ ছুটির দিন হওয়ায় দুপুর পর্যন্ত অকটেন দিতে পারছি। অন্য দিন হলে যে পরিমাণ অকটেন এসেছে, তা সকালেই শেষ হয়ে যেত।’
রাজধানীর একাধিক পাম্প সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেও ডিপো থেকে চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি তেল না পাওয়ার বিষয়টি জানা গেছে।
তাদের অভিযোগ, সরকারি ডিপো থেকে পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় এই সংকট তৈরি হয়েছে। তবে প্রয়োজন অনুযায়ী তেল পেলে এমন পরিস্থিতি হতো না বলেও তারা জানান।
ঢাকার একটি পাম্পের দায়িত্বশীল এক কর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আগে ডিপো থেকে চাহিদার বাইরে গিয়েও তেল সংগ্রহ করা যেত। কিন্তু এখন প্রয়োজনীয় তেল সংগ্রহেই হিমশিম খেতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘অন্য সময় যত প্রয়োজন, ততই পাওয়া যেত। ডিপোতে গাড়ি পাঠালেই তেল সংগ্রহ করে আনা হতো। প্রক্রিয়াটিও সহজ ছিল। কিন্তু সংকট তৈরি হওয়ার পর থেকে পরিস্থিতি দিন দিন জটিল হচ্ছে। ডিপো থেকে তেল না ছাড়লে পাম্পে তো ঘাটতি হবেই।’
সরকারি তেল সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল আরেকটি পাম্পের দায়িত্বশীল এক কর্মী বলেন, ‘আমরা নানা ভাবে তদবির করেও চাহিদা অনুযায়ী তেল পাচ্ছি না।’
তিনি আরও বলেন, ‘অনেক কাটছাঁট করে যেসব টোকেন (সরকারি প্রতিষ্ঠানের যানবাহনের তেলের চাহিদার তালিকা) পাঠানো হচ্ছে, সেটি দিতেও আমাদের কষ্ট হচ্ছে। সাধারণ গ্রাহকদেরও কিছু কিছু দিয়ে বিদায় করতে হচ্ছে।’
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। যুদ্ধের আশঙ্কায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে দেশে জ্বালানি তেলের সংকটের আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।
আরও পড়ুন: জ্বালানি তেল মজুতের তথ্যদাতাকে পুরস্কৃত করবে সরকার
যদিও শুরু থেকেই সরকার বলে আসছে, জ্বালানি তেলের কোনো ঘাটতি নেই। মূলত অনেক গ্রাহক প্রয়োজনের চেয়ে বেশি জ্বালানি সংগ্রহ করায় জটিলতা তৈরি হয়েছে।
এ কারণে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে গত ৬ মার্চ থেকে পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেল বিক্রিতে সীমা নির্ধারণ করা হয়।
পরে ঈদ সামনে রেখে গত ১৪ মার্চ পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেল বিক্রিতে রেশনিং ব্যবস্থা তুলে নেয় সরকার।
তবে দেশের ফিলিং স্টেশনগুলোতে এখনো পর্যাপ্ত তেল সংগ্রহ করতে পারছেন না গ্রাহকেরা। প্রায় সব সময়ই পাম্পে দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে।
বিশেষ করে ঈদুল ফিতরের পর থেকে জ্বালানি সংগ্রহে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন গ্রাহকেরা। দীর্ঘ লাইনের পর ডিজেল ও পেট্রোল কিছুটা পাওয়া গেলেও অকটেনের সংকট তীব্র।
অবশ্য সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ঈদের ছুটি ও ব্যাংক বন্ধ থাকায় পে-অর্ডার করতে না পারায় ডিপো থেকে জ্বালানি তেল সরবরাহে সমস্যা তৈরি হয়েছিল। এ কারণে ঈদের পর পাম্পগুলোতে সংকট দেখা দেয়।
গত মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ সাংবাদিকদের বলেন, ডিপোগুলোতে পর্যাপ্ত তেল রয়েছে।
তিনি গ্রাহকদের আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানান এবং বলেন, পাম্পে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানোর প্রয়োজন নেই। শিগগিরই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে।
পাম্প সংশ্লিষ্টরাও আশা করেছিলেন, ঈদের পর ব্যাংক খোলার দুই–এক দিনের মধ্যেই সংকট কেটে যাবে। তবে ব্যাংক খোলার পর বুধবার, বৃহস্পতিবার ও শুক্রবারও পাম্পে গ্রাহকদের ভোগান্তি অব্যাহত রয়েছে।
এএম/এআর