নিজস্ব প্রতিবেদক
১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৭:৪১ এএম
গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দেড় বছর পর নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ভোট দিচ্ছেন দেশের মানুষ। একই সঙ্গে গণভোটের মাধ্যমে সংবিধানের বেশ কিছু মৌলিক পরিবর্তন আনার প্রস্তাবের পক্ষে-বিপক্ষে ‘হ্যাঁ’-‘না’ ভোট দিয়ে মত জানাচ্ছেন তারা।
বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে সাতটায় ভোটগ্রহণ শুরু হলেও তার অনেক আগেই ভোটকেন্দ্রে এসে লাইনে দাঁড়ান ভোটাররা। ভোরের আলো ফোটার আগেই অনেক কেন্দ্রে মানুষের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। ফজরের নামাজ শেষ করে অনেকেই ভোটকেন্দ্রের সামনে অবস্থান নেন।
দীর্ঘ সময় ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে না পারার অভিজ্ঞতা ভোটারদের মধ্যে এক ধরনের উচ্ছ্বাস তৈরি করেছে। লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষদের মুখে-মুখে ছিল ভোট দেওয়ার আগ্রহের কথা। অনেকে বলছিলেন, এত বছর পর নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারাটাই তাদের কাছে বড় বিষয়। কারো চোখেমুখে ছিল উত্তেজনা, কারো মধ্যে চাপা আবেগ, আবার কারও কণ্ঠে শোনা গেছে স্বস্তির সুর।
কেন্দ্রের সামনে লাইনে দাঁড়িয়ে ভোটাররা পরস্পরের সঙ্গে কথা বলছিলেন নির্বাচন, পরিবর্তনের আশা আর ভবিষ্যৎ নিয়ে। তরুণ ভোটারদের পাশাপাশি বয়স্ক অনেক মানুষকেও সকাল থেকেই কেন্দ্রে আসতে দেখা গেছে। তাদের অনেকেই বলছিলেন, জীবনে প্রথমবারের মতো বা দীর্ঘ বিরতির পর ভোট দিতে এসেছেন।
ভোটারদের এমন উপস্থিতি ও অপেক্ষা তাদের আগ্রহেরই প্রতিফলন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত থাকার পর এবারের নির্বাচনকে মানুষ একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখছেন।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এবারের এই নির্বাচন গতানুগতিক জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো নয়। শেষ পর্যন্ত একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হলে এটি হতে পারে গণতান্ত্রিক উত্তরণের প্রথম ধাপ। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে তা হবে সংবিধানের মৌলিক সংস্কার বাস্তবায়নের সূচনা।
সকাল সাড়ে সাতটা থেকে শুরু হওয়া ভোট চলবে বিকেল সাড়ে চারটা পর্যন্ত। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি সুষ্ঠু, সুন্দর, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর নির্বাচনের প্রত্যাশার কথা জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন।
এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীন অনুষ্ঠিত সর্বশেষ তিনটি জাতীয় নির্বাচনই ছিল বিতর্কিত। এর মধ্যে ২০১৪ সালের নির্বাচন ‘একতরফা’, ২০১৮ সালের নির্বাচন ‘রাতের ভোট’ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচন ‘আমি-ডামির নির্বাচন’ হিসেবে পরিচিতি পায়। সর্বশেষ তিন প্রধান নির্বাচন কমিশনারের মধ্যে দুজন এখন কারাগারে। ভোটারদের একটি বড় অংশই বিগত নির্বাচনগুলোতে ভোট দিতে পারেনি। যার কারণে এবার ভোট নিয়ে মানুষের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা রয়েছে। বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া সার্বিকভাবে ভোটের প্রচারও ছিল শান্তিপূর্ণ।
ভোটের দিন দায়িত্ব পালন করবেন সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ, বিজিবিসহ বিভিন্ন বাহিনীর সাড়ে ৯ লাখের বেশি সদস্য। ভোট দেওয়ার জন্য দুই দিন ধরে বিপুলসংখ্যক মানুষকে উৎসবমুখর পরিবেশে বাস, লঞ্চ, ট্রেনে গ্রামের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়তে দেখা যায়।
ভোটের পথরেখা
বিরোধীদের বর্জনের মধ্যে ২০২৪ সালে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ টানা চতুর্থবারের মতো সরকার গঠন করে। তবে ছয় মাস পরে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের প্রায় দেড় বছর পর ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন আয়োজন করল।
গেল ১১ ডিসেম্বর তফসিল ঘোষণার পর থেকে টানা দুই মাস ভোটের কাজ এগিয়ে নিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লার মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতার এই নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট হচ্ছে। জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থীর মৃত্যুতে শেরপুর-৩ আসনে ভোট স্থগিত হয়েছে।
বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় পার্টি, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ ৫০টি দল ভোটে রয়েছে। দলীয় ও স্বতন্ত্র মিলিয়ে ভোটের মাঠে নেমেছেন ২০২৮ প্রার্থী।

কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত করেছে ইসি। ফলে দলটি এবারের নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না।
১৯৯১ সাল থেকে সব কটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছিল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এবার ভোটে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন নির্বাচনী জোটের মধ্যে। স্বাধীনতার পর প্রথমবারের মতো কোনো জাতীয় নির্বাচনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে জামায়াতে ইসলামী।
এবারের নির্বাচনে মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৭ লাখের বেশি। এর মধ্যে ১৮ থেকে ৩৭ বছর বয়সী ভোটার আছেন ৫ কোটির বেশি। অন্যদিকে মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেক নারী। ফলাফল নির্ধারণে তরুণ ও নারী ভোটাররা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
এমআর