নিজস্ব প্রতিবেদক
০৬ মার্চ ২০২৬, ১১:৩৪ পিএম
ঈদকে কেন্দ্র করে রাজধানীর বেশিরভাগ সড়কের ফুটপাত ও রাস্তা হকারদের দখলে। মিরপুর-১০ এলাকাতেও একই চিত্র। ফুটপাত এবং রাস্তা হকারদের দখলে জনজীবনে সমস্যা হিসেবে দেখা দিচ্ছে। মিরপুর গোল চত্বর থেকে মিরপুর-১, মিরপুর-১১ এবং মিরপুর-১৪ পর্যন্ত রাস্তাজুড়ে হকাররা দোকান বসিয়ে বেচাকেনার মহোৎসব চলছে। সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়ে রাস্তায় চলাচল করছে, এতে যানজট এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বৃদ্ধি করেছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, ফুটপাত দখল ও হকারদের উপস্থিতির কারণে ক্রেতা আসছে না, বেচাকেনা স্বাভাবিক হচ্ছে না এবং মার্কেটের কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। আর পথচারীরা বলছেন, শিশু, নারী এবং প্রবীণদের নিরাপত্তাও ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, উচ্ছেদ অভিযান চলছে, তবে সীমিত লোকবল ও সক্ষমতার কারণে সব জায়গায় তা কার্যকর করা সম্ভব নয়।
মিরপুর-১০ চৌরাস্তা এলাকা ঢাকার উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) ওয়ার্ড ৩, ৭ এবং ১৪-এর অন্তর্গত। চারপাশে ওভারব্রিজ থাকলেও এর দক্ষিণ অংশটি বিশেষভাবে ১৪ নাম্বার ওয়ার্ডের মধ্যে পড়ে। এই এলাকা মূলত ব্যবসায়িক ও বাণিজ্যিক কারণে পরিচিত। সড়ক এবং ফুটপাতের বিস্তৃত অংশজুড়ে রয়েছে ছোট বড় নানা ধরনের দোকান, যা স্থানভেদে স্থায়ী ও অস্থায়ী উভয়ভাবে পরিচালিত হচ্ছে।
এখানে ফল, মোবাইল ফোনের যন্ত্রাংশ, কাপড়, ওয়ালেট, টয়লেট্রিজসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন জিনিস বিক্রি হয়। পাশাপাশি পুরোনো বই ও ম্যাগাজিনের স্টল, চায়ের দোকান এবং অন্যান্য ক্ষুদ্র ব্যবসাও চোখে পড়ে। অনেক জায়গায় দোকানগুলো ফুটপাত প্রায় পুরোপুরি দখল করেছে, যার কারণে পথচারীদের চলাচলে ভিড় ও জটিলতা তৈরি হয়।
ফুটপাতের এক পাশ জুড়ে সাজানো রয়েছে রঙিন কাপড়, জুতা, ব্যাগ এবং বিভিন্ন দৈনন্দিন ব্যবহার্য সামগ্রী। ক্রেতারা হেঁটে হেঁটে পণ্য দেখেন, দর কষাকষি করে কেনাকাটা করেন। বিশেষ করে বিকেলের দিকে এই এলাকায় ভিড় বেড়ে যায়। এটি ব্যবসায়ীদের জন্য ক্রেতা আকৃষ্টের সময়, তবে পথচারীদের জন্য যথেষ্ট অস্বস্তিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে।
পথচারীরা বলছেন, মিরপুর-১০ এবং আশেপাশের এলাকা ক্রমবর্ধমান সমস্যার মধ্যে পড়েছে। ফুটপাত এবং রাস্তার ওপর হকারদের দোকান বসানোর কারণে মানুষ বাধ্য হয়ে রাস্তায় চলাচল করছে, এতে যানজট এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বৃদ্ধি করেছে। রাস্তার লেন সংকুচিত হওয়ায় প্রতিদিন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, অফিসগামী মানুষ এবং সাধারণ পথচারীরা দীর্ঘ সময় ধরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। ফুটপাতের উদ্দেশ্য ছিল নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা, কিন্তু দখলের কারণে এটি ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না।
পথচারীরা আরও বলেন, শিশু, নারী এবং প্রবীণরা সবচেয়ে বেশি সমস্যার মধ্যে পড়ছে। হকারদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা করা হলে তারা নিরাপদে চলাচল করতে পারবে। বর্তমানে রাস্তার একাংশ এবং ফুটপাত দখল হওয়ায় দৈনন্দিন যাতায়াত জটিল হয়ে পড়েছে। ফুটপাত দখল ও হকারদের উপস্থিতি সাধারণ মানুষের চলাচল এবং এলাকার ব্যবসায়িক কার্যক্রমকে প্রভাবিত করছে।
তাসনিম খান নামে এক পথচারী জানান, ফুটপাতের উদ্দেশ্য ছিল পথচারীর জন্য, তবে হকারদের কারণে এটি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। হকারদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা করা হোক, যাতে সাধারণ মানুষ ফুটপাথ ব্যবহার করতে পারে।
আরেক পথচারী রোকাইয়া জাহান বলেন, বাচ্চা নিয়ে চলাচল খুবই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। রাস্তার অর্ধেক জায়গা হকারদের দখলে, অর্ধেক ফুটপাত দখল হওয়ায় মানুষ বাধ্য হয়ে রাস্তায় চলাচল করছে।
মনিষা খানম নামে আরেক নারী বলেন, নারীর নিরাপত্তা এবং শিশুদের নিরাপত্তা ঝুঁকিপূর্ণ হচ্ছে। জাফর ইকবাল নামের আরেক পথচারী বলেন, মোবাইল, মানি এবং অন্যান্য মূল্যবান জিনিসপত্র চুরি হতে পারে।
এদিকে হকাররা বলছেন, তারা পেটের দায়ে ফুটপাথে দোকান বসাচ্ছে এবং অন্য কোনো বিকল্প নেই। টাকার অভাবে মার্কেট কমপ্লেক্সে দোকান নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না, তাই জীবিকা নির্বাহের জন্য ফুটপাত ব্যবহার করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। মাঝে মাঝে প্রশাসন উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করলে তারা কিছু সময়ের জন্য দোকান বন্ধ রাখে, তবে পরে আবার বসে। তারা নিয়মিত চেষ্টা করছে যাতে অনেক সমস্যা না হয়, কিন্তু রাস্তার ওপর এবং ফুটপাথে দোকান বসানো ছাড়া তাদের জীবিকা চালানো সম্ভব নয়।
ফুটপাথে দোকান নিয়ে আছেন মাইনুল হক। তিনি জানান, তাদের আর কোনো বিকল্প নেই। টাকার অভাবে মার্কেটে দোকান নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
মাজেদুল ইসলাম নামের আরেক ব্যবসায়ী বলেন, মাঝে মাঝে উচ্ছেদ হয়, তারপর আবার বসে। রাস্তার দোকান নিয়ে কিছু ঝামেলা হয়, তবে সরকার ভালো ব্যবস্থা করলে তারা সম্মতি জানাবে।
মিরপুর-১০ এলাকার ব্যবসায়ীরাও সমস্যার কথা তুলে ধরেছেন। তারা বলেছেন, রাস্তার দুপাশে ফুটপাথ দখল করে কয়েক লেনে অপরিকল্পিত দোকান বসায় দেখা যাচ্ছে তীব্র জানজট। বাড়ছে জনদুর্ভোগ। ফলে দূরদূরান্ত থেকে ভোগান্তির ভয়ে অনেক ক্রেতারাই আসছেন না মার্কেটগলোতে। রমজানের মধ্যম সময়েও এমন পরিস্থিতি স্থানীয় মার্কেটগুলোতে বিরূপ প্রভাব ফেলছে।
তারা আরও বলেন, অপরিকল্পিত ফুটপাত দখল ও হকারদের দোকানের কারণে মার্কেটগুলোতে চাহিদা অনুযায়ী বেচাকেনা নেই। এমন চলতে থাকলে ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পড়বে। আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে হলেও ফুটপাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য সরকার ও প্রশাসনের বিশেষ দৃষ্টি রাখার তারা আহ্বান জানান।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, মিরপুর গোল চত্ত্বর থেকে মিরপুর-১ এবং মিরপুর-১১ পর্যন্ত রাস্তায় হকারদের দোকান বসানো সাধারণ মানুষের চলাচলের জন্য বড় ধরনের ব্যাঘাত সৃষ্টি করছে। রাস্তার দুই পাশে ফুটপাত এবং লেন সংকুচিত হয়ে গেছে, ফলে রিকশা, সিটি বাস এবং ব্যক্তিগত গাড়ি ধীর গতিতে চলাচল করছে। ফুটপাত ব্যবহার করতে না পারায় পথচারীরা বাধ্য হয়ে রাস্তায় হেঁটে চলাচল করছেন। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, অফিসগামী মানুষ এবং ক্রেতারা দীর্ঘ সময় ধরে যানজটে আটকে থাকছেন। শিশু, নারী এবং প্রবীণদের জন্য চলাচল বিশেষভাবে বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে।
মিরপুর -১০ থেকে মিরপুর-১৪ পর্যন্ত পরিস্থিতি সবচেয়ে তীব্র। এখানে রাস্তার একাংশ প্রায় পুরোপুরি দোকানদারদের দখল চলে গেছে। সাধারণ মানুষ এবং যানবাহন উভয়ই ধীরগতিতে চলাচল করতে বাধ্য হচ্ছে, ফলে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ দীর্ঘ সময় ধরে রাস্তার মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকছেন। দূরদূরান্ত থেকে আসা ক্রেতারা আসতে দ্বিধা করছেন, বেচাকেনা স্বাভাবিক হচ্ছে না এবং মার্কেটের কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ আনিসুর রহমান বলেন, হকারদের কবল থেকে ফুটপাথ মুক্ত করার অভিযান চলছে। তবে অভাব পর্যাপ্ত লোকবলের, কিন্তু আমরা সবসময়ের জন্যই এটা বিশ্বাস করি ফুটপাথ পথচারীরা ব্যবহার করবে এবং আমাদের উচ্ছেদ অভিযান চলমান থাকে। একটা জিনিস অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে আমাদের সামর্থ্য কিন্তু অনেক সীমিত। সুতরাং আমরা চাইলেই যেকোনো মুহূর্তে সব জায়গায় ফুটপাথ দখলমুক্ত করতে পারব সেটা হয় না।
তিনি আরও বলেন, হকারমুক্ত ফুটপাত নিশ্চিত করতে পুনর্বাসন, জনসচেতনতা এবং প্রশাসনিক সমন্বয় প্রয়োজন। তারা জানিয়েছেন যে ঈদের পরে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ফুটওভার ব্রিজের মতো নতুন অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে, যা জন চলাচলকে সহজ করবে।
এএইচ/এমএইচআর