images

জাতীয়

বাবার সেই ‘কোদাল’ হাতে এবার খাল খননে নামছেন ছেলে

বোরহান উদ্দিন

১৬ মার্চ ২০২৬, ০৮:০১ এএম

* বৃহৎ পরিসরের লক্ষ্যমাত্রা: ৫ বছরে খনন হবে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল

* কেবল খনন নয়, লক্ষ্য বহুমাত্রিক উন্নয়ন

* দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশগত সুরক্ষা বাড়বে

* পরিবেশ রক্ষা ও দখলমুক্ত রাখার চ্যালেঞ্জ দেখছেন বিশেষজ্ঞরা

দায়িত্ব নেয়ার মাস না পার হতে আরেকটি নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি খাল খননের কাজ শুরু করেছে বিএনপি সরকার। সোমবার এই কর্মসূচির উদ্বোধন করতে দিনাজপুর আসছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জেলার কাহারোল উপজেলার বলরামপুর সাহাপাড়ায় ১২ কিলোমিটার খাল পুনঃখনন কাজের মাধ্যমে একযোগে দেশব্যাপী খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন তিনি।

এর আগে নির্বাচনের আগে প্রচারণার সময় তারেক রহমান সারাদেশে খাল খননের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তারেক রহমান। সরকারে আসলে প্রয়াত বাবা জিয়াউর রহমানের সময়ে আলোচিত খাল খনন কর্মসূচির ফের চালু করতে চান তিনি। ওই সময় জিয়াউর রহমান নিজ হাতে কোদাল নিয়ে খাল খননে অংশ নিয়েছেন। ভোটে জিতে ক্ষমতায় বসার মাস না পার হতেই সেই খাল খনন করতে দিনাজপুর যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই কর্মসূচির মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন এলাকার মৃতপ্রায় ও ভরাট হয়ে যাওয়া খালগুলো পুনঃখনন করা হবে, যাতে সেচব্যবস্থা উন্নত হয় এবং বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা কমানো যায়। এছাড়া মাছ চাষ, হাঁস পালনসহ খালনির্ভর অর্থনীতি শক্তিশালী করা যায়। খাল পুনরুদ্ধার হলে কৃষিজমিতে সেচ সুবিধায় উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে, বন্যা ও জলাবদ্ধতা কমবে এবং স্থানীয় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ইতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার হবে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সরকারের এমন উদ্যোগ নিয়ে পরিবেশবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা প্রাধিকার ও নদীর সংযোগ ঠিক করে কাজ করার পরামর্শ দিয়েছেন। পাশাপাশি শুধু দলীয় পরিচয়ে কেউ যাতে খাল দখল করতে না পারে সেই বিষয়ে সরকারকে কঠোর অবস্থান নিতে হবে।

khal_khanan_dhakamail

দিনাজপুরে যেভাবে সাজানো হয়েছে প্রধানমন্ত্রী কর্মসূচি

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে জানা গেছে, সোমবার সকাল সোয়া ১০টায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সৈয়দপুর বিমানবন্দরে পৌঁছাবেন। এরপর দিনাজপুর জেলার কাহারোল উপজেলার বলরামপুরে। সেখানে বেলা ১১টা ৪৫ মিনিটে ‘সাহাপাড়া খাল’ খননের মাধ্যমে ‘খাল খনন কর্মসূচি ২০২৬’ উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দুপুর সাড়ে ১২টায় সেখানেই আয়োজিত জনসভায় বক্তব্য রাখবেন প্রধানমন্ত্রী। ⁠বিকেল সাড়ে তিনটায় দিনাজপুর পৌরসভার উপশহরে শেখ ফরিদ মডেল কবরস্থানে প্রধানমন্ত্রী তার নানা-নানী ও খালার কবর জিয়ারত করবেন। ⁠বিকেল পাঁচটায় দিনাজপুর সার্কিট হাউজ চত্বরে আয়োজিত সুধী সমাবেশ ও ইফতার মাহফিলে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী।

বাবার পথ ধরে খাল খননে ছেলে তারেক রহমান

দেশে বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা তৈরি হতো এবং শুকনো মৌসুমে কৃষিজমিতে সেচের জন্য পানির সংকট দেখা দিত। বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি ও কৃষি উৎপাদন বাড়াতে খাল খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচিকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। স্বাধীনতার পর তিনি প্রথম খাল খননের উদ্যোগ নেন।

জিয়াউর রহমানের খাল খনন কর্মসূচি ১৯৭৭ সালে গ্রামীণ অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত এবং কৃষি উৎপাদন বাড়াতে গৃহীত একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ ছিল। প্রায় ৩ হাজার ৬৩৬ মাইল খাল খনন করা হয়, যা স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে পরিচালিত ‘সবুজ বিপ্লব’-এর অংশ ছিল।

তবে জিয়াউর রহমানের সময়ে খনন করা অনেক খাল এখন ভরাট অবস্থায় রয়েছে। বর্ষার মৌসুমে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। সেজন্য এসব সংকট নিরসনে সরকার খাল খননের উদ্যোগ নেয়। 

khal_dhakamail

সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আগামী পাঁচ বছরে দেশজুড়ে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী-নালা-খাল ও জলাধার খনন ও পুনর্খনন কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে ৫৪টি জেলায় এ কর্মসূচি শুরু হবে। সংশ্লিষ্ট জেলায় মন্ত্রী, উপদেষ্টা, জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ, প্রতিমন্ত্রী, হুইপ ও সংসদ সদস্যরা এ কর্মসূচি উদ্বোধন করবেন।

 মহিলা ও শিশুবিষয়ক এবং সমাজকল্যাণমন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন, সাহাপাড়ার প্রায় ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই খাল খননের ফলে প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষ উপকৃত হবেন। এতে অতিরিক্ত বন্যা থেকে সুরক্ষা মিলবে এবং শুষ্ক মৌসুমে সেচের সুবিধা পাওয়া যাবে।

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এবং বিএডিসির সমন্বয়ে এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে বলে জানান তিনি।

জাহিদ হোসেন বলেন, শুধু খনন নয়, খালের পাড় রক্ষা, বাঁধ নির্মাণ ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিও নেওয়া হবে। খালের পানি বৈজ্ঞানিকভাবে ব্যবহারের ব্যবস্থা করা হবে, যাতে কৃষি উৎপাদন বাড়ে এবং স্থানীয় মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি হয়।

kahl_khanan_dmail

এদিকে দিনাজপুরে প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষ্যে বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনা বিরাজ করছে। ইতোমধ্যে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পূর্ণ করা হয়েছে। দিনাজপুর জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর সফর উপলক্ষে ইতোমধ্যে সার্বিক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জোরদার করা হয়েছে। 

পরিকল্পনামাফিক কর্মসূচি করার তাগিদ বিশেষজ্ঞদের

অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, পরিকল্পনামাফিক এই কর্মসূচি করতে পারলে অবশ্যই তা ইতিবাচক। নদীর সঙ্গে সংযোগ ও প্রাধিকার ঠিক করে কাজ করতে হবে। এই কর্মযজ্ঞে স্থানীয় নদীকর্মী ও পরিবেশবিদকে সম্পৃক্ত করতে হবে। আমি মনে করি বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চল, বৃষ্টির পানি ধরে রাখতে পারে এমন এলাকা, বরেন্দ্র এলাকা এবং জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয় খনন কর্মসূচি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুরু হতে পারে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক আদিল মুহাম্মদ খান ঢাকা মেইলকে বলেন, খাল খননের পাশপাশি জীবন জীবিকার সংযোগ, খাল দখলকারীদের শাস্তি ও দূষণরোধ নিশ্চিত করতে হবে। শুধু দলীয় পরিচয়ে কেউ যাতে খাল দখল করতে না পারে সেই বিষয়ে সরকারকে জোর পদক্ষেপ নিতে হবে।

বিইউ/এমআই