images

জাতীয়

মশার উৎপাত ঠেকাতে ৪ বিষয়ে গুরুত্ব, সফলতা দেখবে কি ডিএসসিসি? 

মোস্তাফিজুর রহমান

০২ মার্চ ২০২৬, ০৯:১৭ পিএম

রাজধানীতে মশার উৎপাত চরমে পৌঁছেছে। দিন নাই রাত নাই, মশার কামড়ে অতিষ্ঠ নগরবাসী। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মাসব্যাপী কার্যক্রম হাতে নিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপারেশন (ডিএসসিসি)। কিন্তু অতীতে নানাবিধ কর্মসূচি পরিচালিত হলেও রাজধানীর মশার উৎপাত থামাতে কার্যত ব্যর্থ হয়েছিল সিটি করপোরশন। ওই কর্মসূচিগুলোকে অনেকটা ‘লোক দেখানো’ হিসেবেই সমালোচনা হতো। ফলে এবারের কর্মসূচি কতটা সফল হবে তা নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে নগরবাসীর।

তবে ডিএসসিসি বলছে, তারা এবার প্রধানত চারটি বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে মশা প্রতিরোধে ‘বাস্তবধর্মী’ কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, মশক নিধন, জনসচেনতা এবং মনিটরিং- এই বিষয়গুলো সমন্বয়ে মশার প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে আনতে চান তারা।

জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপারেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহানে ফেরদৌস বিন্‌তে রহমান ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আমরা প্রোগ্রাম (মশা নিধন) নিয়েছি। এখন বাকিটা আল্লাহর ইচ্ছে।’

ডিএসসিসির নতুন প্রশাসক ও ক্ষমতাসীন দলের নেতা মো. আবদুস সালাম ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘এতদিন নগরটা মালিকহীন ছিল। এখন নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে কর্মসূচি ঘোষণা করেছি। জনগণ এগুলো দেখার জন্যই তো আমাদের দায়িত্ব দিয়েছে। ইনশাল্লাহ, আমরা সে দায়িত্বগুলো সঠিকভাবে পালন করবো।’

2

আগে পরিচ্ছন্নতা, পরে নিধন

রোববার (১ মার্চ) ডিএসসিসির ৭১ ও ৭২ নম্বর ওয়ার্ডের সুখনগর, গ্রিন মডেল টাউন ও মান্ডা খাল এলাকা থেকে মাসব্যাপী বিশেষ পরিচ্ছন্নতা ও ‘ক্রাশ প্রোগ্রাম’ শুরু হয়। ওইদিন সকাল ৯টা থেকে শুরু হওয়া অভিযানে ডিএসসিসির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও স্বাস্থ্য বিভাগের প্রায় ২৫০ জন কর্মী অংশ নেন।

তারা খাল, ড্রেন, নর্দমা ও ফুটপাত পরিষ্কারের পাশাপাশি মশার ওষুধ প্রয়োগ করেন। এসময় স্থানীয় বাসিন্দা ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বিডি ক্লিনের সদস্যদের অংশগ্রহণে একটি জনসচেতনতামূলক র‍্যালিও হয়।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, নগরীতে অতিরিক্ত মশা জন্ম নেওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ অপরিচ্ছন্নতা। বিশেষ করে শহরের জলাশয়গুলোর একেকটা মশার উৎপাদনের কারখানা। তাই মাসব্যাপী কর্মসূচিতে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার দিকেই প্রথম নজর দেওয়া হচ্ছে। এরপর চলছে মশা নিধন কার্যক্রম।

ডিএসসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহানে ফেরদৌস ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘জলাশয়গুলোর পরিস্থিতি ভয়াবহ। এগুলো পরিষ্কার করা না হলে মশা নিধন করে কোনো কাজে আসবে না। তাই পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।’

ডিএসসিসির স্বাস্থ্য ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ সূত্র জানায়, দক্ষিণ সিটি দশটি অঞ্চলের জলাশয়গুলো পরিষ্কারের রোডম্যাপ তৈরি করেছে। পর্যায়ক্রমে এগুলো পরিষ্কার করা হবে। এ কাজে প্রয়োজনে দৈনিক ভিত্তিতে অতিরিক্ত জনবল নিয়োগও করা হবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, জলাশয়গুলো শুধু পরিষ্কার করেই কার্যক্রম শেষ হবে না। এগুলো তদারকির মধ্যে থাকবে যেন অপরিষ্কার না হয়।

1

নাগরিক সম্পৃক্ততায় গুরুত্ব

শুধু সিটি করপোরেশনের কার্যক্রমেই সম্ভব নয়, মশা নিয়ন্ত্রণে নাগরিক সচেনতা ও সম্পৃক্ততা দরকার বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এজন্য চলমান মাসব্যাপী কর্মসূচিতে জনসচেনতায় ব্যাপক জোর দেওয়া হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন তারা।

ডিএসসিসি জানায়, এ কাজে জনপ্রতিনিধিদের নেতৃত্বে বিভিন্ন পর্যায়ের নাগরিক প্রতিনিধিদের যুক্ত করা হচ্ছে। পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থাকেও সম্পৃক্ত করা হচ্ছে। তাদের নিয়ে জনসচেতনতামূলক র‍্যালি করা হবে। একই সঙ্গে মাইকিং ও লিফলেট বিতরণ করা হবে।

প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহানে ফেরদৌস ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আমরা যতই কাজ করি, যদি জনগণ সচেতন না হন তাহলে কোনো লাভ হবে না। তাই জনসচেনতায় ব্যাপক জোর দিচ্ছে। প্রচার-প্রচারণার জন্য লিফলেট ছাপা হয়েছে। এগুলো বিলি করা হবে।’

প্রশাসক আবদুস সালাম মাসব্যাপী কর্মসূচি উদ্বোধনকালে বলেন, ‘জনসচেতনতা বাড়াতে স্থানীয় ইমামদের সম্পৃক্ত করা হবে এবং মাইকিং করা হবে।’তিনি স্থানীয় সংসদ সদস্য ও রাজনৈতিক নেতাদের এ কার্যক্রমে সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানান।

কর্মসূচি সফলে মনিটরিংয়ে বিশেষ জোর

অভিযোগ রয়েছে সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন কার্যক্রমে সমন্বয় থাকে না। বিশেষ করে মশক নিধনে। মশক কর্মীদের ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগও পুরনো। এসব কারণে অতীতে বিভিন্ন সময় মশা নিধন কার্যক্রম কাজে আসেনি। বছরের পর বছর ধরে নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকছে মশা। সাধারণ মশার পাশাপাশি এডিস মশা ভোগাচ্ছে নগরবাসীকে।
তবে মশার উপদ্রব নিয়ন্ত্রণে এবার কার্যক্রমের পাশাপাশি এর মনিটরিংয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে ডিএসসিসি। এজন্য বহু ধাপে গঠন করা হচ্ছে মনিটরিং টিমও। নিয়োজিত করা হয়েছে একাধিক ম্যাজিস্টেটও।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, অতীতের মতো এবার আর সমন্বয়হীন হতে পারবে না। কোনো কর্মী ফাঁকি দিয়ে পার পাবে না। তাদের সার্বক্ষণিক নজরদারির মধ্যে থাকতে হবে।

প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহানে ফেরদৗস ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আমাদের ১০টা অঞ্চলের জন্য মনিটরিং টিম গঠন করেছি। তারা একেবারে রুটলেভেল (তৃণমূল পর্যায়) পর্যন্ত মশক নিধন কার্যক্রম সমন্বয় ও মনিটরিং করবে। এছাড়াও যার যার অঞ্চলে আলাদা একটা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ খুলবে। সেখানে কর্মীরা কাজ করছে কি না তা নিশ্চিত করা হবে। লাইভে সেটি নজরদারি করা হবে।’

প্রশাসক আবদুস সালাম বলেন, ‘যেহেতু ওয়ার্ড কাউন্সিল নাই, তাই পুরো কার্যক্রমের দায়িত্ব থাকবেন স্থানীয় সংসদ সদস্য। তিনি ঠিক করে দেবেন কারা এই কাজগুলো তদারকি করবেন।’

প্রশাসক বলেন, ‘ওয়ার্ডভিত্তিক তদারকি হবে এবং সিটি করপোরেশন থেকেও গঠিত টিম তদারকি করা হবে। আমরা ম্যাজিস্ট্রেটও নিয়োগ দিয়েছি, যদি কোথাও ফেইল করে তাহলে সঙ্গে সঙ্গে যেন অ্যাকশন নিতে পারেন তারা।’

‘আবার এটাকে সুপারভিশন করার জন্য আমাদের চিফ অফিসার (সিইও) ও সচিবকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তার ওপর আমি থাকবো। এগুলো তো আছে। কাজেই ধারাবাহিকভাবে আমরা দেখবো’, যোগ করেন প্রশাসক।

3

৭ মনিটরিং টিম গঠন, থাকছেন ম্যাজিস্ট্রেটও

মশার প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে মাসব্যাপী এই কর্মসূচি মনিটরিংয়ে ডিএসসিসির ১০টি অঞ্চলের জন্য ৭টি টিম গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি দুজন ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করা হয়েছে।

ডিএসসিসির দফতর আদেশ অনুযায়ী, অঞ্চল-১ এর দায়িত্বে থাকবেন প্রধান ভাণ্ডার ও ক্রয় কর্মকর্তা, অঞ্চল-২ এর দায়িত্বে থাকবেন সিস্টেম এনালিস্ট, অঞ্চল-৩ এর দায়িত্বে থাকবেন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পুর), অঞ্চল-৪ এর দায়িত্বে থাকবেন প্রধান সমাজকল্যাণ ও বস্তি উন্নয়ন কর্মকর্তা।

এছাড়া অঞ্চল- ৫ ও ৬ এর দায়িত্বে থাকবেন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং সার্কেল), অঞ্চল- ৭ ও ৮ এর দায়িত্বে থাকবেন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ) এবং অঞ্চল- ৯ ও ১০ এর দায়িত্বে থাকবেন আইন কর্মকর্তা।

দফতর আদেশে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তাগণ ঝুঁকিপূর্ণসহ অন্যান্য ওয়ার্ডসমূহে মশক নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি মনিটরিং কর্মকর্তাগণের সমন্বয়ে শতভাগ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করবেন। সংশ্লিষ্ট সহকারী স্বাস্থ্য কর্মকর্তাগণ মনিটরিং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাগণকে পূর্ণ সহযোগিতা প্রদান করবেন।

এদিকে ডিএসসিসির বিভিন্ন অঞ্চলের ওয়ার্ড পর্যায়ের মশার প্রাদুর্ভাব রোধকল্পে চিহ্নিত ঝুকিপূর্ণ এলাকায় মোবাইল কোর্ট পরিচালনার জন্য দুইজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করা হয়েছে। তারা হলেন- মো. আমিনুল ইসলাম (অঞ্চল ১-৫) ও মো. আমিনুল ইসলাম (অঞ্চল ৬-১০)। তাদের পেশকার হিসেবে একজন কর্মচারীও নিয়োগ করা হচ্ছে।

জনবল সংকট নিয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে ডিএসসিসি প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহানে ফেরদৗস বলেন, ‘এখানে কিছু ওয়ার্ড অনেক বড়। সেগুলোতে জনবল সংকট আছে। আমরা ডেইলি বেসিসে (দৈনিক ভিত্তি) লোক নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করবো।’

আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘নতুন প্রশাসক এসেছেন। নতুন সরকার এসেছে। আমরা সরকারকে সাহায্য করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।’

এএম/জেবি