images

জাতীয়

গুলিস্তানের ফুটপাত থেকে মার্কেট, সবখানেই জমজমাট কেনাকাটা

মহিউদ্দিন রাব্বানি

১৮ মার্চ ২০২৬, ০৬:৪৫ পিএম

ঈদুল ফিতরের উৎসবকে সামনে রেখে রাজধানীর গুলিস্তান এলাকা রূপ নিয়েছে বিশাল এক খোলা বাজারে। নতুন পোশাকের আনন্দ সবার জন্য হলেও সীমিত আয়ের অনেক পরিবারের জন্য ঈদের কেনাকাটা এক কঠিন সমীকরণ। সেই বাস্তবতায় স্বস্তির জায়গা হয়ে উঠেছে গুলিস্তান, যেখানে অল্প টাকায়ও মিলছে ঈদের প্রায় সব ধরনের প্রয়োজনীয় জিনিস।

বুধবার (১৮ মার্চ) সরেজমিনে দেখা গেছে, গুলিস্তানের প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে ভেতরের অলিগলি, ফুটপাত এবং বড় বড় মার্কেট— সবখানেই ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়। দুপুরের পর থেকেই ভিড় বাড়তে শুরু করে, সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে তা যেন ছোটখাটো জনসমুদ্রে পরিণত হয়। বিক্রেতাদের হাঁকডাক, ক্রেতাদের দরদাম, আর চারপাশের কোলাহল— সব মিলিয়ে এক উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয় পুরো এলাকায়।

গুলিস্তানের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর বৈচিত্র্য ও সহজলভ্যতা। এখানে একই জায়গায় পাওয়া যায় পোশাক, জুতা, প্রসাধনী, অ্যাক্সেসরিজ থেকে শুরু করে জাকাতের জন্য প্রয়োজনীয় পণ্যও। ফুটপাতজুড়ে সাজানো অস্থায়ী দোকানগুলোতে সারি সারি ঝুলছে প্যান্ট, শার্ট, পাঞ্জাবি, পায়জামা, টি-শার্ট, লুঙ্গি, শাড়ি, শিশুদের পোশাক, ট্রাউজার, বেল্ট, ঘড়ি, সানগ্লাস, মানিব্যাগসহ নানা সামগ্রী।

M

দামের দিক থেকেও এই এলাকা স্বল্প আয়ের মানুষের নাগালের মধ্যে। ঘুরে দেখা গেছে, ২০০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে সহজেই প্যান্ট কেনা যাচ্ছে। ১৫০ থেকে ৩০০ টাকার মধ্যে মিলছে টি-শার্ট, আর ২০০ থেকে ৫০০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে পাঞ্জাবি, হাফ শার্ট বা ফুল শার্ট। পায়জামা ২৫০ থেকে ৪০০ টাকায়, আর জুতা মিলছে ১৫০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে। তুলনামূলক ভালো মানের কেডস কিনতে হলে খরচ করতে হচ্ছে এক থেকে দুই হাজার টাকা।

নারীদের পোশাকেও রয়েছে বিস্তর বৈচিত্র্য। ৫০০ টাকা থেকে শুরু করে তিন হাজার টাকার মধ্যে বিভিন্ন মানের শাড়ি পাওয়া যাচ্ছে। পাকিস্তানি লনের থ্রি-পিস বিক্রি হচ্ছে ৮০০ থেকে আড়াই হাজার টাকার মধ্যে। হিজাব ও ওড়না পাওয়া যাচ্ছে ১৫০ থেকে ৫০০ টাকায়। ফলে এক জায়গাতেই পরিবারের সবার জন্য কেনাকাটা সারার সুযোগ পাচ্ছেন ক্রেতারা।

শিশুদের পোশাকের ক্ষেত্রেও গুলিস্তান বেশ সমৃদ্ধ। ১২০ টাকায় গেঞ্জি, ২০০ টাকায় শার্ট, ২০০ থেকে এক হাজার টাকায় মেয়ে শিশুদের জামা পাওয়া যাচ্ছে। বাচ্চাদের জুতা মিলছে ২০০ থেকে ৪০০ টাকার মধ্যে। এছাড়া ৩০ থেকে ১৫০ টাকার মধ্যে মোজা, স্যান্ডো গেঞ্জি বা অন্তর্বাসও পাওয়া যাচ্ছে।

m2

গুলিস্তানের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো- খুচরার পাশাপাশি পাইকারি বাজারের সুবিধা। যারা বেশি পরিমাণে পণ্য কিনে ব্যবসা করেন বা জাকাতের জন্য একসঙ্গে অনেক পোশাক নিতে চান, তাদের জন্য এখানে রয়েছে বিশাল পাইকারি সংগ্রহ। ফলে একই জায়গা থেকে ব্যক্তি ও ব্যবসায়ী—দুপক্ষের চাহিদাই পূরণ হচ্ছে।

শুধু ফুটপাত নয়, আশপাশের বিভিন্ন মার্কেটেও জমে উঠেছে ঈদের কেনাকাটা। ঢাকা ট্রেড সেন্টার, ফুলবাড়িয়া সুপার মার্কেট, গুলিস্তান শপিং কমপ্লেক্স, খদ্দর বাজার শপিং কমপ্লেক্সসহ বিভিন্ন বিপণিবিতানে ক্রেতাদের ভিড় চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর এসব মার্কেটে হাঁটার জায়গা পাওয়া দায় হয়ে পড়ছে।

জাকের সুপার মার্কেটের ফুটপাতে মেয়ের জন্য থ্রি-পিসের দরদাম করছিলেন আবদুস সালাম। তিনি বলেন, ‘সংসারের খরচ সামলে ঈদের কেনাকাটা করা অনেক কঠিন। তবুও কম দামে কিছু পাওয়ার জন্য প্রতি বছর এখানেই আসি। ফুটপাত থেকেই বেশিরভাগ কেনাকাটা করি।’

m3

একই চিত্র পোশাক শ্রমিক সাহেদ ইসলামের কথায়। তিনি বলেন, ‘ছেলের জন্য একটা জামা নিতে এসেছি। দাম একটু বেশি মনে হলেও ঈদ বলে কথা, নিতেই হচ্ছে। কম দামে পেতে গুলিস্তানই ভরসা।’

আশাবাদী বিক্রেতারাও 

গুলিস্তান শপিং কমপ্লেক্সের সামনে শার্ট বিক্রি করা কায়সার জানান, এখন বিক্রি মোটামুটি ভালো। ফুটপাতের আরেক বিক্রেতা সায়েম বলেন, মাঝে মাঝে প্রশাসনিক তৎপরতার কারণে তাদের কিছুটা সমস্যায় পড়তে হলেও বেচাকেনা চালিয়ে যাচ্ছেন।

পীর ইয়ামেনী মার্কেটের এক ব্যবসায়ী জানান, আমাদের এখানে যেই দামে কাপড় পাওয়া যায়, অন্য কোথাও তা সম্ভব না। যারা কম খরচে ভালো কিছু কিনতে চান, তাদের গুলিস্তানে আসতেই হবে।

m4

এদিকে জাকাতের পোশাক কেনার ক্ষেত্রেও গুলিস্তান এখন অন্যতম কেন্দ্র। অনেকেই শাড়ি, লুঙ্গি ও অন্যান্য পোশাক একসঙ্গে কম দামে কিনে বিতরণের জন্য এখানে ভিড় করছেন। বিক্রেতারা বলছেন, রোজার মাঝামাঝি সময় থেকেই জাকাতের পণ্যের বিক্রি বেড়েছে।

আরেকটি দিকও এবার চোখে পড়ছে—গরমের কথা মাথায় রেখে সুতি ও আরামদায়ক পোশাকের চাহিদা বেড়েছে। বিক্রেতাদের মতে, গত বছরের তুলনায় এবার এসব পোশাকের বিক্রি বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সব মিলিয়ে গুলিস্তান এখন শুধু একটি বাজার নয়, বরং সীমিত আয়ের মানুষের জন্য ঈদের আনন্দকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার এক নির্ভরযোগ্য কেন্দ্র। এখানে কম টাকাতেও পাওয়া যায় উৎসবের পরিপূর্ণতা, আর সেই কারণেই প্রতি বছর ঈদের আগে এই এলাকা হয়ে ওঠে মানুষের ভিড়ে মুখর, প্রাণবন্ত এক অর্থনৈতিক ও সামাজিক মিলনমেলা।

m5

তবে এই ভিড়ের মধ্যেও রয়েছে কিছু চ্যালেঞ্জ। ফুটপাতজুড়ে দোকান বসায় অনেক জায়গায় হাঁটাচলায় ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে ক্রেতাদের। কোথাও কোথাও অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে তৈরি হচ্ছে যানজটও। 

পাশাপাশি মাঝেমধ্যে প্রশাসনের তৎপরতায় ফুটপাতের দোকানদারদের সরিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে, যা তাদের ব্যবসায় প্রভাব ফেলছে।

তারপরও এসব সীমাবদ্ধতা যেন খুব একটা প্রভাব ফেলতে পারছে না ঈদের কেনাকাটায় আসা মানুষের আগ্রহে। সবার লক্ষ্য একটাই— সাধ্যের মধ্যে পরিবারের জন্য কিছু ভালো কেনা, ঈদের দিনটিকে একটু বিশেষ করে তোলা।

m6

বিক্রেতারা বলছেন, ঈদের যত দিন ঘনিয়ে আসবে, ততই বাড়বে এই ভিড়। বিশেষ করে শেষ কয়েক দিনে গুলিস্তান এলাকায় পা ফেলার জায়গা থাকে না। তখন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলে কেনাবেচা।

অল্প টাকায় বড় সুখ কেনার এই গল্পই গুলিস্তানকে আলাদা করে। এখানে প্রতিটি কেনাকাটার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একেকটি পরিবারের হাসি, একেকটি শিশুর ঈদের আনন্দ, আর সীমাবদ্ধতার মধ্যেও উৎসবকে উদযাপন করার এক আন্তরিক চেষ্টা।

এমআর/এএইচ