images

জাতীয়

ইংরেজিতে সয়লাব সাইনবোর্ড-নামফলক!

মুহা. তারিক আবেদীন ইমন

২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:৪৭ পিএম

  • দূতাবাস ছাড়া সব প্রতিষ্ঠানে বাংলা বাধ্যতামূলক

  • হাইকোর্টের নির্দেশনা থাকলেও বাস্তবায়নে ঘাটতি

  • অভিজাত এলাকায় সাইনবোর্ডে ইংরেজির আধিক্য বেশি

  • ফেব্রুয়ারিতে বাড়ে তদারকি, বাকি সময়ে শিথিলতা

  • ব্যবসায়ীদের মতে ‘ব্র্যান্ডিংয়ের জন্য ইংরেজি’

  • ভ্রাম্যমাণ আদালতের তৎপরতা কম 

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহর-নগরের সড়কে বের হলেই চোখে পড়ে প্রতিষ্ঠানগুলোর ইংরেজি নামের বাহার। বিপণিবিতান, রেস্টুরেন্ট, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—অধিকাংশ সাইনবোর্ড ও নামফলকেই প্রাধান্য ইংরেজির। কোথাও পুরোপুরি ইংরেজি, কোথাও আবার বাংলা অক্ষর ছোট করে কোণায়। ভাষার মাস ফেব্রুয়ারিতে কিছুটা সচেতনতা দেখা গেলেও বছরের বাকি সময়ে বাংলা ভাষার ব্যবহার অনেকটাই উপেক্ষিত থাকে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। 

সাইনবোর্ড ও নামফলকে বাংলা ভাষা ব্যবহারের বিষয়ে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা রয়েছে। তবুও বাস্তব চিত্রে তার প্রতিফলন খুব একটা দেখা যায় না। নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইন প্রয়োগে নজরদারির ঘাটতি ও সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তনের কারণেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। 

IMG-20260221-WA0054

২০১৪ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি একটি রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত বিদেশি দূতাবাস ও প্রতিষ্ঠান বাদে দেশের সব সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড, ব্যানার, গাড়ির নম্বরপ্লেট, দফতরগুলোর নামফলক এবং গণমাধ্যমে ইংরেজি বিজ্ঞাপন ও মিশ্র ভাষার ব্যবহার বন্ধ করতে নির্দেশ দেন। পরে ২০১৪ সালের ২৯ মে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় স্থানীয় সরকার বিভাগের নিয়ন্ত্রণাধীন সিটি করপোরেশন, পৌরসভার মাধ্যমে এটি কার্যকর করার সিদ্ধান্ত হয়। 

এরপরও বাংলা ব্যবহারে দৃশ্যত কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় ২০১৫ সালের ১৮ আগস্ট আদালত কড়া ভাষায় মন্তব্য করেন। যে রিটের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত এই আদেশ দেন, সেই রিটের আবেদনকারী সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইউনুস আলী আকন্দ অভিযোগ করেন, সরকারের গাফিলতির কারণে আদালতের আদেশ বাস্তবায়ন হচ্ছে না। সরকার বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করতে আন্তরিক না। সরকার এ বিষয়ে সক্রিয় হলে এবং জনগণ সচেতন হলেই কেবল সর্বস্তরে বাংলার ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব। 

রাজধানীর মতিঝিল, গুলশান, বাড্ডা, বনানী, ধানমন্ডি কিংবা মিরপুর—প্রায় সব এলাকাতেই দেখা যায় ইংরেজি নামের আধিক্য। নতুন প্রজন্মের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো ব্র্যান্ডিংয়ের যুক্তিতে ইংরেজি নাম ব্যবহার করছে বেশি। অনেক ক্ষেত্রে বাংলা নাম থাকলেও সেটি এত ছোট আকারে লেখা থাকে যে দূর থেকে পড়া যায় না।

ভাষার মাস এলেই সামনে আসে মাতৃভাষা বাংলা চর্চার বিভিন্ন দিক। সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিতে হাইকোর্টের আদেশও আছে। সে অনুযায়ী নামফলক, সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড ও ব্যানার বাংলায় লেখা বাধ্যতামূলক। প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসে ভ্রাম্যমাণ আদালত ও উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। এবার সে পদক্ষপ খুব একটা চোখে পড়েনি।ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড-নামফলক শুধু ইংরেজিতে লেখার প্রবণতা ফের বাড়ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তানজিম ইসলাম বলেন, ‘আমরা বাংলা ভাষার জন্য আন্দোলন করেছি—এটা বইয়ে পড়ি, অনুষ্ঠানেও শুনি। কিন্তু বাস্তবে বাইরে বের হলেই দেখি সব ইংরেজি। এতে মনে হয় আমরা নিজেদের ভাষাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছি না।’ ইডেন মহিলা কলেজের ছাত্রী নুসরাত জাহান বলেন, ‘অনেক সময় পুরো সাইনবোর্ড ইংরেজিতে থাকায় সাধারণ মানুষ ঠিকভাবে বুঝতেই পারেন না। বিশেষ করে বয়স্কদের জন্য এটা সমস্যা। অন্তত বড় করে বাংলা লেখা বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত।’ 

IMG-20260221-WA0049

রাজধানীর রামপুরা এলাকায় দেখা যায়, একটি ভবনে অনেকগুলো প্রতিষ্ঠানের আউটলেট। শুধু একটি মাত্র শোরুমের বাংলা অক্ষরের সাইনবোর্ড দৃশ্যমান। বাকি বেশিরভাগই ইংরেজি অক্ষরে লিখা। একই অবস্থা দেখা গেছে গুলশান বাড্ডার বিভিন্ন শোরুমের সামনেও। এছাড়াও বিভিন্ন ব্যাংক এটিএমবুথে হরহামেসাই চলছে ইংরেজি অক্ষরের সাইনবোর্ড, নামফলক।

স্থানীয় সরকার বিভাগ সূত্র জানায়, হাইকোর্ট বিভাগের ১৬৯৬/২০১৪ নম্বর রিট পিটিশনে দেওয়া আদেশ অনুযায়ী সব প্রতিষ্ঠানের (দূতাবাস, বিদেশি সংস্থা ও তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্র ব্যতীত) নামফলক, সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড ও ব্যানারে বাংলায় লেখা বাধ্যতামূলক। সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) নির্দেশনা দিয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। তাই বিগত বছরগুলোতে বিশেষ করে ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলার ব্যবহার নিশ্চিত করতে টানা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেছে সংস্থা দুটি। এতে অনেক বড় বড় প্রতিষ্ঠান আইন মানতে বাধ্য হয়েছে।

রাজধানীর একটি রেস্টুরেন্ট মালিক আরিফ হোসেন বলেন, ‘আমাদের গ্রাহকদের বড় একটি অংশ তরুণ। তারা ইংরেজি নামের সঙ্গে বেশি পরিচিত। তাই ব্র্যান্ডিংয়ের সুবিধার জন্য ইংরেজি ব্যবহার করতে হয়।’ তবে তিনি স্বীকার করেন, ‘বাংলা নাম ব্যবহার করা উচিত। যদি নীতিমালা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন হয়, আমরা অবশ্যই তা মেনে চলব।’ অন্যদিকে নিউমার্কেট এলাকার এক বইয়ের দোকান মালিক বলেন, ‘আমরা বাংলা নামফলক ব্যবহার করি। কিন্তু পাশের দোকানগুলো পুরো ইংরেজিতে লিখে। এতে প্রতিযোগিতার বাজারে আমাদেরও চাপ অনুভব হয়।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএসসিসির রাজস্ব বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, ট্রেড লাইসেন্স নেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বাংলায় নামফলক বা সাইনবোর্ড লাগাচ্ছেন কি না, তা তদারকি তেমন হয় না। বিগত বছরগুলো ফেব্রুয়ারি মাস শুরুর আগ থেকে নগরে সাইনবোর্ড, নামফলক বাংলায় লেখা নিশ্চিত করতে ধারাবাহিকভাবে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হতো। অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে জরিমানাও করা হতো। কিন্তু এবার ঢাকার দুই সিটির কোনো তৎপরতাই চোখে পড়েনি। 

IMG-20260221-WA0041

তবে সম্প্রতি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের নামফলক, সাইনবোর্ড, ডিজিটাল বিজ্ঞাপনফলকে প্রদর্শিত বিজ্ঞাপন ইত্যাদি বাংলায় লিখতে গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। সংস্থাটির পক্ষ থেকে এক গণবিজ্ঞপ্তি বলা হয়েছে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন এলাকার বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মালিকদের অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে, সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ কর্তৃক প্রদত্ত আদেশ অনুযায়ী উপযুক্ত সব প্রতিষ্ঠানের (দূতাবাস, বিদেশি সংস্থা ও তৎসংশ্লিষ্ট ক্ষেত্র ব্যতীত) নামফলক, সাইনবোর্ড, ডিজিটাল বিজ্ঞাপনফলকে বিভিন্ন পণ্যের প্রদর্শিত বিজ্ঞাপন ইত্যাদি বাংলায় লেখা বাধ্যতামূলক।

গণবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ইদানীং লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের নামফলক, সাইনবোর্ড, ডিজিটাল বিজ্ঞাপনফলকে প্রদর্শিত পণ্যের বিজ্ঞাপন ইত্যাদি ইংরেজি ও অন্যান্য বিদেশি ভাষায় লেখা রয়েছে। এই অবস্থায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন এলাকার যে সব প্রতিষ্ঠানের (দূতাবাস, বিদেশি সংস্থা ও তৎসংশ্লিষ্ট ক্ষেত্র ব্যতীত) নামফলক, সাইনবোর্ড, ডিজিটাল বিজ্ঞাপনফলকে বিভিন্ন পণ্যের প্রদর্শিত বিজ্ঞাপন ইত্যাদি বাংলা ভাষায় লিখা হয়নি, সেগুলো অনতিবিলম্বে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় অপসারণ করে বাংলায় লিখে প্রতিস্থাপন করার জন্য অনুরোধ জানানো যাচ্ছে। অন্যথায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, মালিকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

টিএই/ক.ম