images

জাতীয়

ইউনূস সরকারের শেষ সময়ের বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে কেন এত বিতর্ক?

ঢাকা মেইল ডেস্ক

২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৪:৩৮ পিএম

“আপনার মেয়াদ শুরুর এই সময়ে আমি আশা করি, আমাদের পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাণিজ্যিক সম্পর্কের দারুণ গতি ধরে রাখতে আপনি আমাকে সাহায্য করবেন। এই চুক্তিতে আমাদের উভয় দেশের কৃষক ও শ্রমিকেরা সুবিধা পাবেন।”

প্রধানমন্ত্রী পদে দায়িত্ব নেওয়ার পর তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়ে লেখা চিঠিতে এ কথা উল্লেখ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

সম্প্রতি বাংলাদেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড’ নামে এই চুক্তি বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনের আগে এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শেষ সময়ে স্বাক্ষর হওয়ায় এটি নিয়ে নানা সমালোচনা দেখা যাচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে, নির্বাচনের কয়েক দিন আগে এই চুক্তি স্বাক্ষর কেন করতে হলো?

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছিল নয় মাস ধরে। কিন্তু গোপনীয়তার শর্তের কারণে তখন এর বিস্তারিত প্রকাশ করেনি কোনো পক্ষ। এখন চুক্তি প্রকাশ হওয়ার পর বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদদের অনেকেই বলছেন, এই চুক্তির পুনর্মূল্যায়ন হওয়া দরকার। চুক্তির খুঁটিনাটি বিষয়ের দিকে নজর দিয়ে এটাও বলা হচ্ছে যে, চুক্তিতে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষিত হয়নি; বরং প্রাধান্য পেয়েছে আমেরিকার ইচ্ছা। ফলে অর্থনীতিবিদদের কেউ কেউ বলছেন, বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকারের উচিত চুক্তিটি পরীক্ষা করে দেখা।

গত বছর, অর্থাৎ ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল, ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ওপর বিভিন্ন হারে রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ বা পাল্টা শুল্ক আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে একধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করেছিল। বাংলাদেশের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপ করা হয় ৩৫ শতাংশ। সে সময় বাংলাদেশ সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ করে শুল্ক প্রত্যাহার বা কমানোর অনুরোধ করে। পরে সেই শুল্কহার কমিয়ে ২০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়। তবে শুল্ক নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলতে থাকে।

গত নয় মাস ধরে বিভিন্ন বৈঠক ও ধারাবাহিক আলোচনা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত দরকষাকষির পর উভয় পক্ষ ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড’ নামে এই বাণিজ্য চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। নতুন চুক্তির পর বাংলাদেশের ওপর মার্কিন পাল্টা শুল্ক এখন ১৯ শতাংশ। চুক্তিতে উভয় দেশের বিভিন্ন পণ্য শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পেয়েছে।

আরও পড়ুন: কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে বিদায় নিলেন ড. ইউনূস

কিন্তু শেষ পর্যন্ত যা হয়েছে, তাতে বাংলাদেশের নেগোসিয়েশনে ‘দুর্বলতা’ দেখতে পেয়েছেন অর্থনীতি ও বাণিজ্য বিশ্লেষকেরা।

বাণিজ্য চুক্তি কার পক্ষে গেল?

যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার। দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ ৮০০ কোটি ডলার। তবে বাংলাদেশ সেখানে রপ্তানি বেশি করে, আমদানি কম করে। ডলারের হিসাবে বাংলাদেশ বছরে প্রায় ৬০০ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করে। বিপরীতে আমদানি করে ২০০ কোটি ডলারের পণ্য। অর্থাৎ আমেরিকা ৪০০ কোটি ডলারের বেশি পণ্য বাংলাদেশ থেকে কেনে। ফলে দেশটি এখন বলছে, বাংলাদেশকে কেনাকাটা বাড়াতে হবে। তারা শাস্তিমূলক শুল্কও আরোপ করে। আর এসবের সমাধানে আসতেই দুই দেশের চুক্তি।

এভাবে চাপ দিয়ে আমেরিকা ১০০টিরও বেশি দেশের সঙ্গে চুক্তিতে গেছে বা যাচ্ছে। তবে সামগ্রিকভাবে চুক্তিতে বাংলাদেশের চেয়ে আমেরিকা বেশি লাভবান হয়েছে—এমন মত দিচ্ছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর ডিস্টিংগুইশড ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান।

তিনি বলেন, এই চুক্তি আমেরিকার পক্ষে গেছে।

“চুক্তিতে অবশ্যই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনেক প্রভাব দেখা যাচ্ছে। তারা কী করবে, আমরা কী করব—এই বিষয়গুলোতে যে চার গুণ বেশি আমাদের বাধ্যতামূলকভাবে করার ধারা আছে, সেখান থেকেও বোঝা যায়। আর সাধারণভাবেও এর যে সারবস্তু, সেখান থেকেও বোঝা যায় যে, এটি তাদের পক্ষে গেছে।”

তাহলে এই চুক্তি থেকে বাংলাদেশ কী অর্জন করল?

এমন প্রশ্নে তৈরি পোশাক খাতের কথা বলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস বিভাগের অধ্যাপক আবু হেনা রেজা হাসান। তবে একই সঙ্গে তিনি বলেন, এই চুক্তির পেছনে সরকার মূলত রাজনীতির দিকে বেশি অর্জন করতে চেয়েছে বলে তাঁর মনে হয়েছে।

“আমি যদি বলি, বাংলাদেশ এখানে যেটা অর্জন করতে চেয়েছে, সেটা হলো আমেরিকান পলিটিক্যাল ফেভার (রাজনৈতিক অনুগ্রহ)। ইকোনমিক ফেভারের চেয়ে পলিটিক্যাল ফেভার। আমরা রাজনৈতিকভাবে তোমাদের (আমেরিকা) সঙ্গে অ্যালাইন্ড। সুতরাং আমাদের রক্ষা করো, গার্মেন্টস খাতকে রক্ষা করো—এটাই ছিল বাংলাদেশের মূল সুবিধা।”

“অন্যদিকে আমেরিকা রাজনৈতিক সুবিধার সঙ্গে সঙ্গে তাদের অর্থনৈতিক সুবিধাও নিশ্চিত করে নিয়েছে,” বলেন অধ্যাপক আবু হেনা রেজা হাসান।

চুক্তির কোন বিষয়গুলো নিয়ে প্রশ্ন?

চুক্তির শেষ দিকে সেকশন ছয়ে ‘কমার্শিয়াল কনসিডারেশন’ নামে মূলত কিছু কেনাকাটার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশ যে আমেরিকা থেকে কম আমদানি করছে, তা পুষিয়ে নিতে ভবিষ্যতে কী কী কেনাকাটা বাড়াবে, তা উল্লেখ করা হয়েছে।

সেখানে বলা হয়েছে: বাংলাদেশ আমেরিকা থেকে ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কিনবে, ১৫ বছরে ১,৫০০ কোটি ডলারের জ্বালানি কিনবে এবং বছরে সাড়ে ৩৫০ কোটি ডলারের কৃষিপণ্য আমদানি করবে।

কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, এত কেনাকাটা শুধু আমদানি বাড়ানোর জন্য করা হচ্ছে, নাকি এগুলোর প্রকৃত চাহিদা আছে? চাহিদা যাচাই না করেই এসব কেনা হলে অর্থনৈতিক ক্ষতি হবে বাংলাদেশেরই।

“এই এয়ারক্রাফটগুলো কি বাংলাদেশের দরকার আছে? আমরা কী ধরনের এয়ারক্রাফট কিনছি, তা-ও জানি না। শুধু বলা হচ্ছে, ১৪টা কিনব। এগুলো নিয়ে এসে আমরা কি আমাদের এয়ারলাইনসকে লোকসানের দিকে ঠেলে দিচ্ছি? এগুলোও ভাবতে হবে,” বলেন আবু হেনা রেজা হাসান।

অন্যদিকে সংখ্যা বা অঙ্ক নির্ধারণ করে কেনার কথা বলায় ঝুঁকি দেখছেন সিপিডির ডিস্টিংগুইশড ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান।

“এগুলো একেবারে নির্দিষ্ট সংখ্যা দিয়ে বলা হয়েছে। পরে যদি প্রয়োজন না থাকে, তখন এসব ক্রয় পেছানো কঠিন হয়ে যাবে। তখন পেছাতে গেলেই বলা হবে, তাহলে আবার পাল্টা শুল্ক ৩৭ শতাংশে নেওয়া হবে।”

এ ছাড়া নেগোসিয়েশনে আরেকটি দুর্বলতার কথা উল্লেখ করেছেন বিশ্লেষকেরা। বিমান বা গমের মতো আমদানি সরকারিভাবে হলেও অন্যান্য কৃষিপণ্য, তুলা ও তেল আমদানি হবে বেসরকারিভাবে। অর্থাৎ এগুলো আমদানি করবে বেসরকারি কোম্পানিগুলো।

আরও পড়ুন: নয়া প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ড. ইউনূসের বিদায়ী শুভেচ্ছা বিনিময়

কিন্তু বাংলাদেশের বেসরকারি কোম্পানিগুলো যেখানে ভারত, পাকিস্তান বা চীন থেকে কম সময়ে ও কম খরচে আমদানি করতে পারে, সেখানে আমেরিকা থেকে আনতে গেলে খরচ ও সময় বাড়বে।

“কোম্পানিগুলো তো সরকারের আমদানি ঘাটতি মেটাতে নিজেদের আর্থিক ক্ষতি করে ভারত বা পাকিস্তানের পরিবর্তে আমেরিকা থেকে আনতে যাবে না। অথবা তা করতে গেলে সরকারের কাছে বাড়তি সুবিধা বা ভর্তুকি চাইতে পারে। সরকার কি চুক্তির সময় এই ব্যয়ের হিসাব করেছে?” বলেন মোস্তাফিজুর রহমান।

ভূরাজনৈতিক সম্পর্কেও টানাপোড়েন হতে পারে

‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড’ নামের এই চুক্তিতে উভয় দেশই বহু পণ্যে শুল্ক ছাড় পাবে। যুক্তরাষ্ট্রের ৬,৭১০টি পণ্য এবং বাংলাদেশের ১,৬৩৮টি পণ্য এতে অন্তর্ভুক্ত। কোনো কোনো পণ্য শুরু থেকেই, আবার অনেক পণ্য ধাপে ধাপে শুল্কমুক্ত সুবিধার আওতায় আসবে। তবে এতে বাংলাদেশের রাজস্ব আয় কমতে পারে।

এ ছাড়া সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতির বাইরে আরও কিছু বিষয় আছে, যেখানে চীন ও রাশিয়ার মতো দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কেও প্রভাব পড়তে পারে। যেমন, চুক্তির শেষাংশে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় বাড়ানোর চেষ্টা করবে এবং নির্দিষ্ট কিছু দেশ থেকে কেনাকাটা সীমিত করার চেষ্টা করবে। যদিও কোন দেশ থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনা কমাতে হবে, তা নির্দিষ্ট করা হয়নি। বাংলাদেশ বর্তমানে সামরিক সরঞ্জাম বেশি কেনে মূলত চীন থেকে।

এ ছাড়া চুক্তির চতুর্থ সেকশনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বার্থের সংঘাত আছে—এমন দেশ থেকে পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর, ফুয়েল রড বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কেনা যাবে না। তবে একটি ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে। বলা হয়েছে, যদি বিকল্প কোনো সরবরাহকারী বা প্রযুক্তি না থাকে অথবা চুক্তি কার্যকর হওয়ার আগেই বিদ্যমান চুল্লির জন্য উপকরণ কেনার চুক্তি হয়ে থাকে, তবে তা এই নিষেধাজ্ঞার আওতামুক্ত থাকবে।

অর্থাৎ রাশিয়ার প্রযুক্তি সহায়তায় নির্মিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য জ্বালানি সরবরাহ অব্যাহত থাকতে পারে। তবে ভবিষ্যতের কোনো পারমাণবিক প্রকল্পের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নজর থাকবে।

সেক্ষেত্রে এই ধারাগুলোর ফলে চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের সামরিক কেনাকাটা বা জ্বালানি আমদানির সম্পর্ক চাপে পড়তে পারে। কারণ এই চুক্তি বাংলাদেশকে ধাপে ধাপে চীন ও রাশিয়া থেকে আমেরিকামুখী করতে পারে। ফলে এসব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক চাপে পড়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতাও দুর্বল হতে পারে বলে মনে করেন আবু হেনা রেজা হাসান।

তিনি বলেন, “বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা খাতে আর কতটুকুই বা কিনবে? কিন্তু আমাদের প্রতিরক্ষা যখন তাদের সিস্টেমের সঙ্গে সমন্বিত হয়ে যাবে, তখন আমাদের প্রতিরক্ষা কৌশল তো তাদের কৌশলের বাইরে যেতে পারবে না।”

অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হতে পারে—এমন বিষয় আরও আছে। যেমন, সেকশন চারে বলা হয়েছে, যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার জাতীয় স্বার্থ ও অর্থনৈতিক বিবেচনায় সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তাহলে বাংলাদেশকেও তা অনুসরণ করতে হবে।

এ ছাড়া তৃতীয় কোনো দেশের কোম্পানি বাংলাদেশে বাজারমূল্যের চেয়ে কম দামে এমন কোনো পণ্য বিক্রি বা রপ্তানি করতে পারবে না, যার কারণে আমেরিকার পণ্যের বিক্রি কমে যায়।

মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাজারমূল্যের চেয়ে কম দামের বিষয়টি নিয়ে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সমস্যা হতে পারে। কারণ বাংলাদেশের ব্যবসায়ী বা ভোক্তারা চীন থেকে কম দামে পণ্য কেনেন—এটাই স্বাভাবিক।

তিনি বলেন, সরকারিভাবে কোনো প্রতিষ্ঠানকে ভর্তুকি দিলে সেই প্রতিষ্ঠান অনেক সময় কম মূল্যে পণ্য বিক্রির সক্ষমতা অর্জন করে। এটি আন্তর্জাতিক আইনের ব্যত্যয় হতে পারে।

আরও পড়ুন: যমুনায় আর কতদিন ইউনূস, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উঠবেন কবে

“আমেরিকা তাদের এই বাজারমূল্যের চেয়ে কম দামের বিষয়টি দিয়ে সেসব জায়গায় বেশি চাপ দেবে, যেখানে তাদের বাণিজ্য স্বার্থ হুমকিতে পড়বে। ধরুন, বাংলাদেশে আমেরিকার যে বাণিজ্য স্বার্থ আছে, সেখানে চীন থেকেও একই পণ্য আমদানি হচ্ছে, কিন্তু চীন কম দামে দিচ্ছে। এসব জায়গায় আমেরিকা বলবে, এটি তাদের বাণিজ্য স্বার্থের পরিপন্থী।”

“কিন্তু চীন বলবে, তারা সরাসরি কোনো ভর্তুকি দেয় না। এ রকম নানা ঝুঁকি এসব ধারাকে কেন্দ্র করে আছে। এখানে অর্থনীতি ও ভূরাজনীতি—দুটোই জড়িত। সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের ব্যবসায়ীরা যেখানে কম দামে পাবে এবং বেশি লাভ হবে, সেখান থেকেই পণ্য আনবে,” বলেন তিনি।

এমন চুক্তি কেন করা হলো?

চুক্তিতে পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ, ই-কমার্সসহ আরও বিষয় রয়েছে। আবু হেনা রেজা হাসান বলেন, মান নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর অনুমোদন ও মেধাস্বত্ব আইনের মাধ্যমে বাংলাদেশের ওপর একধরনের নিয়ন্ত্রণ আরোপ হয়েছে।

“এখানে আমেরিকার কৌশল হলো, পাল্টা শুল্কের কথা বলে তারা তাদের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ও আইনি কাঠামো আমাদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে। টেকনিক্যাল স্ট্যান্ডার্ড ও মেধাস্বত্বের মাধ্যমে তারা আমাদের ওপর প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করবে।”

“আমরা তাদের পণ্যে কোনো নন-ট্যারিফ বাধা বা কারিগরি মানের অজুহাতে বাধা দিতে পারব না। কিন্তু তারা পারবে। তারা বলবে, তোমার পণ্যের কারিগরি মান আমাদের মতো নয়। তাই আমরা তা নেব না। কিন্তু আমরা এ কথা বলতে পারব না। কারণ তাদের কারিগরি মান বিশ্বব্যাপী গৃহীত, আমাদেরটা নয়,” বলেন তিনি।

কিন্তু তাহলে এমন চুক্তি কেন করা হলো? এক্ষেত্রে সদ্য সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস দায়িত্ব ছাড়ার আগে তার শেষ ভাষণে অবশ্য নানাবিধ সুবিধার কথা বলেছেন। দাবি করেছেন, এই চুক্তি বাণিজ্য তো বটেই, তার ভাষায় এমনকি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করবে বাংলাদেশের।

তিনি বলেন, “এই চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের জন্য প্রযোজ্য পারস্পরিক শুল্ক ৩৭ শতাংশ থেকে ১৯ শতাংশে কমে এসেছে। এই চুক্তির একটি বিশেষ দিক হলো, যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত তুলা ও কৃত্রিম তন্তু ব্যবহার করে তৈরি পোশাক পণ্যে শূন্য পারস্পরিক শুল্ক সুবিধা। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুল্ক সুবিধা পাওয়ায় বাংলাদেশি পোশাক আরও কম দামে প্রবেশ করবে।”

আরও পড়ুন: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের চিঠি

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাল্টা শুল্ক কমেছে এবং তৈরি পোশাকের বাজার ঠিক থাকছে ঠিকই, কিন্তু এর বিনিময়ে যেসব ছাড় দিতে হয়েছে, প্রশ্ন সেখানেই। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানিতে খরচ বেশি হলে শূন্য শুল্ক সুবিধা পেলেও লাভ কমে যেতে পারে।

সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্নটি উঠছে তা হলো—দেশের অর্থনীতি ও বৈদেশিক সম্পর্কের সঙ্গে জড়িত এমন একটি স্পর্শকাতর চুক্তি কেন শেষ সময়ে সই করা হলো? নির্বাচিত নতুন সরকারের জন্য কেন রাখা হলো না?

চুক্তি ইতিমধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছে। এখন প্রশ্ন—বিএনপির নবগঠিত সরকার এ নিয়ে কী করবে?

বিষয়টি নিয়ে নতুন সরকারের কেউ এখনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেননি। তবে চুক্তি প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকা অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা খলিলুর রহমান বিএনপির নতুন সরকারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন।

সব মিলিয়ে চুক্তি থেকে সরে আসার সুযোগ থাকলেও বাংলাদেশের জন্য তা কঠিন হবে বলে মত পাওয়া যাচ্ছে। নতুন ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকার এখনই সেই ঝুঁকি নেবে কি না, সেটিও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সূত্র: বিবিসি বাংলা

এআর