images

জাতীয়

বাসডুবির ঘটনায় বেঁচে যাওয়া যাত্রীর মুখে লোমহর্ষক বর্ণনা!

ঢাকা মেইল ডেস্ক

২৬ মার্চ ২০২৬, ০৫:৪০ পিএম

‘বাস পানিতে পড়ার পর জানালা ধরে বের হওয়ার চেষ্টা করছিলাম। বাসের ভেতরে নিচের দিক থেকে পানি ঢুকে যে স্রোত তৈরি হয়েছে, তার সাথেই আমি ভেসে যাই। কীভাবে যে বের হইছি, ওপরওয়ালা জানে।’

এভাবেই বলছিলেন রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে পদ্মা নদীতে ডুবে যাওয়া বাস থেকে বেঁচে যাওয়া যাত্রীদের একজন মোহাম্মদ রাজীব সরদার।

গোয়ালন্দের জামলতা এলাকা থেকে দুর্ঘটনা কবলিত বাসটিতে উঠেছিলেন তিনি। বাসের একেবারে পেছনের দিকের একটি আসনে বসেছিলেন।

দুর্ঘটনা কবলিত বাসটির সব আসনেই যাত্রী ছিল বলে জানান সরদার। দৌলতদিয়া ফেরিঘাটের জিরো পয়েন্ট, অর্থাৎ যেখানে যানবাহনগুলো ফেরির জন্য অপেক্ষা করে, সেখান থেকেও দুই যাত্রী ওই বাসে উঠেছিলেন।

picture

তিনি জানান, ফেরিতে উঠতে গিয়ে শেষ মুহূর্তে জায়গা না পাওয়ায় পন্টুনের সামনেই পরবর্তী ফেরির জন্য অপেক্ষা করছিল কুমারখালি থেকে ঢাকাগামী বাসটি। জানালা দিয়ে পরের ফেরিটি ঘাটেও ভিড়তে দেখেছিলেন তিনি।

কিন্তু কী যে হলো, কিছুই বুঝিনি। বাসটা হঠাৎ টান দিয়ে নদীতে পড়ে গেল, আমার গায়ের ওপর আরও কয়েকজন ছিল, আমি অনেক চেষ্টা করেও তাদের সরাতে পারছিলাম না, বলেন সরদার।

মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনায় বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত নারী ও শিশুসহ ২৬ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে রাজবাড়ি জেলা প্রশাসন।

আরও পড়ুন: দৌলতদিয়া ট্র্যাজেডি: ২০ মরদেহের পরিচয় শনাক্ত, ১৫টি হস্তান্তর

নিহতদের পরিচয় শনাক্ত করে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক সুলতানা আক্তার।

এই দুর্ঘটনায় নিহতদের বেশিরভাগই বাড়ি কুষ্টিয়ার কুমারখালী ও রাজবাড়ী জেলার বিভিন্ন এলাকায়। আকস্মিক এই দুর্ঘটনায় শোকের আবহ বিরাজ করছে নিহতদের পরিবারে।

বৃহস্পতিবার সকালেই জেলা প্রশাসন নিহত অনেকের মরদেহ তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেছে।

ফেরিঘাটে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মার পানিতে ডুবে যাওয়া বাসে থাকা যাত্রীদের বেশিরভাগই ঈদের ছুটি শেষে ঢাকায় ফিরছিলেন। হঠাৎ এই দুর্ঘটনায় তাদের পরিবারে শোকের মাতম চলছে।

বৃহস্পতিবার সকালে প্রিয়জনের মরদেহ নিতে এসে রাজবাড়ী সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে আহাজারি করছিলেন সাভারের পোশাক শ্রমিক আব্দুল আজিজ।

তিনিও দুর্ঘটনা কবলিত বাস থেকে বেঁচে যাওয়া যাত্রীদের একজন। নিজে বেঁচে ফিরলেও সঙ্গে থাকা তিন স্বজনকে হারিয়েছেন তিনি।

আজিজ বললেন, ঈদের ছুটি শেষে গর্ভবতী স্ত্রী নাজমিরা বেগম, ছয় বছরের শিশু আব্দুর রহমান ও খালা শাশুড়ি নাসিমা বেগমকে নিয়ে ঢাকায় ফিরছিলেন। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বাসে উঠেছিলেন রাজবাড়ির কালুখালি থেকে।

picture

দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে ডুবে যাওয়া বাস থেকে নিজে কোনো রকমে বের হতে পারলেও পরিবারের অন্য সদস্যরা নিখোঁজ হন।

এই দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে রাজবাড়ির কালুখালি কালিকাপুর এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ উজ্জ্বলের। পরিবারের সঙ্গে ঈদ উদযাপন শেষে ঢাকায় ফিরছিলেন এই ব্যবসায়ী।

বৃহস্পতিবার সকালেও দৌলতদিয়া ফেরিঘাটের দুর্ঘটনাস্থলে তাকে খুঁজছিলেন উজ্জ্বলের বাবা। পরে জানতে পারেন রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে রয়েছে তার মরদেহ।

সকাল থেকেই রাজবাড়ী সদর হাসপাতালজুড়ে শোকের আবহ বিরাজ করছিল। মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনায় বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত উদ্ধার হওয়া ২৬ মরদেহের ২২টি তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

বাকিগুলোর পরিচয় শনাক্ত করে পরিবারের কাছে বুঝিয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে জেলা প্রশাসন।

এদিকে বৃহস্পতিবার সকালেও দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রেখেছেন ফায়ার সার্ভিস ও কোস্টগার্ডসহ উদ্ধারকর্মীরা।

রাজবাড়ির জেলা প্রশাসক সুলতানা আক্তার বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকালেও তিনজনের মরদেহ উদ্ধার হয়েছে।

সবশেষ উদ্ধার হওয়া তিনটি মরদেহের পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা চলছে। তাদেরও পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

নিহত একজনের স্বজনরা দিনাজপুর থেকে রওয়ানা দিয়েছেন। তারা এলেই মরদেহ বুঝিয়ে দেওয়া হবে, বিবিসি বাংলাকে জানান জেলা প্রশাসক।

picture

এই দুর্ঘটনায় আর কেউ নিখোঁজ রয়েছেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে মি. আক্তার বলেন, নিখোঁজ রয়েছেন এমন দাবি কারও স্বজন বা কেউ আমাদের কাছে করেননি। তবে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকবে।

বুধবার বিকেলে দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে দুর্ঘটনা কবলিত সৌহার্দ্য পরিবহনের যাত্রীবাহী বাসটি ছয় ঘণ্টারও বেশি সময় পর উদ্ধার করা হয়।

আরও পড়ুন: বাসডুবি: নিহতদের পরিবারকে ১ কোটি টাকা করে ক্ষতিপূরণ দিতে আইনি নোটিশ

স্থানীয় গণমাধ্যম কর্মী মিঠুন গোস্বামী জানান, উদ্ধার অভিযানের পর থেকেই একে একে মরদেহ তুলে আনা হচ্ছিল। সবশেষ বাসটি উদ্ধার করার পর ১৪টি মরদেহ বের করা হয়।

বুধবার বিকেল সোয়া পাঁচটার দিকে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মা নদীতে পড়ে যায় সোহার্দ্য পরিবহন নামে একটি যাত্রীবাহী বাস।

সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, বাস পানিতে পড়ার মুহূর্তেই তলিয়ে যায়। এসময় কয়েকজনকে সাতরে পাড়ে আসার চেষ্টা করতেও দেখা যায়।

এদিকে, বৃহস্পতিবার সকালেও দৌলতদিয়া ঘাটের দুর্ঘটনা কবলিত এলাকায় উৎসুক মানুষকে ভিড় করতে দেখা গেছে।

সকালে ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, ঝড় ও বৃষ্টির কারণে উদ্ধার তৎপরতায় সমস্যা হয়েছিল। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পানিতে পড়েছে।

কেউ নিখোঁজ রয়েছেন এমন দাবি থাকলে পর্যন্ত উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকবে, জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তারা।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

এআর