images

জাতীয়

মোহাম্মদপুরের ঐতিহ্য সাত গম্বুজ মসজিদ

মাহফুজুর রহমান

২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৩:৪২ পিএম

রাজধানীর ব্যস্ত নগরজীবনের মাঝেও ইতিহাসের নিঃশব্দ সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সাত গম্বুজ মসজিদ। মোহাম্মদপুরের সাত মসজিদ রোডে অবস্থিত এই মসজিদ শুধু একটি উপাসনালয় নয়, বরং মোগল আমলের স্থাপত্যশৈলী, ধর্মীয় চর্চা এবং ঢাকার প্রাচীন জনপদের বিকাশের এক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। 

প্রায় সাড়ে তিনশ বছর ধরে সময়ের নানা পরিবর্তন, নদীর গতিপথের রূপান্তর এবং নগরায়নের বিস্তারের মধ্যেও মসজিদটি তার ঐতিহ্য ও স্বকীয়তা অটুট রেখেছে। প্রতিদিন এখানে নামাজ আদায় করতে আসা মুসল্লিদের পাশাপাশি ইতিহাসপ্রেমী ও দর্শনার্থীদের কাছেও এটি এক বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্র, যা ঢাকার অতীত ও বর্তমানের মধ্যে এক সংযোগ তৈরি করে।

মোগল আমলের স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন

মোহাম্মদপুরের সাত মসজিদ রোড এলাকায় অবস্থিত সাত গম্বুজ মসজিদটি মোগল স্থাপত্যশৈলীর একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। ধারণা করা হয়, মোগল সুবাদার নবাব শায়েস্তা খাঁ বা তার পুত্র উমিদ খাঁ ১৬৮০ সালের দিকে মসজিদটি নির্মাণ করেন।

1

মসজিদটির ছাদে রয়েছে সাতটি গম্বুজ, মধ্যখানে তিনটি বড় গম্বুজ এবং চার কোণে চারটি ছোট গম্বুজ বা মিনার সদৃশ গম্বুজ। এই সাতটি গম্বুজের কারণেই মসজিদটির নাম হয়েছে ‘সাত গম্বুজ মসজিদ’।

এটি মূলত একটি আয়তাকার স্থাপনা, যার বাইরের দৈর্ঘ্য প্রায় ১৭.৬৭ মিটার এবং প্রস্থ প্রায় ৮.২২ মিটার। মসজিদের পূর্ব দিকে রয়েছে তিনটি খিলানযুক্ত প্রবেশপথ এবং পশ্চিম দেয়ালে তিনটি মিহরাব, যা কিবলার দিক নির্দেশ করে।

নদীর তীরে গড়ে ওঠা এক ঐতিহাসিক স্থাপনা

মসজিদটি একসময় বুড়িগঙ্গা বা তুরাগ নদীর তীরে অবস্থিত ছিল। নদীপথ ছিল তখনকার প্রধান যোগাযোগ মাধ্যম। মসজিদের পাশে নৌকা ভেড়ানো হতো এবং এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও সামাজিক কেন্দ্র।

3

সময় পরিবর্তনের সঙ্গে নদীর গতিপথ বদলে গেছে। বর্তমানে নদী অনেক দূরে সরে গেছে, আর মসজিদের চারপাশে গড়ে উঠেছে আধুনিক আবাসিক এলাকা, বহুতল ভবন এবং ব্যস্ত নগরজীবন।

একসময় এই এলাকা ছিল জঙ্গল ও কৃষিভিত্তিক জনপদ। পরে এটি ধীরে ধীরে পরিকল্পিত আবাসিক এলাকায় পরিণত হয় এবং এখন ঢাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আবাসিক অঞ্চল হিসেবে পরিচিত।

স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য: শিল্প ও নকশার সমন্বয়

সাত গম্বুজ মসজিদ স্থাপত্যের দিক থেকে অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও নান্দনিক। মসজিদের বৈশিষ্ট্যের মধ্যে রয়েছে- উঁচু প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্মিত হওয়া, খিলানযুক্ত প্রবেশপথ, অলংকৃত মিহরাব, চার কোণে অষ্টভূজাকৃতির মিনার, সুষম গম্বুজ বিন্যাস। মসজিদের ভেতরের অংশ তিনটি ভাগে বিভক্ত এবং একসঙ্গে প্রায় ৯০ থেকে ১০০ জন মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন।

মসজিদের পাশে একটি সমাধিও রয়েছে, যা স্থানীয়ভাবে ‘বিবির মাজার’ নামে পরিচিত। ধারণা করা হয়, এটি শায়েস্তা খাঁর পরিবারের কোনো সদস্যের কবর।

4

প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য হিসেবে সংরক্ষণ

বর্তমানে সাত গম্বুজ মসজিদটি বাংলাদেশের প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের তত্ত্বাবধানে সংরক্ষিত একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা। এটি শুধু ধর্মীয় স্থান নয়, বরং দেশের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত। 

যদিও সময়ের সঙ্গে কিছু সংস্কার করা হয়েছে, তবুও মূল কাঠামোর ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য এখনো অটুট রয়েছে। মসজিদটি শুধু একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা নয়, বরং স্থানীয়দের কাছে এটি আবেগ, ঐতিহ্য ও ধর্মীয় পরিচয়ের অংশ।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. আবদুল কাদের (৬৫) বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই এই মসজিদ দেখছি। আগে এখানে এত ভবন ছিল না। দূর থেকে মসজিদটা পরিষ্কার দেখা যেত। এই মসজিদ আমাদের এলাকার গর্ব। অনেক মানুষ শুধু এই মসজিদ দেখতে অন্য এলাকা থেকে আসে। ইতিহাসের একটা অংশ এখানে এলে জীবন্ত মনে হয়।’

মুসল্লি হাফিজুর রহমান (৫৫) বলেন, ‘এখানে নামাজ পড়লে আলাদা একটা অনুভূতি হয়। মনে হয়, শত শত বছর আগের মানুষও এই জায়গায় দাঁড়িয়ে আল্লাহর ইবাদত করেছেন।’

5

রুবেল আহমেদ (৩০) একজন চাকরিজীবী। তিনি বলেন, মোহাম্মদপুর বললেই সাত মসজিদের নাম চলে আসে। এটা শুধু মসজিদ না, এই এলাকার পরিচয়। অনেক মানুষ জানেই না এই মসজিদ কত পুরনো। এটা সংরক্ষণ করা খুব জরুরি, কারণ এটা আমাদের ইতিহাসের অংশ।’

নগরায়নের ভিড়ে ঐতিহ্যের নিঃশব্দ সাক্ষী

বর্তমান ব্যস্ত নগরজীবনের ভিড়েও সাত গম্বুজ মসজিদ তার ঐতিহাসিক মর্যাদা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চারপাশে আধুনিক ভবন, যানজট আর নগর জীবনের কোলাহল সবকিছুর মাঝেও মসজিদটি যেন অতীতের এক নিঃশব্দ সাক্ষী।

প্রতিদিন এখানে নামাজ আদায় করতে আসেন অসংখ্য মুসল্লি। পাশাপাশি ইতিহাসপ্রেমী, গবেষক ও দর্শনার্থীরাও আসেন মসজিদের স্থাপত্য ও ইতিহাস দেখতে।

এম/এএইচ