মোস্তফা ইমরুল কায়েস
২৪ মার্চ ২০২৬, ০১:৪১ পিএম
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে দেশে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট ঈদের ছুটিতে আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। পাম্পগুলোতে ডিজেল ও পেট্রোল মিললেও অকটেন একেবারেই মিলছে না। ভোর সাড়ে ছয়টা থেকে কেউ কেউ পাম্পের সামনে অপেক্ষা করেও দুপুর গড়ালেও পাননি তেল।
মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত গাবতলী, শ্যামলী, আগারগাঁও ও তেজগাঁও এলাকার বিভিন্ন তেল পাম্প ঘুরে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। পুরো রাজধানীর চিত্র একই বলে জানা গেছে। তবে বিকেল থেকে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে বলে জানিয়েছেন পাম্প সংশ্লিষ্টরা।
গাবতলীর টেকনিক্যাল মোড়ে ডানে থাকা ডেনসো নামের ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি তেল নেওয়ার জন্য দাঁড়ালেন সজীব আহমেদ। কিন্তু সেখানে থাকা কর্মীরা তাকে সাফ জানিয়ে দিলেন- অকটেন নেই। এরপর তিনি সোজা শ্যামলীর দিকে মোটরসাইকেল টান দিলেন। এরপর সেখানে এলেন রায়হান দম্পতি। রায়হান কেবল মোটরসাইকেল পাম্পে প্রবেশ করাচ্ছেন, তাকেও হতাশ করে কর্মীরা বলে উঠলেন- ‘ভাই তেল তো নাই৷’
পরে সেখানে থাকা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মী জানালেন, গত রাত থেকে তাদের কাছে অকটেন নেই। ফলে তারা দিতে পারছেন না। তবে গাড়ি আসছে। কখন সে গাড়ি পাম্পে ঢুকতে তা জানাতে পারলেন না তিনি।
সেখান থেকে এগিয়ে কল্যাণপুরের পশ্চিমে বামে থাকা কয়েকটি তেল পাম্পে কোনো মোটরসাইকেলের ভিড় লক্ষ করা যায়নি।
সেখান থেকে সোজা আসাদগেটে গিয়ে দেখা মিলল জুলাই জাদুঘরের পূর্বের কোণের মোড় থেকে তালুকাদার ফিলিং স্টেশন তেল পাম্প পর্যন্ত প্রাইভেটকারের বিশাল লাইন। আরেকটু সামনে এগোতে মোটরসাইকেল চালকরা ভিড় করছেন। তাদের কাউকে পাম্পে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না।
পরে তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, পাম্পটিতে কোনো অকটেন ডিজেল এমনকি পেট্রোলও মিলছে না। তবে দুপুর ২টার পর তেল মিলতে পারে বলে আশ্বাস দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
জয়নাল গাজীপুরে থাকেন। সেখান থেকে এসেছেন তেল নিতে। গাজীপুর থেকে আসার পথে কমবেশি প্রতিটি পাম্পে তেল খোঁজার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু তেল পাননি। সবশেষ এসে দাঁড়ান তালুকদার তেল পাম্পে। তিনি ভোর সাড়ে ছয়টা থেকে সেখানে অপেক্ষা করছেন শুধু তেলের জন্য।
জয়নাল ঢাকা মেইলকে বলছিলেন, ছয় ঘণ্টা ধরে দাঁড়িয়ে আছি। শুনলাম ২টায় তেল দেবে। দেখি কী হয়। তেল ছাড়া যাব না৷
এই পাম্পে তেলের জন্য অপেক্ষা করছেন তার মতো অন্তত ৩০ থেকে ৪০ জন যুবক। মোটরসাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন তারা।
তেল পাম্পের ভেতরের প্রবেশের দুই পাশ বাঁশ ও কাঠ দিয়ে বন্ধ করে রাখা হয়েছে। ফলে পাম্পের বাইরে অপেক্ষা করছেন তারা।
মোহাম্মদপুর থেকে পাম্পটিতে তেল নিতে এসেছেন আলমগীর। তিনি জানালেন, আড়াই ঘণ্টা ধরে আছি। এখনো তেল পাব কি না জানি না। তবে তেল তো নিতে হবে।
ঢাকার ১০টি তেল পাম্প ঘুরেও কোথাও তেল পাননি পাঠাও রাইডস চালক নিয়ামুল৷ তিনি বলছিলেন, ‘তেল যদি আজ না পাই গাড়ি চালানো কঠিন হবে। কোথাও তেল না পেয়ে এখানে এলাম, শুনতেছি ২টার পর নাকি তেল দেবে। এখন অপেক্ষায় আছি কী হয় দেখি!’
এদিকে পাম্পটির নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের একজন জানালেন, কখন তেল দেওয়া তারা শুরু করবেন তা বলতে পারছেন না।
এই পাম্পে যারা অপেক্ষা করছেন তাদের বেশির ভাগই রাইডস শেয়ার করে মোটরসাইকেল চালান এমন ব্যক্তি। তাদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা হলে তারা জানালেন, গত রাত থেকে এ অবস্থা। কিন্তু তার মাঝেও কিছু কিছু তেল পাম্পে তেল মিলেছে। আজ সকাল থেকে একযোগে সকল তেল পাম্পে তেল পাওয়া যাচ্ছে না। তারা বিষয়টিকে জিম্মি বলে মনে করছেন। কারণ সরকার বলছে, তেল পর্যাপ্ত কিন্তু পাম্প সংশ্লিষ্টরা ভিন্ন কথা বলছেন।
এদিকে পাম্পগুলোতে থাকা কয়েকজন ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করা শর্তে জানিয়েছেন, তেল রয়েছে, কিন্তু তারা মালিকের নির্দেশ মানছেন। হয়তো দুপুর থেকে তেল বিক্রির অনুমতি তারা পেতে পারেন।
কেন এমন করা হচ্ছে জানতে চাইলে তারা এক কথায় জানালেন, তেলের দাম বাড়ার অপেক্ষায় আছেন তারা।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে দেশে গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই জ্বালানি তেলের সংকট চলছে। তবে ঈদের ছুটিতে ব্যাংক বন্ধ থাকায় পাম্পগুলোতে তেলের সংকট প্রকট আকার ধারণ করে। এমনকি নিরাপত্তা শঙ্কায় পাম্পগুলো বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলেও শঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছিল পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে। তবে সংগঠনটি জানিয়েছে, স্থায়ীভাবে পাম্প বন্ধ হয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আজ মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) থেকে ব্যাংকগুলো খুলেছে। এতে সংকট অনেকটা কেটে যাবে বলে আশা করছেন মালিকরা।
এমআইকে/জেবি