নিজস্ব প্রতিবেদক
১২ মার্চ ২০২৬, ১০:৩৫ পিএম
তামাক ব্যবহার নিরুৎসাহিত করতে তামাকজাত দ্রব্যের মোড়কে আরও শক্তিশালী ও দৃষ্টিগ্রাহ্য নতুন সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী সংযোজনের আহ্বান জানিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও তামাকবিরোধী কর্মীরা। তারা বলেছেন, দীর্ঘদিন একই ধরনের সতর্কচিত্র ব্যবহারের কারণে এর প্রভাব কমে যাচ্ছে। তাই নিয়মিতভাবে সতর্কচিত্রের সেট পরিবর্তন এবং আরও বাস্তবধর্মী ছবি ব্যবহার করা জরুরি।
বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) দুপুর তিনটায় রাজধানীর বনানীতে অবস্থিত ওমনি রেসিডেন্সিতে ‘তামাকজাত দ্রব্যের মোড়কে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণীর প্রভাব ও বিকল্প ছবির প্রয়োজনীয়তা’ শীর্ষক গবেষণার ফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির টোব্যাকো কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চ সেল (টিসিআরসি) গবেষণাটি পরিচালনা করে।
গবেষণায় দেখা যায়, অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ১৯ শতাংশ সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ধূমপান ছাড়ার চেষ্টা করেছেন এবং প্রায় ২৭ শতাংশ জানিয়েছেন, এসব সতর্কবাণী তাদের ধূমপান থেকে বিরত থাকতে উৎসাহিত করেছে। তবে ৪৯ শতাংশ অংশগ্রহণকারী জানিয়েছেন, সিগারেট বা বিড়ির খুচরা শলাকা কেনার কারণে তারা এসব সতর্কবাণী স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করার সুযোগ পান না।
গবেষণায় দেখা গেছে, তরুণদের একটি অংশ এসব সতর্কবাণী দ্বারা প্রভাবিত হলেও দীর্ঘদিন একই ছবি ব্যবহারের কারণে এর কার্যকারিতা অনেক ক্ষেত্রে কমে যাচ্ছে। এ অবস্থায় সতর্কবাণীর ছবির সেট নিয়মিত পরিবর্তন এবং আরও শক্তিশালী ও দৃষ্টিগ্রাহ্য সতর্কচিত্র সংযোজনের দাবি জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাবেক ন্যাশনাল প্রফেশনাল অফিসার ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. সৈয়দ মাহফুজুল হক। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন ভাইটাল স্ট্রাটেজিসের সিনিয়র টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজার অ্যাডভোকেট সৈয়দ মাহবুবুল আলম তাহিন এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ তাইফুর রহমান।
এ ছাড়া বিশেষজ্ঞ আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গ্রামবাংলা উন্নয়ন কমিটির নির্বাহী পরিচালক এ কে এম মাকসুদ, বাংলাদেশ সেন্টার ফর কমিউনিকেশন প্রোগ্রামসের সিনিয়র ডেপুটি ডিরেক্টর মো. শামীমুল ইসলাম, জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেলের প্রোগ্রাম অফিসার ডা. ফরহাদুর রেজা, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রোগ্রাম অফিসার ডা. এ এস এম ইশতিয়াক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনৈতিক গবেষণা ব্যুরোর প্রকল্প পরিচালক (তামাক নিয়ন্ত্রণ) হামিদুল ইসলাম হিল্লোল এবং স্টপের ফোকাল পারসন ফাহমিদা ইসলাম।
টিসিআরসির প্রকল্প সমন্বয়কারী ফারহানা জামান লিজার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ তামাকবিরোধী জোটের স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ শাগুফতা সুলতানা। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন টিসিআরসির প্রকল্প পরিচালক ও ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক মো. বজলুর রহমান।
মূল প্রবন্ধে তিনি জানান, অক্টোবর ২০২৪ থেকে মার্চ ২০২৫ সময়কালে ঢাকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০০ জন ধূমপায়ী ও অধূমপায়ীর ওপর জরিপ এবং পাঁচজন বিশেষজ্ঞের কী-ইনফরমেন্ট সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে গবেষণাটি পরিচালিত হয়। এতে দেখা যায়, প্রায় ৫১ শতাংশ অংশগ্রহণকারী তামাকজাত দ্রব্যের মোড়কে থাকা সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী লক্ষ্য করেছেন। তবে ৫৪ শতাংশ অংশগ্রহণকারী জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন একই সতর্কচিত্র ব্যবহারের ফলে তা তাদের ওপর আর তেমন প্রভাব ফেলছে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সিগারেট ও বিড়ির খুচরা শলাকা বিক্রি এবং পানের সঙ্গে জর্দা সেবনের প্রচলনের কারণে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণীর কার্যকারিতা আরও কমে যাচ্ছে। অথচ তামাকের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরি এবং ব্যবহার কমাতে তামাকজাত দ্রব্যের মোড়কে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত একটি কার্যকর পদ্ধতি। বাংলাদেশে এ সতর্কবাণী চালু করা হয় ২০১৬ সালে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. সৈয়দ মাহফুজুল হক বলেন, সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী তামাক ব্যবহার নিরুৎসাহিত করার একটি কার্যকর উপায়। এটি শুধু ধূমপায়ীদের ধূমপান ছাড়তে উৎসাহিত করে না, বরং নতুন করে যারা ধূমপান শুরু করতে চায় তাদেরও নিরুৎসাহিত করে। তিনি বলেন, গবেষণার ফলাফল থেকে বোঝা যায় সতর্কবাণীর কার্যকারিতা বাড়াতে নিয়মিত ছবি পরিবর্তন করা এবং আরও শক্তিশালী ও দৃষ্টিগ্রাহ্য ছবি ব্যবহার করা প্রয়োজন।
সভাপতির বক্তব্যে শাগুফতা সুলতানা বলেন, দীর্ঘদিন একই ধরনের ছবি ব্যবহারের ফলে মানুষের মধ্যে এসব সতর্কবাণীর প্রতি সংবেদনশীলতা কমে যাচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগজনক। তাই তামাকের ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি তুলে ধরতে আরও শক্তিশালী ও বাস্তবধর্মী নতুন সতর্কচিত্র সংযোজন করা জরুরি।
অ্যাডভোকেট সৈয়দ মাহবুবুল আলম বলেন, ২০১৬ সালের পর যেসব দেশ সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী চালু করেছে, তারা ইতোমধ্যে একাধিকবার ছবির সেট পরিবর্তন করেছে। তিনি জানান, ফিলিপাইন ২০১৬ সালের পর থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ছয়বার, দক্ষিণ কোরিয়া পাঁচবার এবং মিয়ানমার তিনবার ছবির সেট পরিবর্তন করেছে। এ ছাড়া কলম্বিয়া ২০১০ সাল থেকে ১৬ বার, ভারত ২০০৯ সাল থেকে আটবার এবং সেনেগাল ২০১৭ সালের পর পাঁচবার ছবির সেট পরিবর্তন করেছে। অথচ বাংলাদেশে ২০১৬ সালের পর গত ১০ বছরে একবারও ছবির সেট পরিবর্তন করা হয়নি।
বক্তারা বলেন, বাংলাদেশে সিগারেট ও বিড়ির খুচরা শলাকা বিক্রির কারণে অনেক ধূমপায়ী তামাকজাত দ্রব্যের মোড়কে থাকা সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী দেখার সুযোগ পান না। ফলে সতর্কবাণীর উদ্দেশ্য অনেকটাই ব্যাহত হয়। এ ক্ষেত্রে খুচরা শলাকা বিক্রি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সতর্কচিত্র আরও শক্তিশালী ও দৃষ্টিগ্রাহ্য করা প্রয়োজন।
মুক্ত আলোচনায় তামাক নিয়ন্ত্রণে কর্মরত বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধি, চিকিৎসক, আইনজীবী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং সাংবাদিকরা অংশ নেন। আলোচকরা সম্প্রতি পাস হওয়া অধ্যাদেশ দ্রুত আইনে পরিণত করা, ৭৫ শতাংশ সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণীর বাস্তবায়ন, সতর্কচিত্রের সেট পরিবর্তন এবং নিয়ম অনুযায়ী সতর্কবাণী প্রদান না করলে আইন লঙ্ঘনকারী তামাক কোম্পানির বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।
এএইচ/ক.ম