মুহা. তারিক আবেদীন ইমন
১৮ মার্চ ২০২৬, ১২:৫৩ পিএম
রমজান, ঈদ কিংবা হজ—ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ অনেক ইবাদত ও ধর্মীয় আয়োজন চাঁদ দেখার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু প্রায় প্রতি বছরই দেখা যায়, বিশ্বের সব দেশে একই দিনে রোজা বা ঈদ শুরু হয় না। কোথাও একদিন আগে, আবার কোথাও একদিন পরে। এর পেছনে রয়েছে জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ও ভৌগোলিক কিছু বাস্তব কারণ।
চাঁদ পৃথিবীর একমাত্র প্রাকৃতিক উপগ্রহ হলেও সব অঞ্চলের মানুষ একই সময়ে নতুন চাঁদ দেখতে পায় না। কোনো দেশে আগে দেখা যায়, আবার কোনো দেশে কিছুটা পরে। জ্যোতির্বিদদের মতে, সাধারণত পশ্চিমের দেশগুলোতে নতুন চাঁদ আগে দেখা যায়, এরপর পূর্বের দেশগুলোতে দেখা যায়। এ কারণেই চাঁদ দেখার ওপর নির্ভরশীল ধর্মীয় অনুষ্ঠান—যেমন রোজা বা ঈদ—কোথাও আগে, আবার কোথাও পরে শুরু হয়।
যেমন চলতি বছর সৌদি আরব ও তার প্রতিবেশী দেশগুলোতে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি ১৪৪৭ হিজরি সনের পবিত্র রমজান মাসের চাঁদ দেখা যায়। ফলে সেখানে ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে রোজা শুরু হয়। অন্যদিকে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ব্রুনাই, ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ইরান, ওমান, জর্ডান, লিবিয়া ও মরক্কোসহ কয়েকটি দেশে ১৮ মার্চ আকাশে রমজানের চাঁদ দেখা যায়। এসব দেশে রোজা শুরু হয় ১৯ ফেব্রুয়ারি। অর্থাৎ সৌদি আরবে আগে চাঁদ দেখা গেছে, আর ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে একদিন পরে। কারণ সৌদি আরব ভৌগোলিকভাবে পশ্চিমে অবস্থিত, আর ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ পূর্বদিকে।
জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানের ভৌগোলিক অবস্থান ও দূরত্বের কারণে সব জায়গা থেকে একই সময়ে চাঁদ দেখা সম্ভব হয় না। তাদের ভাষায়, পৃথিবীতে যত পশ্চিম দিকে যাওয়া যাবে, নতুন চাঁদ তত আগে দেখা যাবে। আবার যত পূর্বদিকে যাওয়া হবে, চাঁদ দেখার সময় তত দেরি হবে। এ কারণেই নতুন চাঁদের উদয় হলেও পশ্চিম দিকে অবস্থিত সৌদি আরবে বাংলাদেশের আগে তা দেখা যায়।
জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা আরও জানান, পৃথিবী গোলাকার হওয়ায় ভিন্ন ভিন্ন স্থান থেকে আকাশের দৃশ্যও ভিন্ন হয়। ফলে দূরত্ব ও অবস্থানের ওপর নির্ভর করে বিভিন্ন জায়গা থেকে ভিন্ন সময়ে চাঁদ দেখা যায়। চাঁদের কক্ষপথ পৃথিবীর নিরক্ষরেখার সঙ্গে প্রায় সোয়া ৫ ডিগ্রি হেলে রয়েছে। তাই পৃথিবীর সব জায়গায় একই সময়ে নতুন চাঁদ দৃশ্যমান হয় না।
বিজ্ঞানীদের মতে, এখন জ্যোতির্বিজ্ঞানের গাণিতিক হিসাব ব্যবহার করে নির্ধারণ করা সম্ভব—কোন দিন, কখন, পৃথিবীর কোন অক্ষাংশে চাঁদের অবস্থান কোথায় থাকবে। চাঁদ কখনো স্থির থাকে না, সব সময়ই তার কক্ষপথে ঘুরতে থাকে। ফলে চাঁদের অবস্থান নির্ণয় করা তুলনামূলক সহজ। তবু ইসলামি বিধান অনুযায়ী রোজা ও ঈদ নির্ধারণের ক্ষেত্রে চাঁদ দেখা গুরুত্বপূর্ণ। আর যেহেতু বিভিন্ন দেশে চাঁদ ভিন্ন সময়ে দেখা যায়, তাই রোজা, ঈদসহ এসব ধর্মীয় আয়োজনও বিভিন্ন দেশে ভিন্ন দিনে অনুষ্ঠিত হয়। চাঁদের আবর্তনের পর্যায়কাল ও তার কক্ষপথের পর্যায়কাল একই হওয়ায় পৃথিবী থেকে আমরা সব সময় চাঁদের একই পৃষ্ঠ দেখতে পাই। চাঁদ পৃথিবীকে একবার প্রদক্ষিণ করতে সময় নেয় ২৭ দিন ৭ ঘণ্টা ৪৩ মিনিট ১১ সেকেন্ড।
তবে সমসাময়িক আবর্তনের কারণে পৃথিবীর পর্যবেক্ষকদের কাছে এই সময়কাল প্রায় ২৯ দশমিক ৫ দিন হিসেবে গণনা করা হয়। একটি ঘণ্টা আবর্তনের সময় চাঁদ প্রায় অর্ধেক ডিগ্রি দূরত্ব অতিক্রম করে। চাঁদ পৃথিবীকে যে অক্ষরেখা ধরে পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে আবর্তন করে, সেই অক্ষরেখা অতিক্রম করতে সময় লাগে একদিন বা ২৪ ঘণ্টা। পৃথিবী থেকে আমরা চাঁদের প্রায় ৫৯ শতাংশ অংশ দেখতে পাই। চাঁদ আকাশের যে অঞ্চলে বিচরণ করে তাকে জোডিয়াক বা রাশিচক্র বলা হয়। এটি ক্রান্তিবৃত্তের প্রায় ৮ ডিগ্রি নিচে এবং গ্রহণরেখার ওপরে অবস্থান করে।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের চেয়ারম্যান ও গবেষক অধ্যাপক ড. যুবাইর মুহাম্মদ এহসানুল হক ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আমরা জানি চাঁদ তো দুনিয়াতে একটাই। একটি নতুন মাস শুরু হওয়ার সময় চাঁদের একটি আবর্তন সম্পন্ন হয়, যাকে অমাবস্যা বলা হয়। অমাবস্যার সময় চাঁদ, সূর্য ও পৃথিবী প্রায় একই সরলরেখায় অবস্থান করে। অমাবস্যা শেষ হলেই নতুন চাঁদের সূচনা হয় এবং নতুন মাস শুরু হয়।’
এই গবেষক বলেন, ‘নতুন চাঁদ হওয়ার পরও সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর সব জায়গা থেকে তা দেখা যায় না। কারণ তখন সূর্য ও পৃথিবীর কাছাকাছি অবস্থানে থাকার কারণে সূর্যের তীব্র আলোয় চাঁদ দেখা কঠিন হয়ে পড়ে। নতুন চাঁদ হওয়ার পর খালি চোখে তা দেখতে সাধারণত প্রায় ৩০ ঘণ্টা সময় লাগে।’
ড. যুবাইর মুহাম্মদ এহসানুল হক বলেন, ‘আমাদের দেশের আকাশে এবারে যেটা ঘটবে, ২১ মার্চ ঈদ হবে। কিন্তু ১৯ তারিখ ঢাকার আকাশে সূর্যাস্তের পরে চাঁদ থাকবে ২২ মিনিট। কিন্তু সূর্যাস্তের পর পশ্চিম আকাশে যে উজ্জ্বল লাল আলো থাকে, সূর্যের যে কিরণ থাকে, তার কারণে নতুন ক্ষীণ চাঁদটা দেখা যায় না। চাঁদ আছে, কিন্তু আমরা দেখতে পাই না। কিন্তু সৌদি আরবে দেখা যাবে। কারণ তাদের সঙ্গে আমাদের সময়ের ব্যবধান তিন ঘণ্টা। এই তিন ঘণ্টায় চাঁদ, সূর্য ও পৃথিবীর সরলরেখা থেকে চাঁদের দূরত্ব আরও বেড়ে যাবে। তখন তারা চাঁদ দেখতে পারবে, কিন্তু আমাদের এখানে চাঁদ থাকলেও আমরা দেখতে পাব না।’
অধ্যাপক যুবাইর আরও বলেন, ‘হাদিসে চাঁদ দেখে রোজা রাখার কথা বলা হয়েছে, যা সেই সময়ের বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কিত। সে সময় মানুষের কাছে জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক জ্ঞান বা চন্দ্রকলার বিস্তারিত তথ্য ছিল না। এখন জ্যোতির্বিজ্ঞানের উন্নতির ফলে সূর্য কখন উঠবে, কখন অস্ত যাবে বা কবে চন্দ্রগ্রহণ হবে—এসব বিষয় আগে থেকেই নির্ধারণ করা সম্ভব। চাঁদের ক্ষেত্রেও একইভাবে হিসাব করা যায়।’
আরও পড়ুন
মধ্যপ্রাচ্যে ২০, দেশে ২১ মার্চ ঈদের সম্ভাবনা; শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি
বাংলাদেশে ঈদ কবে, যা জানা গেল
গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার সূর্যের গতিপথের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হলেও হিজরি ক্যালেন্ডারের মাস নির্ধারণ করা হয় চাঁদের আবর্তনের ওপর ভিত্তি করে। ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী পশ্চিমের দেশগুলোতে দিন শুরু হয় আমাদের পরে। যেমন বাংলাদেশ মধ্যপ্রাচ্যের তুলনায় প্রায় তিন ঘণ্টা, ইউরোপের তুলনায় গড়ে ছয় ঘণ্টা এবং আমেরিকার তুলনায় প্রায় ১২ ঘণ্টা এগিয়ে। তবে একটি মজার বিষয় হলো, সৌর হিসাব অনুযায়ী সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের পার্থক্য মাত্র তিন ঘণ্টা হলেও চন্দ্র হিসাব অনুযায়ী এই পার্থক্য প্রায় ২১ ঘণ্টা।
অর্থাৎ সূর্যের হিসাবে আমরা সৌদি আরবের চেয়ে তিন ঘণ্টা এগিয়ে থাকলেও চাঁদের হিসেবে প্রায় ২১ ঘণ্টা পিছিয়ে আছি। অর্থাৎ প্রায় একদিনের মতো ব্যবধান তৈরি হয়। সে কারণেই সৌর বছরের হিসাবে আমরা অনেক সময় একদিন পরে চাঁদ দেখতে পাই এবং সেই হিসাবে সৌদি আরবে একদিন আগে ঈদ উদযাপিত হয়।
বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, নতুন চাঁদের জন্ম হওয়ার পর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আকাশে তার অবস্থান ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়। বাংলাদেশ থেকে পশ্চিমে অবস্থিত দেশগুলোর আকাশে পরে আবির্ভাব ঘটে বলে সেখানে অপেক্ষাকৃত পরিপক্ক চাঁদের দেখা পাওয়া যায়। আবার সময়ের ব্যবধানে বাংলাদেশ থেকে এগিয়ে থাকা মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় অনেক সময় আরব বিশ্বের মতোই ঈদ পালন করা হয়। তাদের অনুসরণ করে আফ্রিকার কিছু মুসলিম দেশও একই দিনে ঈদ উদযাপন করে।
হাদিসেও চাঁদ দেখার গুরুত্ব উল্লেখ করা হয়েছে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমরা চাঁদ দেখে রোজা শুরু করো, চাঁদ দেখেই ঈদ করো। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকলে শাবান মাস ত্রিশ দিন পূর্ণ করো।’ (সহিহ বোখারি: ১৯০০)
ফিকাহশাস্ত্রে (ইসলামি আইন ও বিধান) চাঁদ দেখা নিয়ে দুটি মতবাদ রয়েছে। একটি হলো উদয়স্থলের অভিন্নতা, আরেকটি হলো স্থানীয়ভাবে চাঁদ দেখা। ইসলামের চার ইমাম—হজরত ইমাম আবু হানিফা (রহ.), ইমাম মালেক (রহ.), ইমাম শাফেয়ি (রহ.) ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)সহ প্রখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ ও শরিয়তের ব্যাখ্যাকারীরা রোজা রাখা ও ঈদ উদযাপনের ক্ষেত্রে স্থানীয়ভাবে চাঁদ দেখার বিষয়টিকেই গুরুত্ব দিয়েছেন।
এ বিষয়ে জনপ্রিয় ইসলামি আলোচক ও আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন, ‘চাঁদ দেখার বিষয়টি নিয়ে বহুদিন ধরেই সারা বিশ্বের ওলামায়ে কেরামদের মধ্যে দুটি মত প্রচলিত রয়েছে। একদল মনে করেন, পৃথিবীর যেকোনো স্থানে চাঁদ দেখা গেলে অন্য জায়গায় দেখা না গেলেও সেই ঘোষণার ভিত্তিতে আমল করা যেতে পারে। অন্য মত হলো—যে অঞ্চলে মানুষ বসবাস করছে, সেই অঞ্চলের আকাশে চাঁদ দেখা গেলে তবেই তারা রোজা বা ঈদ পালন করবে।’
শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘চাঁদ দেখে রোজা রাখো, চাঁদ দেখে ঈদ করো।’ তাই মুসলমানরা চাঁদ দেখার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে থাকে। এটি নতুন কোনো মাসয়ালা নয়। যারা নিজ নিজ আকাশে চাঁদ দেখার বিষয়টিকে গ্রহণ করেছেন, তাদের মতে সরকারি সিদ্ধান্তও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশে হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া অধিকাংশ ওলামায়ে কেরাম স্থানীয়ভাবে চাঁদ দেখার মতের ওপরই আমল করেন। ভিন্নমত থাকতে পারে, তবে সাধারণভাবে বাংলাদেশের আকাশে চাঁদ দেখা সাপেক্ষেই রোজা ও ঈদ পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।’
টিএই/জেবি