images

জাতীয়

পঙ্গু হাসপাতালে ভুল ইনজেকশনে যুবকের মৃত্যু!

মোস্তফা ইমরুল কায়েস

২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৯:০৯ পিএম

  • স্বজনদের দাবি, রাতেও কথা হয়েছিল
  • হাসপাতাল বলছে হঠাৎ অবস্থার অবনতি
  • ঘটনা তদন্তে পাঁচ সদস্যের কমিটি

‘গতকাল বিকেলেও কথা হয়েছে ভাইয়ের সঙ্গে। রাতেও কথা হয়েছে। সব ঠিকঠাকই ছিল। রাত ১১টার দিকে এক নার্স এসে একটি ঘুমের ইনজেকশন দেন। জানান, সকালে বেডে দেওয়া হবে। কিন্তু সকালেই আমাদের ডেকে লাশ বুঝিয়ে দিলেন। সুস্থ মানুষটাকে ইনজেকশন দিয়ে মেরে ফেলল।’

কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন মোহাম্মদ মাইনুদ্দিন। তাঁর ভাই মোহাম্মদ শাকিল চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন রাজধানীর জাতীয় অর্থোপেডিকস ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে (পঙ্গু হাসপাতাল)।

শাকিলের বাড়ি ভোলার লালমোহন উপজেলার গজারিয়া গ্রামে। তিনি মোহাম্মদ বাবুলের ছেলে। ঢাকায় মিরপুরে অটোরিকশা চালাতেন। গত ২৮ জানুয়ারি মিরপুরে অটো চালাতে গিয়ে দুর্ঘটনার কবলে পড়েন। এ সময় তাঁর পায়ের গোড়ালিতে আঘাত পেয়ে হাড় ভেঙে যায়। গত ২৭ দিনে চার দফা অস্ত্রোপচার হয়েছে। সর্বশেষ সোমবার রাতেও তাঁর অস্ত্রোপচার হওয়ার কথা ছিল। মঙ্গলবার ভোরে অপারেশন শেষে তাঁকে বেডে দেওয়ার কথা ছিল। বেডে দেওয়া হয়েছে সত্যি, কিন্তু জীবিত নয়—মৃত।

একজন সুস্থ যুবককে রাতে হাসপাতালের বেডে রেখে এসে সকালে তাঁর লাশ বুঝে নেওয়াটা নিহতের পরিবার ও স্বজনরা কিছুতেই মানতে পারছিলেন না।

মাইনুদ্দিন বলেন, তাঁর ভাইয়ের ভুল চিকিৎসা হয়েছে। গতকাল বিকেলে ভাই নিজেই তাঁকে বিষয়টি জানিয়েছিলেন। তিনি বলেন, রাকিব নামে এক ডাক্তার অন্য এক ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলছিলেন যে তাঁর ভুল চিকিৎসা হয়েছে। সেই সময় কথাটি তাঁর ভাই শুনতে পান। পরে তাঁকে বিষয়টি জানান। তাঁদের বিশ্বাস, অবস্থার অবনতি হয়ে নয়, ভুল চিকিৎসায় তাঁর ভাইকে মারা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, সকালে বড় আশা নিয়ে ভাইকে দেখতে গেলেও তাঁদের লাশ বুঝিয়ে দেওয়া হয়। যখন তাঁরা মামলা করার কথা জানান, তখন রোগীর যাবতীয় কাগজপত্র আটকে রাখা হয়। পরে পুলিশ এলে তবুও কাগজপত্র দেওয়া হয়নি। অনেক চেষ্টার পর দুপুরে হাসপাতালের পরিচালকের সঙ্গে দেখা করেন। তিনি তদন্ত কমিটি গঠনের আশ্বাস দেন। এরপর অভিযোগ দিয়ে লাশ নিয়ে গ্রামের বাড়ির দিকে রওনা হন।

লাশবাহী গাড়িতে বসে কথাগুলো বলতে বলতে মাইনুদ্দিন বারবার ফুপিয়ে কাঁদছিলেন। তিনি বারবার বলেন, তাঁর ভাইকে ভুল চিকিৎসায় মারা হয়েছে, তাঁরা এর বিচার চান।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সকালে লাশ বুঝিয়ে দেওয়ার সময় স্বজনরা জানতে চান, রোগী কীভাবে মারা গেলেন। চিকিৎসক ও নার্সরা কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। এমনকি মামলা করার কথা জানালে তাঁদের হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। মাইনুদ্দিন বলেন, সেখানে থাকা কয়েকজন চিকিৎসক বলেন, লাশ নিতে হলে সাদা কাগজে সই করতে হবে, না হলে লাশ দেওয়া হবে না। প্রয়োজনে লাশবাহী গাড়ির সঙ্গে তাঁদেরও লাশ বানিয়ে পাঠানোর হুমকি দেওয়া হয়। পরে বিষয়টি পুলিশকে জানানো হয়েছে।

জাতীয় অর্থোপেডিকস ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের পরিচালক চিকিৎসক আবুল কেনান ঢাকা মেইলকে বলেন, ভুল চিকিৎসায় নয়, রোগীর অবস্থা হঠাৎ খারাপ হয়ে যাওয়ায় তাঁর মৃত্যু হয়েছে। গতকাল রাত থেকে ভোর পর্যন্ত তিনি ভালোই ছিলেন বলে অবজারভকারী চিকিৎসক জানিয়েছেন। আজ তাঁকে বেডে নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু হঠাৎ অবস্থার অবনতি হওয়ায় মৃত্যু হয়েছে। কী কারণে মৃত্যু হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হবে।

তিনি জানান, এ ঘটনায় পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। মৃত্যুর কারণ নির্ণয় করে আগামী দুই দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

শেরে-বাংলানগর থানার ওসি মনিরুল ইসলাম ঢাকা মেইলকে বলেন, বিষয়টি জানা গেছে। তবে রোগীর স্বজনরা এখনো মামলা করেননি। তাঁরা মামলা করতে চাইলে অবশ্যই নেওয়া হবে। রোগীর কাগজপত্র আটকে রাখার বিষয়টি জানা ছিল না, এ বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হবে।

এমআইকে/এআর